স্যমন্তক: শেষ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন
বিমান বন্দরের ভিআইপি বিশ্রামাগার পার হয়ে তিন নম্বর গেটের দিকে এগিয়ে যাই। রচনা আমার ডান বাহু দিব্যি সজোরে আঁকড়ে আছে। একটি বারের জন্যও ছাড়েনি, সেই গাড়িতে উঠার সময় ধরেছে। তার মনে হচ্ছে ছেড়ে দিলে আমি হারিয়ে যাব। নিয়ে যাবে কেউ মূল্যবান কোন বস্তুর মতো।
যেতে যেতে দেখলাম ড. কামাল সিদ্দিকী উলটো দিক হতে আমাদের দিকে এগিয়ে আসছেন। তিনি সরকারের সচিব। আমি রচনার হাত থেকে আমাকে ছড়িয়ে নিয়ে তার দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলাম।
রচনা আমাকে ছাড়ল না।
বললাম, হাত ছাড়, কামাল সিদ্দিকী স্যার আসছেন।
ছাড়ব না।
কয়েক মিনিট মাত্র।
এক নিঃশ্বাসের জন্যও ছাড়ব না। তিনি কি আমার ওই সময়গুলো ফেরত দিতে পারবেন? ছাড়ব কেন?
আচ্ছা বাবা, ছাড়তে হবে না।
স্যার, অধিকার বন্যপাখির মতো অবাধ্য। একবার ছেড়ে দিলে সহজে পাওয়া যায় না। আমি ছাড়ব না।
ততক্ষণে কামাল স্যার আমাদের দেখে ফেলেন, কী লেখক, কোথায় যাওয়া হচ্ছে?
লন্ডন।
ভাবির সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলে না যে?
স্যার, এ আমার স্ত্রী নয়।
বুঝেছি, গার্লফ্রেন্ড।
রচনা লজ্জা না-পেয়ে মুচকি হাসি দিয়ে আমার দিকে তাকাল। আমি লজ্জায় মুচকি হাসি দিয়ে কথা ঘুরানোর চেষ্টায় বললাম, স্যার, কোন দেশে গিয়েছিলেন?
ফ্রান্স থেকে আসছি। ভালো থেকো- বলেই কামাল সিদ্দিকী তার পথে হাঁটা শুরু করলেন।কামাল সিদ্দিকী চলে যাওয়ার পর রচনা বলল, স্যার, আমি যাওয়ার পর আমার ভাইবোনদের সঙ্গে থাকবেন তো?
প্রয়োজন নেই।
রচনা অসহায় কণ্ঠে বলল, আর্থিক প্রয়োজন হয়তো নেই, আমার যে স্কলারশিপ, তার অর্ধেকই আমার জন্য যথেষ্ট। বাকিটা তাদের জন্য খরচ করতে পারব। আপনার দান তো মানুষের ছিল না ঈশ্বরের। এ কি কখনো শেষ হয়! কিন্তু আপনার প্রয়োজন কখনো ফুরোবে না স্যার।
আমার ওখানে থাকার কী প্রয়োজন?
ঈশ্বর কাউকে পুরো পৃথিবী দিয়ে দিলেও ঈশ্বরের প্রয়োজনীয়তা কমে না, বরঞ্চ বেড়ে যায়। পৃথিবীটা ঈশ্বরের।
রচনার প্রতিটা কথা বুকে আঘাত করছে। এদিকে সময় ফুরিয়ে আসছে। সবাই ঢুকে গেছে। শেষ যাত্রী রচনা। তার সে খেয়াল নেই, সব খেয়াল ছেড়েছুড়ে দিয়ে উদ্্ভ্রান্তের মতো পায়ের নিচে বসে পড়ল।
আবার কী?
স্যার, আমি জুতো খুলব।
রচনা জুতো খুলল, মোজা খুলল। কিছু লোক দাঁড়িয়ে কাণ্ড দেখছে। আমি যেন হারিয়ে গেছি বিস্মরণের স্মরণে। রচনা পায়ের উপর সেজদার ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ পড়ে থাকল, যতক্ষণ না টেনে তুললাম। লজ্জায় আমি ঘেমে একাকার।
চলো, সময় নেই। এবার যেতে হবে।
যাচ্ছি।
আমি বললাম, তোমাকে ছেড়ে থাকতে কষ্ট হবে। ভালো থেকো মেয়ে। আমি যাব তোমার কাছে যখনই সময় পায়, সুযোগ হয়। বারবার যাব।
রচনা কেঁদে ওঠে, এত জোরে কেঁদে উঠবে ভাবিনি। আরও কিছু চোখ আমাদের কাণ্ড দেখার জন্য দাঁড়িয়ে, অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে আমাদের দিকে। বাঙালির কৌতূহল বড়ো সস্তা। তাদের কৌতূহলে মমতার চেয়ে হুজুগে আগ্রহের পরিমাণ প্রবল। তাই সামান্য ঘটনাতেই কাকের মতো জড়ো হয়ে যায়।
আমি শোকাবহ গলায় বললাম, উড়োজাহাজ কিন্তু ছেড়ে যাবে।
আমি যাব না, কিছুতেই না।
রাগের মাথায় চড় দিয়ে বসলাম। পরক্ষণে বুঝতে পারলাম, বড়ো ভুল হয়ে গেছে। ছয় বছর যার গায়ে একটা বালি পড়তে দেইনি, তার গালে চড় দিলাম! তাও আবার এতগুলো লোকের সামনে, উপরন্তু বিদায় বেলায়, ছি!
যাও বলছি মেয়ে।
মেরে ফেললেও যাব না। আপনার চড়ে জেগে উঠা চরে পড়ে থাকব।
রচনার কথায় আমার অভিমান আরও জোরালো হলো। জোরালো অভিমান রাগের ভাই। অনেকটা অভদ্রের মতোই বলে দিলাম, যাবে না কেন?
অক্সফোর্ডে আমার কেউ নেই।
এখানে তোমার কে আছে?
আপনি।
আমি তোমার কে?
ঈশ্বর।
ঈশ্বর সর্বত্র বিদ্যমান।
আমি আমার ঈশ্বরের কাছাকাছি থাকতে চাই, চরণের কাছাকাছি।
কান্নাকে বুকের ভিতর চেপে ধরে বললাম, এসব সস্তা সেন্টিমেন্টাল ডায়ালগ রাখ। দোহাই তোমার, এবার যাও, তোমার ঈশ্বরের নির্দেশ।
রচনা অবিশ্বাসের চোখে আমার দিকে তাকিয়ে বলল, আমি এমন নিষ্ঠুর প্রত্যাখ্যানের প্রতিশোধ নেব। ঈশ্বরও রেহাই পাবে না। মেয়েদের প্রতিহিংসা থেকে কেউ রক্ষা পায়নি।
এমন কঠিন কথা শুনে আমি নিষ্পলক।
চোখ পড়ল তার কপোলের বাম দিকে, ওখানে ছোটো একটা তিল, কৃষ্ণ মেঘের চেয়েও নিকষ হয়ে জেগে আছে। মনে হলো শোকের চিহ্ন হয়ে এ মুহূর্তে উদিত হয়েছে। কৃষ্ণ গহ্বরের মতো চিকচিক করছে ওই তিল। এ তিল কি আস্তে আস্তে বড়ো হয়ে সারা পৃথিবী ছড়িয়ে পড়বে?
রচনা আমার দিকে ফিরে ফিরে উড়োজাহাজেরে দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। আমার বুক ফেটে যাবার যোগাড়। তিলটা আরও স্পষ্ট হচ্ছে। এতদিন এটি ছিল না, না কি আমি দেখিনি? এতকিছু দেখার চেষ্টাও করিনি কখনো। এটাই কি তাহলে প্রিয়ের আর মেয়ের পার্থক্য?
ইচ্ছে করছে ডাক দিয়ে বলতে, এই মেয়ে যেও না, ছুঁয়ে দেখি তোমার তিলটা, আরেক বার দেখে নিই ভালো করে। আমি যেন রচনার উত্তর শুনতে পাচ্ছি
এতদিন দেখেননি কেন?
এই মুহূর্তে কামনা করছি রচনা শুধু আর একবার বলুক, যাব না। আর একটি বার অবাধ্য হোক। ফিরে আসুক।
রচনা ফিরে ফিরে তাকাচ্ছে, কিন্তু ফিরে আসছে না।
হঠাৎ দেখলাম রচনা হাতের ব্যাগটা ফেলে দৌড়ে আসছে আমার দিকে। এসেই বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমি আনন্দে রোমাঞ্চিত, ঈশ্বর আমার কথা শুনেছেন। রচনা আর যাবে না।
রচনা জড়িয়ে ধরা অবস্থায় কানে কানে বলল, ঈশ্বরের আদেশ অমান্য করতে পারলাম না। তাই যেতে হচ্ছে, চলে যাচ্ছি। স্যার, আই লাভ ইউ অ্যাজ আই লাভ মাইসেল্ফ।
ভালোবাসার কথা বললেও তার গলার আওয়াজে শ্রদ্ধা ছাড়া এক ফোঁটা ভালোবাসাও পেলাম না। এতক্ষণ যে বোধ তার ভেতর দীপ্ত ছিল প্রেমিকায় তা এখন মিশে গেছে শ্রদ্ধায়।
পরিচয়ের প্রথম দিকে আমি ছিলাম রচনার শ্রদ্ধা, তারপর হয়ে যাই ভালোবাসা। এখন তার ভালোবাসাগুলো আবার শ্রদ্ধায় শ্রদ্ধায় পুজো হয়ে আরতির মতো স্তব্ধ করে দিয়েছে আমার সত্তা। আমি চোখ বুজে আছি শিহরনে। আমার দিক থেকে স্নেহ আর ভালোবাসা তার দিক থেকে কেবল শ্রদ্ধা। সবকিছু উলটে গিয়েছে, নাকি আমি উলটে দিয়েছি?
মুখের কথা মুখে রেখে দিয়ে জড়িয়ে ধরা অবস্থায় কানে কানে বললাম, সব ঠিক হয়ে যাবে মেয়ে, আমি চিরদিন তোমার থাকব। মেয়ে, আই লাভ ইউ, এ বন্ধন ছিঁড় না।
বন্ধন ছিঁড়ে গেল।
মাইকে রচনার ডাক পড়ল।
আমাকে ছেড়ে দিয়ে বাতাসের বেগে উড়োজাহাজের দিকে ছুট দিল।
আমি তার চলার পথে তাকিয়ে ঝরনার মতো চঞ্চল এলোমেলো চরণ, আমি কষ্টের পাহাড় হয়ে দেখছিলাম। ঝরনার গতি আমার বুক থেকে খসিয়ে নিচ্ছে টুকরো টুকরো কলিজা। যেভাবে পাহাড়ের মাটি খসিয়ে নেয় ঝরনা। রচনাকে আর দেখা যাচ্ছে না।
আমি জানি রচনা আমার কেউ না। আবার বলা যায়, রচনা ছাড়া আমার কেউ নেই। ভালোবাসা মানুষের মনে এমন অস্থির সাংঘর্ষিকতা সৃষ্টি করে। তবু মানুষের জীবনে ভালোবাসা মৃত্যুর মতো অনিবার্য। তাই মৃত্যুর মতো আকস্মিক কোনো পূর্ব অনুমান ছাড়াই নেমে আসে।
ভালোবাসা কী?
অকাশ জানাল সত্য
সত্য মানে কী?
প্রকৃতি জানাল মৃত্যু
চারদিক থেকে ধেয়ে এল অগণিত উত্তর
জেনে রেখো
এটাই কেবল সত্য।
—————————————-
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
error: Content is protected !!