স্যমন্তক: ষট্‌পঞ্চাশত্তম পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন

খান স্যারের অফিসে যাব।টুটুল জুতো এনে দিয়েছে, আল্পনা পরিয়ে দিয়েছে শার্ট। কল্পনা চিরুনি আনতে গেছে। রচনা সাজঘরে। সে এসে দেখবে আমার সাজ পুরোপুরি ঠিক আছে কি না। তারপর বের হওয়ার অনুমতি মিলবে।
রচনাদের হৃদয়কাড়া ভালোবাসার নিবিড় পরশ আমাকে আলসে করে দিয়েছে। মন শুধু ‘দাও দাও’ আর ‘পাই পাই’ করে। সামান্য কারণে অযথা অভিমানে ফুলে ওঠে মন। মনে হয়, কম দিচ্ছে দিন দিন; কম পাচ্ছি প্রতিদিন। তাহলে কী মূল্য আমার কমে যাচ্ছে? আসলে কম পাচ্ছি না, চাহিদা বেড়ে যাচ্ছে বলে কম মনে হচ্ছে। এভাবে প্রাচুর্য আর অধিক প্রাপ্তি মানুষকে তৃপ্তি হতে অতৃপ্তির রসাতলে নিয়ে যায়। যত বেশি প্রাপ্তি তত বেশি অতৃপ্তি। যত বেশি আয়, তত বেশি হায় হায়; যত বেশি আশ, তত বেশি নাশ।
দশটার আগে খান স্যারের রুমে পৌঁছে গেলাম।তিনি  চার জন বাংলাদেশি ও তিন জন বিদেশির সঙ্গে সোফায় বসে আলাপ করছেন। বাংলাদেশিদের মধ্যে একজন কবীর চৌধুরী অন্য একজন মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ। বাকি দুজন আমার অচেনা। তবে মুখে হোমড়াচোমড়া ভাবটা বেশ পুষ্ট; যেটাকে আমি অপছন্দ করি।
আমাদের দেখে খান স্যার বালকের মতো চঞ্চল গলায় উচ্ছ্বাস বিলিয়ে বললেন, একি আমার মানিকজোড়, এতদিন পর? বসো বসো।
খান স্যারের অনুমতি পেয়ে আমি আর রচনা সোফায় বসে পড়লাম।
আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়ে খান স্যার সবার, বিশেষ করে বাংলাদেশিদের উদ্দেশে ইংরেজিতে বললেন, একটা অফিসারের কথা বলি না , এ সেই ছেলে। অসম্ভব সাহসী। অনেকে বলেন ওভারস্মার্ট। আনস্মার্টের কাছে বকের  মাছ ধরাটাও ওভারস্মার্ট। ভিক্ষুকের কাছে যে-কোনো পথচারী টাকার কুমির।
কবীর চৌধুরী বললেন, রচনা আমার অনুবাদ সহায়িকা। আমি ডাকি রাকু।
খান স্যার অট্টহাসি দিয়ে বললেন, আর এই ছেলে তো নষ্টের একশেষ। তার মতে, সিএসপি মানে ক্রিমিনাল সাপ্লাইয়ার্স টু দ্যা পলিটিশিয়ানস। আমার আন্ডারে চাকরি করে আমাকেই অপবাদ! কত বড়ো সাহস!
মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ বললেন, এই মেয়েটাই বুঝি রচনা?
হ্যাঁ, আমি বললাম।
 তুমি না বলেছিলে রাকু?
খান স্যার বললেন, ঠিক ধরেছেন। গতকালের রাকু আজকের রচনা।
কবীর চৌধুরী হাসলেন, রচনা ও রচয়িতা দুজনই আমার পূর্ব পরিচিত। রচনা ইংরেজির সাগর। তার অনুবাদ ক্ষমতা অসাধারণ। কবিতা পর্যন্ত কবিতার মতো অবিকল অনুবাদ করে দিতে পারে। সে জানে উৎস ভাষার মতো কীভাবে অনুবাদেও শব্দকে ঠিক রাখতে হয় ।
খান স্যার বললেন, রচনা আসলেই জিনিয়াস।
কবীর চৌধুরী বললেন, মোর দ্যান জিনিয়াস। যা প্রত্যাশা করি তার চেয়ে বেশি পাই। আমার অনুবাদকে নতুন করে অনুবাদ করে সে।
সিগারেটে পরপর কয়েকটা টান দিয়ে খান স্যার বিদেশিদের দেখিয়ে বললেন, আমার মুখোমুখি বসে আছেন ড্যানিয়েল কোয়েন, ফরাসি। তাঁর পাশে মিস্টার স্টেইন। উভয়ে অক্সফোর্ডের ভাষাতত্ত্বের অধ্যাপক। মাঝখানে মিস্টার ক্রিল, ব্রিটিশ কাউন্সিলের প্রধান। ওনারা অক্সফোর্ডের ভাষাতত্ত্ব বিভাগের প্রাচ্য শাখাকে আরও কার্যকর করার জন্য বাংলা ভাষায় দক্ষ একজন মেধাবী নেবেন। আমি সুযোগ পেয়ে রচনাকে আদ্যোপান্ত তুলে ধরতে শুরু করি। মাঝে মাঝে ভুলে যাওয়া বিষয়গুলো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছিলেন খান স্যার ও কবীর চৌধুরী।
রচনা ফরাসি ভদ্রলোকের সঙ্গে ফ্রেঞ্চ ভাষায় এমন ভাব জমিয়ে দিল— যেন দুজন একই মহল্লার বাসিন্দা। ছোটো ছোটো ঈর্ষায় আমার কপলটা নড়ে ওঠে। পরক্ষণে আনন্দের গর্ভ হতে জন্ম নেওয়া গর্ব আমার স্বপ্নকলিকে ফুলের মতো পাপড়িতে ফুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছিল। বুক আমার তৃপ্তিতে  বৃক্ষ।ব্রিটিশ কাউন্সিলের পরীক্ষায় প্রথম হয়েছে জেনে মিস্টার ক্রিল রচনার প্রতি বেশ আগ্রহ দেখাতে শুরু করেন। রচনা তার সঙ্গে ইংরেজের মতো অনর্গল ইংরেজি বলে যাচ্ছেন। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে।
স্টেইন বললেন, রচনাকে অক্সফোর্ডে নিয়ে যাব।
স্টেইনের কথায় আমার কলিজা ছ্যাঁৎ করে ওঠে।
আবার ঈর্ষা।
রচনা চলে যাবে, তাহলে আমার কী হবে? আমার নখ কেটে দেবে কে? মাথা ব্যথা করলে কে টিপে দেবে? জ্বরে কে উষ্ণতা নাশক উষ্ণতা দেবে? পরমুহূর্তে মনে হলো, যার কল্যাণের জন্য আমি সর্বস্ব ত্যাগ করতেও দ্বিধা করিনি, আজ তার কল্যাণে এমন স্বার্থলোলুপ মনোবৃত্তি কেন? মানুষ কি  আসলেই নিকৃষ্ট জানোয়ার বলেই উৎকৃষ্ট দাবি করে? ছি!
তারপরও বুকটা ধড়ফড়িয়ে ওঠে। চোখের কোণ জলে ভিজে গেল অযথা। ইদানীং চোখে জল আসার পরিমাণ মারাত্মক বেড়ে গেছে। সামান্য ভালোবাসা পেলে মনটা কার্তিকের মেঘের মতো সৌম্য দেবতা কার্তিক হয়ে ওঠে। আবার সামান্য অবহেলায় ক্ষুদ্ধ হয়ে ওঠে। এটি সুলক্ষণ নয়।
মিস্টার স্টেইন আর ক্রিল কি বলেছ শুনেছ? আমি খান স্যারের কণ্ঠে সম্বিৎ ফিরে পাই, শুনেছি স্যার।
রচনাকে ঘিরে সবার আলোচনা। আমি গুরুত্বহীন—অনাহুতের মতো বসে থাকা নির্জীব এক অপ্রয়োজন। শুধু কথা শুনছি আর মাঝে মাঝে সায় দিয়ে যাচ্ছি। কোনো আলোচনায় আমার এমন গুরুত্বহীন উপস্থিতি ইতঃপূর্বে ছিল না। রচনার খিলখিল হাসি আর বিদেশিদের সঙ্গে আলাপ আমার বুকে হাতুড়ি মেরে যাচ্ছিল। মনে হচ্ছে—  এরা সবাই  আমাকে ধাক্কা দিয়ে খুব কাছের কাউকে দূরে নিয়ে যাবার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত। মনে হচ্ছে রচনা আমাকে আর পাত্তা দেবে না। বিদেশি পেয়ে আমার মতো নগণ্য জনকে মুহূর্তে ভুলে গেল; অবাক তো!
খান স্যার বললেন, শোনো রচনা, তুমি অক্সফোর্ড যাচ্ছ। তবে শর্ত আছে।
রচনা মৃদ হেসে বলল, কী শর্ত স্যার?
তুমি বাংলাদেশ ছাড়তে পারবে, কিন্তু তোমাকে ছাড়তে পারবে না।
আলোচনায় কিছুটা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার জন্য আমি বললাম, এটি কীভাবে সম্ভব?
“তুমি বুঝবে না। তুমি একটা গর্দভ! মেয়েটার মতো যদি হতে! চুপ মেরে আমরা কী বলছি তা শোনো।”খান স্যার আমার গুরুত্বহীনতাকে আরও বড়ো করে তোলার জন্যই  যেন কথাগুলো বললেন, “রচনা মা তুমি বলো?”
রচনা বলল, আমি যেখানেই যাই, মন যেন পড়ে থাকে বাংলাদেশে।
রাইট।
আমি বললাম, আমরা তাহলে আসি?
এসো। তবে রচনার বায়োডাটা কালই পাঠিয়ে দেবে।
তাই হবে।
একটা কথা মনে রাখবে, মানুষ আসে আর যায়, কিন্তু যে গুরুত্বপূর্ণ এবং নিজেকে গুরুত্বপূর্ণ করে তুলতে পারে সে কখনো যায় না, হারায় না। সে কেবল আসে, কেবল আসে। আমি কি বলেছি বুঝতে পেরেছ?
স্যার।
খান সারের রুম থেকে বের হয়ে এসে দেখি ড্রাইভার,  পোস্ট মাস্টার কী বলেছেন? কিছু দিয়েছেন?
আমার দিকে দুই টুকরো কাগজ এগিয়ে দিয়ে ড্রাইভার বলল, এই দুই কাগজে আপামণির দুটি স্বাক্ষর লাগবে।
রচনা স্বাক্ষর করে দিল। ড্রাইভারকে কাগজগুলো পোস্ট  মাস্টারকে দিয়ে অফিসে চলে আসতে বলে অফিসের দিকে হাঁটা শুরু করলাম। আমার পেছনে রচনা। কয়েক মিনিটের মধ্যে চলে এলাম। এতক্ষণ রচনার সঙ্গে একটা কথাও বলিনি। রচনা কয়েকবার বলতে চেয়েছে, কিন্তু জবাব না-দেওয়ায় চুপ হয়ে যায়। আমার অভিমান আছে, তার কি থাকতে নেই?
অফিসে ঢোকার পরও কোনো কথা বললাম না। কাজের অজুহাতে রচনাকে উপেক্ষা করে যাচ্ছি। সেও থম ধরে আছে। ড্রাইভার চলে এসেছে। সে জানাল আর কিছু লাগবে না। গাড়িতে ওঠার পর আরও গাম্ভীর্য এনে মুখটাকে ভয়ংকর করে তোলার চেষ্টা করছি। এটি একটি বাজে অভ্যাস। এ বাজে অভ্যাসটি আমার খুব বাজেভাবে আছে।
রচনা আমার কাঁধে ছোটো একটা ধাক্কা দিয়ে বলল, স্যার, কী হয়েছে আপনার?
আমি নীরব। নীরবতা সাময়িক ওজুহাত হলেও কাউকে রক্ষা করতে পারে— এমন নজির খুব একটা নেই।
“বলুন-না কী হয়েছে?”, আমার হাত নিয়ে খেলতে খেলতে রচনা বলল, কথা বলছেন না কেন?
আমি চুপ।
আমি কী করেছি?
কিছু না।
আরও কাছে চলে আসে রচনা, আমি কি স্যার কোনো ভুল করেছি?
তুমি ভুল করনি, ভুল করেছি আমি।
তাহলে আমার সঙ্গে এমন করছেন কেন?
আমার কোনো কিছু হারাতে ভালো লাগে না। যদিও জানি— একসময় আমার কিছু ছিল না, আমি নিজেও ছিলাম না।
আমি কিছু বুঝতে পারছি না।
বুঝতে পারছ না, না কি না-বোঝার ভান ধরেছ? তোমাকে চিনতে আমার বাকি নেই। মানুষ মাত্রই স্বার্থপর, মানুষ মাত্রই নিমক হারাম।
রচনা এবার আমার মাথাটা তার কাঁধে টেনে নিয়ে বলল, স্যার, কী হয়েছে বলুন? এভাবে রেগে গেলে জিহ্বা নিয়ন্ত্রণহীন হয়ে পড়ে। নিয়ন্ত্রণহীন জিহ্বা পাগলের হাতে তুলে দেওয়া ধারালো তরবারির চেয়েও ভয়ংকর।
আমি চুপ। লজ্জা ঘিরে ধরেছে মন। একদম উচিত শিক্ষা দিয়েছে মেয়েটি।
বলবেন না? না-বললে আমি কিন্তু এখানেই নেমে যাব গাড়ি থেকে।
কিছু হয়নি।
আমি নেমে যাব কিন্তু, রচনা আবার বলল।
ক্ষণিক বিষয়ের জন্য কোনো স্থায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া বোকামি। আমার রাগ পাখির ডাক, এই আছে এ নেই। যদি রচনা নেমে যায়, কী হবে? মেয়েটা বাসায় যাবে কীভাবে? যা অভিমানী, যে কিছু করে ফেলতে পারে। হয়তো নাও যেতে পারে বাসায়। আমি বুঝতে পারলাম, এমন করে বলা ঠিক হয়নি।
বলবেন না কি নেমে যাব? রচনার গলায় হুমকি।
তুমি চলে গেলে আমার কষ্ট হবে না বুঝি?
রচনা হাসিতে উদ্ভাসিত হয়ে বলল, স্যার, রচনা সবসময় আপনার।
রচনা হাসছে। তার হাসি আমার শরীরে আরও অভিমান ছড়িয়ে দিচ্ছে।
এই মেয়ে হাসছ কেন?

আমি স্যার সবসময় হাসব, পৃথিবীর অবারিত আলো-বাতাসই একজন মানুষের হাসির জন্য যথেষ্ট শর্ত। এজন্য ব্যাংক ব্যালেন্স

Kabir Chowdhury

অনাবশ্যক। হাসি সৃষ্টিকর্তার প্রতি সর্বোচ্চ কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন। যখন খান স্যারের রুমে আমাকে অক্সফোর্ডে নিয়ে যাওয়ার কথা শুনেছিলেন, তখন থেকে আপনাকে লক্ষ করছি। আমি সব বুঝেছি?

কী বুঝেছ?
আপনি আমাকে ভালোবাসেন।
তাতে কী? ভালোবাসাই সভ্যতার ফ্ল্যাটফরম।
আপনি আমাকে কতটুকু ভালোবাসেন?
If a hug tells how much I love you, I would hold you in my arms forever.
আমি স্যার আপনার রচনা, আপনাকে ছেড়ে কোথাও যাব না, কোথাও না।
আমি ধরা পড়ে গেছি রচনার কাছে। বললাম, কেউ যেতে চায় না, সবাইকে যেতে হয়। আসা-যাওয়ার মাঝখানে কাছাকাছি থাকার সময়টুকুই প্রাপ্তি। বাকিটুকু ওই প্রাপ্তির ক্ষেত্রকে প্রশস্ত করে মাত্র।
আমি যাব না। বাংলার মাটি আঁকড়ে পড়ে থাকব।
কেন?
দূরে গেলে হারিয়ে যাবেন, ভুলে যাবেন, কষ্ট পাবেন। আমি কোনোটা চাই না। যেখানে আপনি নেই সেখানে আমি থাকতে পারব না।
আমি গুনগুন করে নিজের মনে নিজে নিজে গাইলাম—তুমি রবে নীরবে হৃদয়ে মম- – -।রচনা শুনতে পেল না।  মায়া ভরা চোখে আমর দিকে তাকিয়ে বলল, স্যার, আমি অনেক কষ্টে আমার মনে আপনাকে ধারণ করে রেখেছি। বুক এখন আমার পূর্ণ।  আমার কথা মনে রাখবেন। আমি আপনাকে কখনো ভুলতে পারব না, দূরেও যেতে পারব না।
 তোমাকে যে দূরে যেতে হবে, মেয়ে।
ভুলতে না পারলে কি দূরে যাওয়া যায়?
যায়, আমি সংশয়ী গলায় বললাম।
 সে তো মৃত্যু!
—–
error: Content is protected !!