স্যমন্তক: ষষ্টিতম পর্ব 

ড. মোহাম্মদ আমীন

স্যমন্তক: ষষ্টিতম পর্ব (৬০)

স্লামুআলাইকুম।
রিসিভারের অপর প্রান্ত থেকে উত্তর এল, আমি আবদুল হামিদ খান। স্লামুআলাইকুম, স্যার।
কোথায় তুমি?
অফিসের জন্য রেডি হচ্ছিলাম।
অফিসে হাজিরা দিয়ে আমার সঙ্গে দেখা করো। রচনাও যেন আসে।
জি স্যার।
ইফাদ-লোনের কাগজপত্রগুলোও নিয়ে আসতে ভুলো না।
সব কাগজ পোস্ট অফিসে জমা করে দিয়েছি। আজই মনে হয়ে চেক পেয়ে যাব।
বাহ্, তুমি তো আমার মনের কথা আমার আগে পড়তে পার।
এক ঘণ্টার মধ্যে হাজির হয়ে যায় খান স্যারের রুমে। অফিসে ভিড়, ফাইল নিয়ে সবাই ছোটাছুটি করছেন। আমি আর রচনা দুজনেই স্যারকে পায়ে ধরে শ্রদ্ধা জানালাম।
স্যার, আপনাকে খুব ব্যস্ত মনে হচ্ছে।
খান স্যার বললেন, আগামী সপ্তাহে অবসরে যাচ্ছি। যদি প্রয়োজন না-হয় ঋণটা ফেরত দিয়ে দিও। ইট উইল বি সেভ অল অব আস। বাই দা বাই তোমার পেছনে অনেকে লেগে আছে- আমি না-থাকলে বিপদে পড়ে যাবে। রচনার বাবাকে দেওয়া ঋণটা নিয়ে এগারোটা কমপ্লেইন পড়েছিল। আমি তোমাকে জানাইনি। মঙ্গলের নিমিত্তে কৃত কোনো কাজই অন্যায় নয়; হোক তা মানুষ খুন। অজ্ঞতা এক ধরনের অপরাধ, তাই না?
জি।
কিন্তু কোনো তথ্য যদি তোমাকে আহত করে তাতে অজ্ঞ থাকাই উত্তম।
আপনার প্রতি অন্তহীন কৃতজ্ঞতা।
আমরা বের হওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছিলাম।এসময় একজন প্রবীণ রুমে ঢুকলেন। মুখে দাড়ি। চিনতে পারলাম, শামসুল আলম, তিনি আমাদের খান স্যারেরও সিনিয়র। জবরদস্ত সিএসপি। প্রশাসনবিষয়ক কিছু লেখালিখিও করেছেন।
খান স্যার ‘রচনা’ বলতেই শামসুল আলম সাহেব বললেন, কী বললে?
রচনা। এই মেয়ের নাম রচনা। আসলেই রচনা, প্রতিভার ঝুড়ি।
শামসুল আলম সাহেব রচনাকে বললেন, নাম রচনা, তুমি মা হিন্দু না মুসলিম?
রচনা বলল, প্রশ্নটা শুনতে শুনতে স্যার, এমন হয়ে গেছি, কাউকে দেখলে বলতে ইচ্ছে হয়, নাম পরে, আগে বলুন ধর্ম কী? প্রতিদিন অন্তত কয়েকবার করে শুনতে হয়েছে। কাউকে উত্তর দিইনি।
সামশুল আলম সাহেব বললেন, তুমি ধর্ম বিশ্বাস কর না?
রচনা দীপ্ত গলায় বিনয় মেখে বলল, ধর্ম নামের প্রাতিষ্ঠানিক কোনো কিছু আমি অর্জন করিনি, আমার কাছে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম আমার মা-বাবা থেকে পাওয়া কিছু প্রথাগত আচরণ। ব্যক্তিগতভাবে আমার কাছে ধর্ম হচ্ছে প্রকৃতিগতভাবে পাওয়া আমার বৈশিষ্ট্য। যেমন: আঘাতে ব্যথা, চামড়া কেটে গেলে রক্ত, কষ্টে কান্না, দুঃখে হাসি- – -।
কী বললে? চিৎকারের মতো শোনাল শামসুল আলম সাহেবের গলা।
রচনা স্বাভাবিক গলায় বলল, ধর্ম একটি বিশ্বাসগত স্থিতি। স্যার, প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মবিশ্বাস পুরোপুরি অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল। এজন্য কেউ বর্তমান প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম ত্যাগ করে নতুন ধর্ম গ্রহণ করলে পূর্ব ধর্মবিশ্বাসের সবকিছু তার কাছে বাতিল হয়ে যায়।
তুমি খচ্চর টাইপের মেয়ে, জ্ঞানপাপীদের মতো কথা বলছ।
খান স্যার বললেন, মেয়েটা খুব মেধাবী।
মেধাবীরা নাস্তিকই হয়। রচনা একটা মালাউনি নাম। এ নামের জন্য আল্লাহর কাছে জবাবদিহি করতে হবে। আরবি নামের অভাব আছে, খান?
আমি কথার মোড় ঘুরানোর জন্য বললাম, স্যার, কষ্ট হচ্ছে। এক সপ্তাহ পর আপনি আমাদের মাঝে থাকবেন না। একজন নির্ভরশীল অভিভাবক দূরে চলে গেল।
খান স্যার বললেন, এভাবে একদিন দুনিয়া থেকেও চলে যাব। নতুন আসবে, পুরাতন ঝরবে।
শামসুল আলম সাহেব বললেন, সবাইকে মরতে হবে। মরার আগে আখেরের জন্য কিছু নিয়ে যেতে না-পারলে জাহান্নম ছাড়া কিছু থাকবে না। নামাজ-রোজা, হজ-যাকাত আখেরাতের সঞ্চয়। দুনিয়া কিছুই না, হাতের ময়লা। এসব ময়লা যত দূর করে দেওয়া যায় তত নিরাপদ।
খান স্যার বললেন, আমি আখেরাতের জন্য দুনিয়াকে এভাবে অবহেলা করার পক্ষে নই।
আলাপ প্রলাপের দিকে যাচ্ছে। ধর্ম নিয়ে আলাপ আমার কাছে প্রলাপই মনে হয়। আমি রচনাকে উঠে আসার ইশারা করি।
রচনা চেয়ার থেকে ওঠে দাঁড়িয়ে বললেন, স্যার, আমরা আসি?
খান স্যার গল্পের গতি বুঝতে পেরে অনিচ্ছাসত্ত্বেও আমাদের অনুমতি দিলেন। সচিবালয় থেকে বের হয়ে সোজা পোস্ট অফিস। সেখান থেকে চেকটা নিয়ে সরকারি পাওনা কড় গন্ডায় যথাস্থানে জমা দিয়ে বাসায় ফিরতে ফিরতে পুরো দিনটা শেষ হয়ে গেল।
বাসায় ঢুকেই ফোন করি খান স্যারকে।
আলম স্যারের জন্য তোমাদের সঙ্গে একটু আলাপ করতে পারলাম না। সময় পেলে কাল আবার এসো। রচনাকে আনতে ভুল করো না।
স্যার?
বলো।
সব টাকা জমা করে দিয়েছি।
জমার কাগজপত্র?
প্রকল্প অফিসে পৌঁছে দিয়েছি।
খান স্যার বলেন, বুক থেকে একটা ভয়ংকর পাথর নেমে গেল।
কেন স্যার?
খুব ভয়ে ভয়ে ছিলাম, কখন না বিপদে ফেলে দেয় তোমাকে। ইস! ভালো কাজে কত বিপদ।
স্যার, আপনাকে কখনো ভুলব না। আমার জন্য যে ঝুঁকি আপনি নিয়েছেন, তা কেবল আপনার পক্ষেই সম্ভব ছিল।
আমাদের সিএসপিকে যতই খারাপ বলো না কেন, ভালো কাজ করার যোগ্যতা আমাদের ছিল এবং অনেকে করেছেন।
তাই তো প্রমাণ করলেন আপনি।
তোমাদের ঋণটা ছাড়া আর একটাও ফেরত পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কেউ এক টাকা সুদও দেয়নি।
রিসিভার রেখে রচনাকে বললাম, আমি খান স্যারের কাছে ঋণী।
আমি আপনার কাছে ঋণী।
আমরা দুজন তাহলে কার কাছে ঋণী?
খান স্যারের কাছে, রচনা বলল, “বিদায়ের দিন স্যারকে একটা উপহার দিই?”
কী?
ভাবির একটা নিজস্ব এনজিও আছে না?
হ্যাঁ।
কী জানি নাম, মনে পড়েছ- পুষ্প (চড়ড়ৎ ঝঃঁফবহঃং চৎড়সড়ঃব ঙৎমধহরুধঃরড়হ); ওখানে কিছু সাহায্য করি?
আমি তো হাজার দশকের চেয়ে বেশি দিতে পারব না।
আপনার দিতে হবে না। আমার ব্যাংকে তিন লাখ টাকার মতো জমা হয়ে আছে। খরচ করার জায়গা নেই। প্রতিমাসে আমার আয় হচ্ছে। ওগুলো দিয়ে দিই?
সব?
হ্যাঁ।
রচনা মহাখুশি।
বিশাল একটা কষ্ট বুক থেকে নেমে গেল, আহ্! কী শান্তি, বলেই আমার পা ছুঁয়ে শ্রদ্ধা জানাল। এভাবে শ্রদ্ধা জানানো তার মুদ্রাদোষ হয়ে গেছে। না করলে কষ্ট পায়, অভিমান করে।
কী এমন হয়েছে মেয়ে?
রাহুমুক্ত হয়েছি স্যার। অনেক দিন বলেছি, প্রয়োজন নেই এখন, ফেরত দিয়ে দেন টাকাগুলো। কার কথা কে শোনে। এখন আপনার স্যার বলেছেন, তাই দিয়ে দিলেন। আমি আপনার কে? আমার কথা শুনবেন কেন? আপনার স্যার বললে দিয়ে দিতে হয়, আমি বললে না। আপনি কী আমার কোনো কথা রেখেছেন স্যার?
তোমার নির্লোভ আচরণ সত্যিকার অর্থে বিরল উদারতার পরিচায়ক। মেয়ে, আমি মুগ্ধ হয়েছি। তুমি অনেক বড়ো, তোমার আর বড়ো না হলেও চলবে। সব জমা দিয়ে দিয়েছে, কিছুই তো নেই।
আমিই এখন আমার সঞ্চয়। খান ভাবির ভালোবাসা কত যুগ চেষ্টা করলে শোধ করা যাবে? স্যার, সততা আর উদারতার মধ্যে কোনটা শ্রেষ্ঠ?
উদার হৃদয় সততার নিবাস। লোভ সততার অন্তরায়।
স্যার?
বলো।
আপনি মানুষ, না দেবতা।
মানুষ।
মানুষ এত স্বার্থহীন হতে পারে না।
মেয়ে, কে বলেছে আমি স্বার্থহীন, আমি প্রতিটা কাজ করি স্বার্থে। তোমার জন্যও করছি স্বার্থে। তুমি আমার লাঠি হবে, যখন দুই পায়ে ভর দিয়ে হাঁটতে পারব না।
স্যার, আপনি ভেতরে ভেতরে এত নরম? ওপরে দেখা যায় খুব শক্ত।
শক্ত বলেই তো নরম হয়ে যাওয়ার এত ভয়। শক্ত জিনিস সহজে ভাঙে না, কিন্তু যখন ভাঙে তখন গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যায়। সময় কাউকে ছাড়ে না। আসলে আমি অনেকটা অসহায়। হবে তো আমার লাঠি?
স্যার, আমি আপনার রচনা। যেভাবে লিখবেন সেভাবে বাক্য হবে। সবসময় আপনার জন্য কিছু করতে ইচ্ছে করে, কিছু দিতে ইচ্ছে করে, অনেক কিছু বলতে ইচ্ছে করে, কিন্তু বুঝতে পারি না, কী দেব আর কী বলব। যদি অশোভন হয়ে যায়? অশোভন মনে করেন তাই ভয়ে ভয়ে থাকি, দিতে পারি না; বলতেও পারি না।
আমার কিছু লাগবে না।
“তোমায় কিছু দেব বলে চায় যে আমার মন, নাই বা তোমার থাকল প্রয়োজন।” রবিঠাকুর দারুণ বলেছেন, তাই না স্যার?
কিছু দাও তাহলে।
কী দেব স্যার?
একটা পান দাও।
পান বেশি খাওয়া ভালো নয়।
আরে বাবা দাও-না একটা পান।
স্যার একটা কথা বলি?
বলো।
আমি জীবনেও আপনার, মরণেও আপনার। কেউ আর আমার হতে পারবে না, আমিও পারব না কারও হতে।
আমি রচনার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলাম।
রচনা আমার কপালে একটা চুমো দিয়ে পান সাজিয়ে দিয়ে পড়তে চলে গেল। ঘণ্টাখানেক পর এসে আমার হাতে একটা কলম দিয়ে বলল, স্যার, আপনার জন্য এ কলমটা এনেছি।
পার্কার কোম্পানির ডোফোল্ট কলম।
দেখলাম- সোনালি রং, দাম কমপক্ষে চার হাজার টাকার বেশি হবে।
কলমের জন্য এত টাকা খরচ করার কী প্রয়োজন ছিল? কোন দোকান থেকে কিনেছ?
এ তো স্যার কলম নয়।
কী?
প্রেজেন্ট, মানে আমার বর্তমান।


শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com

error: Content is protected !!