স্যমন্তক: মানুষ যেখানে মণির চেয়ে উজ্জ্বল

ড. মোহাম্মদ আমীন কোনো অর্বাচীন লেখক নন, তিনি নির্বাচিতদের একজন। তাঁর কোনো লেখা নিয়ে কিছু বলতে গেলে ভূমিকার দরকার পড়ে না। মানসম্পন্ন বক্তব্য, সে বক্তব্যের প্রতি তাঁর অবিরাম অনুরাগ, এবং পরম মমতা ও অনুরাগের মিশেলে সে বক্তব্যে অনুপম প্রকাশ তাঁকে নির্বাচিত বানিয়েছে, তাঁর লেখাকে পৌঁছে দিয়েছে উচ্চতার শিখরে, মানের চূড়ায়, শিল্পের শীর্ষাসনে। অসামান্য ভাষাজ্ঞান তাঁর লেখাকে করেছে পরিচ্ছন্ন, কাব্যিক সংলাপ তাঁর সৃষ্টিকে বানিয়েছে সুরেলা। মাতৃভাষার প্রতি সীমাহীন ভালোবাসা তাঁর রচনাকে করেছে মেদুর ও গভীর, যেমনটি গভীর ‘স্যমন্তক’ উপন্যাসের মূল চরিত্র ‘রচনা’।
 
‘স্যমন্তক’ উপন্যাসটি ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা স্যমন্তক সিরিজের প্রথম ও নাম উপন্যাস। এটি যেন একই রচনাকে দ্বিতীয়বার রচার পর্ব;
স্যমন্তক, স্যমন্তক সিরিজের প্রথম উপন্যাস। প্রকাশক: পুথিনিলয়। প্রথম উপন্যাস। লেখক: ড. মোহাম্মদ আমীন। প্রকাশক: পুথিনিলয়।
তবে এবেলায় বইয়ের পৃষ্ঠায়, শব্দের ভূষণে, সাহিত্যের অলংকারে। লেখক তাঁর উপন্যাসের নায়িকা হিসেবে চিরাচরিত রীতি অনুসরণ করে কোনো কাল্পনিক দেবীতুল্য সুন্দরীকে বেছে নেননি; নির্বাচন করেছেন অতি সাদামাটা এক অবয়ব, যে নিজেকে কালো ধূপকাঠি বলে স্বীকার করে নিয়েছে। লেখক নিজের মতো করে সে ধূপকাঠি পুড়িয়েছেন, মহল খুশবু করতে ছড়িয়েছেন সৌরভ, সংযমের চরম পরীক্ষায় উতরে গিয়ে সমাপ্তিতে বানিয়েছেন পরম আরাধ্য স্যমন্তক, সার্থক করেছেন গ্রন্থের নামকরণ।
 
‘স্যমন্তক কোন ধরনের উপন্যাস?’ এ প্রশ্নের জবাবে আমার উচ্চারণও প্রবেশিকায় লেখা ড. হায়াৎ মামুদের অনুরূপ— ‘এখানে সব ধরনের উপন্যাসের স্বাদ একত্রে পাওয়া যাবে।’ পাঠক যখন সামাজিক দুর্গতি-দুর্ভোগে ব্যথিত হবেন, তখন এটি তাঁর কাছে সামাজিক উপন্যাস হিসেবে ধরা দেবে। প্রবন্ধের ন্যায় প্রকৃষ্ট বন্ধনে দেওয়া এক-একটি জবাবে অভিভূত হয়ে পাঠক এটিকে মনস্তাত্ত্বিক উপন্যাস ভেবে বসলেও দোষ দেওয়ার কিছু থাকবে না। পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় ছড়িয়ে থাকা অনুরাগের আলপনা পাঠকের ভাবনায় রোমান্টিক জনরার উদয় ঘটালেও অবাক হওয়ার অবকাশ থাকবে না। একমহল প্রখ্যাত শিক্ষক, শিল্পী, সাহিত্যিক ও প্রশাসনকর্মীর সরব উপস্থিতি উপন্যাসটির গায়ে ‘ঐতিহাসিক’ তকমাও লাগিয়ে দিতে পারে। উত্তম পুরুষে বর্ণিত বর্ণনার ঢঙে আত্মজীবনীর প্রসঙ্গ চলে এলেও এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। লেখক নিজের অসামান্য দক্ষতায় এত এত আল্পনাকে এতটা নৈপুণ্যের সঙ্গে একবিন্দুতে জুড়েছেন যে, পাঠক ১৯২ পৃষ্ঠার উপন্যাসটি পড়তে গিয়ে শ্রেণিবিভাগের প্রয়োজনীয়তা বেমালুম ভুলে গিয়ে পাঠে বুঁদ হয়ে থাকবেন, পাঠের মজায় মজে সাহিত্যের অতলে তলিয়ে যাবেন। পাঠ শেষে সংবিৎ ফিরলে পরে বয়ে বেড়াবেন রেশ, এ যে শেষ হইয়াও হইল না শেষ; যেন মাত্র কোনো ছোটোগল্পের পাঠ শেষ হলো।
 
ভাষাজ্ঞানে ঋদ্ধতা ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখাকে কেবল স্বচ্ছই করেনি, পাশাপাশি বিচিত্রতাও দান করেছে, সংলাপকে দিয়েছে প্রাণ। তাতে উপন্যাসের চরিত্রগুলো যেন জীবন্ত হয়ে উঠেছে। দেশভ্রমণের অভিনব অভিজ্ঞতা তাঁর সংলাপকে করেছে সর্বজনীন, অকপটতা তাঁর সৃষ্টিকে করেছে বাস্তববাদী। স্যমন্তকের ক্ষেত্রেও এসবের ব্যতিক্রম ঘটেনি।
 
উপন্যাসের মূল চরিত্র ‘রচনা’। পরিবারের চরম দুর্দিন ঠেকাতে এক অদ্ভুত নাম ও দারুণ মেধায় সওয়ার হয়ে সামান্য কেরানির পদে নিয়োগ পাওয়ার স্বপ্ন নিয়ে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে গিয়ে লেখকের সঙ্গে তার প্রথম সাক্ষাৎ। সেই প্রথম দর্শনেই সদ্য উচ্চমাধ্যমিক পাশ করা বস্তির মেয়েটি সীমাহীন মেধা ও প্রতিভার ঝলকে লেখককে যেভাবে অভিভূত করেছে, তা দিয়েই উপন্যাসের সূচনা। তারপর লেখক উপন্যাসের প্রতিটি পৃষ্ঠায় তাকে নতুনভাবে রচেছেন, প্রয়োজনমতো কন্যা-মা-প্রেমিক-সেবিকার চরিত্রে চরিত্রায়িত করে বানিয়ে নিয়েছেন নিজের রচনা। রচনাকে সাজাতে নিয়ে এসেছেন আশি-নব্বই দশকের নামকরা সব মুখ। রাষ্ট্রপতি, কথাশিল্পী, জাতীয় অধ্যাপক, বিশ্ববিদ্যালয়ের নামকরা শিক্ষক, শিল্পী, সচিব, প্রশাসক— কারোর উপস্থিতিই বাদ যায়নি। এরশাদ, হাসনাত আবদুল হাই, কবীর চৌধুরী, আলাউদ্দিন আল আজাদ, আবদুল হক, মনিরুজ্জামান, আবদুল রাজ্জাক, আনিসুজ্জামান, আহমদ ছফা, হুমায়ূন আজাদ, এস এম সুলতান, হায়াৎ মামুদ, আবুল কাসেম ফজলুল হক, মমতাজ উদ্দিন আহমেদ প্রমুখ হচ্ছেন তাঁদের কজন। রচনাকে তাঁদের মধ্যমণি বানিয়ে তার জবানিতে ব্যক্ত করেছেন দরিদ্রের অসহনীয় বেদনার কথা; সমাজের দুর্গতির কথা, বৈষম্যের কথা; মানুষের লালসার কথা, হিংস্রতার কথা; পুরুষের কামনার কথা; নারীর ঈর্ষার কথা। সেসব বর্ণনা কত নিষ্ঠুর, কিন্তু অনিন্দ্য সুন্দর, চরম সত্য। খান-ছফা-আজাদদের বৌদ্ধিকসব মন্তব্য সেসবের খোলতাই বাড়িয়েছে, মহিমান্বিত করেছে; গফুর-শামসুলদের একগ্রন্থমুখিতা-ধর্মান্ধতা-গোঁড়ামি সেসবকে বানিয়েছে অনন্য।
 
আবার, উলটো ধারায় গিয়ে লেখক এই রচনাকে দিয়ে এঁকেছেন শ্রদ্ধা ও অনুরাগের চিরায়ত সুন্দরতা। পার্শ্বচরিত্রে আল্পনা, কল্পনা ও টুটুলকে এনে গানে, কবিতায়, নানান যুক্তিতর্কে, প্রাজ্ঞিকসব মন্তব্যে উন্মোচন করেছেন ভালোবাসার চিরায়ত রূপের নবরূপ, শ্রদ্ধার সীমারেখা; উভয়ের একাত্মতা-বৈরিতা। ‘সবকিছু ভাষায় প্রকাশ করতে নেই, করা যায়ও না; এ প্রয়োজনেই ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, স্নেহ প্রভৃতি শব্দের সৃষ্টি।’— লেখক
ড. মোহাম্মদ আমীন
এই দিকটি কী দুর্দান্তভাবে-না দেখিয়ে দিলেন; পঙ্‌ক্তিতে পঙ্‌ক্তিতে রচনাকে দিয়ে রচলেন এসবের নিত্যনতুন সংজ্ঞার্থ-মর্মার্থ। সেই ভাইভার দিনে জেগে ওঠা সাহসে ভর করে, হাজার লোকের টিটকারি-কানাঘুষা উপেক্ষা করে স্নেহ, অনুরাগ ও শ্রদ্ধার মিশেলে গড়ে ওঠা এক দুর্বোধ্য-স্পর্শকাতর সম্পর্কের ভেলায় ভেসে যে রচনা সম্পন্ন করবার জন্যে লেখক বদ্ধপরিকর হয়েছিলেন, অবশেষে বস্তির মেয়েকে রত্নে পরিণত করে অক্সফোর্ডে পৌঁছে দিয়ে তবেই রচনার রচনায় ক্ষান্তি দিলেন। এই ক্ষান্তির কি শেষ আছে? এ প্রশ্নের জবাব লেখক নিজেই দিয়েছেন—
‘… জীবনের মতো উপন্যাসও আমার থেমে থাকবে না। আমৃত্যু রচনাকে নিয়ে নতুন ঘটনা ঘটতে থাকবে। ওই ঘটনারাজি দিয়ে তৈরি হবে নতুন উপন্যাস। এভাবে চলতে থাকবে আমৃত্যু।…’
একবিংশ শতাব্দীর বাংলা সাহিত্যের এই অসাধারণ উপন্যাসটি পড়ার পর পাঠক হিসেবে আমাদেরও একই অবধারণ, একই উচ্চারণ।
 
স্যমন্তকের সামগ্রিক পাঠে মনোযোগী পাঠককে দুইটি জায়গায় বিড়ম্বনা পোহাতে হতে পারে। প্রথমটি বানানসংক্রান্ত বিচ্যুতি। আমি পরিচিতমহলে একটি কথা সবসময়ই বলি— অন্তত বানান ও শব্দ নির্বাচনে শুদ্ধতা ও পক্বতা আনবার জন্যে হলেও ড. মোহাম্মদ আমীনের বই পড়া উচিত। কিন্তু স্যমন্তকের পৃষ্ঠায় পৃষ্ঠায় বানান বিচ্যুতি এই মন্তব্যকে অনেকটা সন্দেহের দোলাচলে ফেলে দেয় বইকি। অবশ্য এর দায় লেখকের ওপর বর্তানোর সুযোগ নেই। যিনি বা যাঁরা কম্পোজ করেছেন, এবং যারা প্রুফ দেখেছেন, মূল দায়ভার তাঁদের বলা চলে। উপন্যাসের নায়িকা ‘রচনা’ হয়ে উঠবার আগেই তাকে ‘রচনা’ আজ্ঞায় সম্বোধন করাটা হচ্ছে উপন্যাসের দ্বিতীয় বিচ্যুতি। ড. মোহাম্মদ আমীনের মতো সচেতন লেখকের লেখায় এমন অসংগতি আমাকে অনেকটা বিস্মিত করেছে। আফজলদের মতো মহৎ হৃদয়াধারের উপস্থিতি স্যমন্তককে দিয়েছে মেদুরতা। বীরপ্রতীক আফজলের সরলতা এবং তাঁর মুখ দিয়ে কওয়ানো চাটগাঁইয়া সংলাপ পাঠকের মনে যে দীর্ঘদিনের জন্যে জায়গা বানিয়ে নেবে, তা বলাই বাহুল্য। তবে তাঁর সংলাপের কিছু শব্দ লেখার ধরন খানিকটা বেখাপ্পা ঠেকেছে; বিশেষ করে অপ্রয়োজনীয় মহাপ্রাণ ধ্বনিনির্দেশক বর্ণের ব্যবহার কিংবা প্রয়োজনীয় জায়গায় মহাপ্রাণ ধ্বনিনির্দেশক বর্ণের অভাব। পাশাপাশি তাঁর সংলাপে ঘৃষ্টধ্বনিনির্দেশক ‘চ-ছ’ এবং ওষ্ঠ্যধ্বনিনির্দেশক ‘প’-এর নিয়মিত ব্যবহারও দৃষ্টিকটু ও শ্রুতিকঠোর লেগেছে। কেননা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় এসব ধ্বনির অস্তিত্ব নেই। আশা করি লেখক সম্প্রতি বইটি পরিমার্জনের যে পদক্ষেপ নিয়েছেন, তাতে এরূপ ছোটো ছোটো বিচ্যুতিগুলো বিবেচনায় রেখে বইটিকে উৎকৃষ্টতর থেকে উৎকৃষ্টতম হিসেবে প্রমাণ করবেন।
 
সবশেষে, এই অনবদ্য সংযোজনের মাধ্যমে সাহিতভান্ডারকে সমৃদ্ধ ও আলোকিত করায় প্রিয় লেখকের এবং তাঁর রচনার প্রতি অফুরান শুভকামনা জানিয়ে, এবং উপযুক্ত ব্যক্তির হাতে পড়ে নানান ভাষায় অনুবাদের মাধ্যমে স্যমন্তকের আলোকছটা বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়বে, সে আকাঙ্ক্ষা ব্যক্ত করে আমার লেখার ইতি টেনে দিচ্ছি।
 
 
প্রয়োজনীয় পরামর্শ দিয়ে সহযোগিতা করেছেন: বন্ধুবর তাহসিন ঐশী
 
ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা নিচের উপন্যাসগুলো একসঙ্গে এক মলাটে পড়ার জন্য ক্লিক করুন নিচের লিংকে:
 
 
 
 
 
পড়তে পারেন স্যমন্তক বিষয়ে নিচের আলোচনাগুলো:
 
 
 
 
error: Content is protected !!