স্যমন্তক: পঞ্চম পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

স্যমন্তক: পঞ্চম পর্ব

রাকু কোথায়?
বারান্দায়, আদিল বলল।
: আসতে বলো।
কয়েক মিনিট পর রাকু ধীরপদে রুমে ঢুকল। পাঁচ ফুটের বেশি হবে উচ্চতা। মাথা থেকে পায়ের বৃদ্ধাঙুল পর্যন্ত দেখে নিলাম। ফরসা নয়, শ্যমলা; কিন্তু ফরসার চেয়ে সুন্দর, ফরসা না-হয়েও ফরসার চেয়ে সুন্দর হওয়া কোনো সাধারণ বিষয় নয়। মেয়েটির অবয়ব তাকে এমনই অপূর্ব করে দিয়েছে। চোখ দুটো বড়ো আদুরে, মেঘের মতো মনোরম, আদিলের মায়ের মতো বড়ো নিষ্পাপ। দেখলে স্নেহ গলে পড়ে শিশিরের মতো, জড়িয়ে থাকে সবুজে রোদ অবধি।
রুমে ঢুকে সোজা আমার নাক বরাবর দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানাল। শ্রদ্ধার জবাবে হাসি দিয়ে মাথা নাড়লাম। অধিকাংশ আমলা এভাবেই সালামের জবাব নেন। আদিলের ভাষায় আম-লাজবাব। মানে ‘আমার বা আমাদের কোনো জবাব নাই’।
রাকুকে সপ্রতিভ দেখালেও এই মুহূর্তে চিন্তাক্লিষ্ট। ছোটো হাসির ভিতর মুক্তার মতো সাদা দাঁতের চকচকে বিচ্ছুরণ তার চিন্তাক্লিষ্টতাকে রহস্যময় করে তুলেছে। মাথায় প্রচুর চুল, বেণি না-করায় চুলকে চুলের চেয়েও বেশি দেখাচ্ছে। এ যেন শুধু চুল নয়, সৌন্দর্যের পাঠাগার। বয়স সতেরো-আঠারোর বেশি হবে না। কিছুটা চ্যাপ্টা নাকে শিশুর লাবণ্য, দেখেই বোঝা যায় বেশ তুলতুল। পুষ্ট ঠোঁট দুটো না-বলা ভাষায় সরব আবেগে তুষ্ট। গড়নে না-মোটা না-চিকন। ঠিক বেতের মতো অভিপ্রেত।
: এই মেয়ে, বসো।
ছোটো একটা হাসিতে কৃতজ্ঞতা বিলিয়ে বসে পড়ল সে। বসার রকমটাও অন্যরকম। মনে হলো, একগুচ্ছ বকুল খুব অবহেলায় গাছ থেকে ধুপ করে পড়ে আছে বিষণ্ন মাটিতে, কিন্তু সৌরভ বিলিয়ে যাওয়ার আকুল চেষ্টায় ব্যাকুল। কাঁধের ছোটো ব্যাগটা শ্যামলা নয়, পাংশুটে, একসময় হয়তো সুন্দর ছিল। ব্যবহারে ব্যবহারে বিবর্ণ হয়ে গেছে। পরনের কাপড় মার্জিত। দেখলেই বোঝা যায় অনেক পুরানো, কিন্তু একটুও ময়লা নেই।
: এই মেয়ে নাম কী?
: কার নাম?
: তোমার, আর কার?
: রাকখসনা, ডাক নাম রাকু।
: এমন নাম কে রাখলে?
: মা-বাবার রাখা নাম রাসনা। শিশু শ্রেণিতে ভর্তি হওয়ার সময় ইংরেজিতে স্যার লিখে দিলেন racsna, বাংলায়  রাকসনা। পাশের বাসার এক চাচি নিয়ে গিয়েছিলেন স্কুলে। উচ্চ বিদ্যালয়ে এলাম রাকসনা হয়েছে। এইচএসসির সার্টিফিকেট এল। দেখলাম আমার নাম রাকখসনা । আমি রাসনা কাগজেকলমে রাকখসনা হয়ে গেলাম। ভাগ্যিস দন্ত্য-ন ছিল।
: ঠিক করে নাওনি কেন?
: শিক্ষা বোর্ডে কয়েকবার গিয়েছিলাম, পারিনি। ঘুস দিতে হয়, অ্যাফিডেভিট লাগে, পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিতে হয়, চেয়ারম্যানের সনদ লাগে— আরও কত কী!
: কত টাকা ঘুস চাইছিল?
: দুই হাজার টাকা।
: কাউকে বলতে।
: একজন শিক্ষককে বলেছিলাম। তিনি বলেছেন, নামে কোনো ভুল নেই। ফালতু কাজের জন্য টাকা খরচ করবে কেন?
:  বেশ ভালো ছাত্রী ছিলে তুমি, তাই না?
: বস্তির মেয়ে, স্কুলে অনেকে অবহেলার চোখে দেখত, অবহেলায় অবহেলায় বাড়া। আমার শরীর থেকে নাকি দুর্গন্ধ বের হতো। সহপাঠীদের মাথায় উকুন যাবে বলে অনেকে আমার পাশেও বসতে চাইত না। বসলেও নিরাপদ দূরত্ব বজায় রাখত। আমিও নিজেকে সবসময় আলাদা রাখার চেষ্টা করতাম। যদিও

স্যমন্তকের নায়িকা

বুঝতাম— আইসোলেটেড মিনস টার্গেটেড। তবু নিজেকে রক্ষার জন্য এর চেয়ে ভালো কোনো উপায় জানা ছিল না। রক্তাক্ত হব না কি ক্ষুধার্ত থাকব?
: তুমি নিয়োগ পরীক্ষায় প্রথম হয়েছ?
অসম্ভব সুন্দর ভঙ্গিতে ডান হাতটা কপালে ঠেকিয়ে উঠে দাঁড়াল রাকু। চোখ দিয়ে জল পড়ছে আনন্দে। মুখ যেন ধরিত্রী, চোখের ধারায় যমুনা। আমি হতবাক হয়ে দেখলাম তাকে। অবাক হয়ে পড়তে থাকলাম—তার মুখ, চোখ, কপোল, কপাল. কানের লতি, গলার রগ; সবগুলো  খুশির জোয়ারে প্লাবিত। আর্থিক নির্ভরতা মানসিক প্রশান্তির সিঁড়ি। পরনে সেই প্রথমদিনের পোশাকটি। সেটিও মুহূর্তের মাঝে নতুন হয়ে গেল।
“স্যার, আমার চাকরিটা তাহলে হয়েছে”, বলেই কেঁদে দিল মেয়েটা।
চাকরি হওয়ার খবর পেয়ে আমিও খুশি হয়েছিলাম। তবে আজকের পরিবেশ ভিন্ন। মেয়েটাকে যা বলতে চাই তা বলব কি না ভেবে পাচ্ছি না। আমার দ্বিধা শেষ পর্যন্ত কৌটিল্য চিন্তার দাপটের কাছে মাথা নত করে ফেলল। অঘটন ঘটিয়ে অন্যকে বিপদে ফেলা এবং নিজেও বিপৎসংকুল থাকা আমার আবাল অভ্যাস। 
: শোনো মেয়ে?
: স্যার।
: তোমাকে চাকরিটা দেওয়া যাচ্ছে না। এটা বলার জন্যই ডেকেছি, সরি।
আমার কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটা হরিণীর বেগে সেক্রেটারিয়েট টেবিলের নিচে আমার পায়ের উপর উবু হয়ে পা-দুটো জড়িয়ে ধরে কাঁদতে শুরু করল। সে কাঁদছে আর কাঁদছে। আমি লজ্জা আর অনুশোচনায় স্তব্ধ। সাক্ষাৎকার বোর্ডের অসাধারণ চৌকশ মেয়েটিকে অবিশ্বাস্য রকমের অসহায় মনে হচ্ছে।
উঠতে বললাম রাকুকে।
রাকু উঠল না। আরও জোরে পা আঁকড়ে ধরল। আবারও বললাম উঠতে, তারপরও উঠল না। আবারও বললাম, তবুও উঠছে না। কী আর করা— অবশেষে আমিই তাকে হাত ধরে উঠালাম।
সে দাঁড়াল। চোখ দিয়ে জল নয়, যেন কষ্ট ঝরে পড়ছে। বালিকার মতো কাঁদছে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে, স্যার, চাকরিটা না-হলে আমি মরে যাব।
আমার মুখ ফসকে বেরিয়ে এল, তুমি মরলে আমার কী?
: শুধু আমি নই, আমার বাবা, দুই বোন, এক ভাই সবাই শেষ হয়ে যাবে।
: তোমার বাবা কোথায়?
: বাবা জুটমিলের বদলি শ্রমিক ছিলেন, এখন পঙ্গু। কোনো কাজ করতে পারেন না।
: কী হয়েছিল?
: আমাকে এইচএসসি পরীক্ষার হলে নিয়ে যাচ্ছিলেন। হঠাৎ একটি গাড়ি এসে ধাক্কা দিল বাবাকে। একটা পা ভেঙে গেল। ভাড়ার টাকা ছিল না বলে হেঁটে যাচ্ছিলাম। আমি একটু বামে থাকায় বেঁচে গেছি। বাবার ভাঙা পায়ে পচন ধরেছে। ব্যথায় বিকটভাবে চিৎকার করেন। হাঁটতে পারলে ভিক্ষায় যেতেন, তা-ও সম্ভব হচ্ছে না।
: কোথায় থাক তোমরা?
: আগে জুটমিলের বাসায় থাকতাম। বাবা পঙ্গু হওয়ার পর বের করে দিল আমাদের। তারপর গ্রামে চলে গেলাম। গ্রামেও থাকা হলো না। আমি মেয়ে। মানুষ, মেয়েদের মানুষ ভাবে না। আপনি স্যার মেয়ে হলে বুঝতেন।
: তোমার মা?
: তিনি গৃহকর্মী। আগে জুটমিলে ঝাড়ু দিতেন। অ্যাজমা হওয়ায় চাকরি থেকে বের করে দিলেন। মাঝে মাঝে ভিক্ষাও করতেন। বছরখানেক আগে কাশতে কাশতে সবার চোখের সামনে মারা গেলেন। মা থাকলে ভিক্ষা করে হলেও খাওয়াতেন। গরিব খুব মরে, কিন্তু নীরবে। ধনী একজন মরলে খবরে খবরে সব সয়লাব হয়ে যায়। আমি মনে করি এটাই তাদের শাস্তি।
: মেয়ে?
: স্যার।
: তুমি কি জানো, তুমি কত মেধাবী?
: আমার মেধা দিয়ে কিছু হবে না স্যার। পরিচর্যা না-পেলে মূল্যবান ধাতুও মূল্যহীন থেকে যায়। পাথরের উপর পড়লে অনেক ভালো বীজও নষ্ট হয়ে যায়। মেধাবী হলেও আমি বস্তির মেয়ে, বস্তি অক্সফোর্ড নয়।
আদিল বলল, পরিচর্যাই মেধার বিকাশ ঘটায়। সাগরের জলের উপরে ময়লাগুলোই ভাসে, মুক্তা নিচে পড়ে থাকে। তাকে অনেক শ্রমে তুলে এনে মূল্যবান করতে হয়।
: স্যার, চাকরিটা আমাকে দেবেন। দেবেন তো?
রাকু এমনভাবে কথাটা বলল মনে হলো, আমার ছোটো বোন আবদার করছে— “দাদা, একটা চকলেট দেবে, চকলেট। দেবে তো?”
রাকু আবার আমার পায়ের উপর উবু হতে গেল। আমি তার বাহু দুটো খপ করে ধরে ফেলি। রাকু চোখ দুটো বড়ো করে অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে

স্যমন্তক, পুথিনিলয়।

তাকাল। আমি এভাবে অক্টোপাশের মতো ধরব ভাবতে পারেনি। নতুবা ভাবছে— হাজার হোক পুরুষ, সুযোগ পেলে ছাড়বে কেন?  সুন্দরবনের বাঘ আমাজানে গেলেও ঘাস খাবে না, মাংসই খাবে।
চোখ দুটো জলে জলে সয়লাব করে রাকু বলল, স্যার, চাকরিটা আমাকে দেন না। দেবেন তো?
আদিল বলল, আমরা চাইছি না, তোমার মতো একজন প্রতিভাবান মেয়ের জীবন কেরানিগিরিতে শেষ হয়ে যাক। তুমি অনেক দূর যাবে।
রাকু বলল, এক পা যাওয়ার রসদ আমার নেই, অনেক দূর যাব কীভাবে? চাকরিটা না-পেলে স্যার, আমরা পাঁচজনই শেষ হয়ে যাব।
আমি বললাম, ঠিক আছে। কী করা যায় দেখি।
মেয়েটি বসল না, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে অনামিকা দিয়ে নিজের ঠোঁট দুটো নিজেই চিমটিয়ে যাচ্ছিল। পায়ের দিকে তাকালাম। সস্তা দামের এক জোড়া স্যান্ডেলের উপর মহাদামি একটি প্রতিভা দাঁড়িয়ে। রবীন্দ্রনাথ হলে বলতেন,
এখানে সমুখে রয়েছে সূচির শর্বরী
ঘুমায় অরুণ সুদূর অস্ত-অচলে।
আমি কিছুই বললাম না। আমলাদের বেশি বলতে নেই। খান স্যারের সঙ্গে আলাপ করতে হবে। মেয়েটাকে চাকরি দেব না, কিন্তু চাকরি না-দিলে কী করে তার সমস্যার সমাধান করব? আমি যদি তাকে চাকুরি থেকে বঞ্চিত করি, তাহলে তার সমস্যা সমাধানের দায়িত্বও আমাকে নিতে হবে। বিপদে মৌখিক সহানুভূতি যে-কেউ দেখাতে পারে, কিন্তু উত্তরণানুভূতি কঠিন বিষয়। পা-হীনের প্রতি সহানুভুতি দেখানো খুব সহজ, কিন্তু তাকে পা-দান করা ভীষণ কঠিন।
রাকু এখনো কাঁদছে। আমি তাকলাম, কী মেয়ে, কাঁদছ কেন?
: স্যার, আমাকে চাকরিটা দেবেন। দেবেন তো?

ওয়েব লিংক
error: Content is protected !!