স্যমন্তক: সপ্তচত্বারিংশ পর্ব

ড. মোহাম্মদআমীন
ঘুমের ঘোরে অস্পষ্ট শুনতে পাচ্ছি আল্পনার গলা, “আপা ও আপা, উঠো, ব্রেকফাস্ট রেডি। আর কতক্ষণ ঘুমাবে।”
অরোরার সঙ্গে ভেসে আসছে পাখির কিচিরমিচির শব্দ। ঢাকার এদিকে গাছপালা একটু বেশি। তাই পাখিও। আল্পনার কথা পাখির কুজনে বিরল আল্পনা এঁকে দেয় মগজে। আমার ঘুম ভেঙে গেল পুরো।
অবাক হয়ে দেখি— রচনা আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমিয়ে। হয়তো সারা রাত  সেবা করেছে। নতুবা এভাবে জড়িয়ে জ্বর তাড়িয়েছে।

স্যমন্তক, পুথিনিলয়।

তারপর ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে গেছে মায়ের মতো শান্ত বেদনায়। শিয়রে জলপট্টির কাপড়। উঠতে চেয়েও ওঠলাম না। আমি উঠলে রচনাকে সরিয়ে উঠতে হবে, উঠব না। হয়তো পুরো রাতই সে জেগে ছিল আমার জন্য। ঘুমাক মন ভরে।
এত ঋণ শোধ করি কীভাবে?
আমি নিঃস্ব-আবেগে মুষড়ে পড়ি। ভালোবাসা মানুষকে হারিয়ে দেয় আবার এ ভালোবাসায় মানুষকে ফিরিয়ে দেয় পূর্ণ অবতারে। আল্পনার সামনেই ঘুমন্ত রচনার অধরে অধর ছুঁয়ে দিলাম পিতৃমমতায় কন্যা-মধুর বিধুর-বঁধুর প্রেমে। মন আমার অসীম কৃতজ্ঞতায় সসীম হয়ে গেল রচনাতে। আমি কী করেছি তার জন্য— তা যতই হোক না, আজকে তার এই মমতার কাছে সব অতি তুচ্ছ হয়ে গেল। মনে হলো— আমি তাকে দিয়েছি এক টন লৌহ, সে দিয়েছে এক টন স্বর্ণ।
আল্পনা বলল, ভাইয়া, আপুকে ডাকুন।
এখন না।
রচনার মুখে শিশুর মুগ্ধতা। যা আমাকে উদ্ভাসিত করে দিয়েছে বিনশ্বর সৌকর্যে। আসলে সুখ এমন একটা জিনিস, যা নিজের না-থাকলেও অন্যকে দেওয়া যায়।
আমি অবাক হয়ে দেখলাম, রচনা আমার সব ভালোবাসাকে কৃতজ্ঞতার শুভ্র চাদরে ভরে তার বুকের অনেক গভীরে লুকিয়ে রেখেছে। যা থেকে প্রয়োজনে আমাকে উজাড়ে উজাড় করে দেয়। এখন তার হদিস পেতে হলে তার বুক ছিঁড়ে ফেলা ছাড়া কোনো উপায় নেই। আমার পক্ষে এমন করা কি সম্ভব?
আরও একঘণ্টা পর রচনার ঘুম ভাঙল।
সে নিজেকে আমার বুকের উপর শুয়ে থাকতে দেখে আনমনা হয়ে গেল— লজ্জায় নয়, সজ্জায় এবং গর্বের বিমল স্নিগ্ধতায়। অবোধ্য অনুভূতির তৃপ্তকর  নির্মলতায় গর্বোন্নত প্রশান্তিতে বলল, স্যার আমি কি সারা রাত এখানে ছিলাম?
ছিলে।
আল্পনা বলল, আমরা চলে যাওয়ার সময় তোমাকে ডাকতে চেয়েছিলাম।
ডাকনি কেন?
ঘুমিয়েছিলে তাই।
ভালো করেছ না-ডেকে। ডাকলে এমন স্বপ্নহীন ঘুম দিতে পারতাম না।
আমি বললাম, মেয়ে তুমি কি সত্যি সারারাত আমার সঙ্গে ছিলে?
রচনা আমাকে একটা ছোটো ধাক্কা দিয়ে বলল, ছিলামই তো! তাই ঘুমটা গভীর ছিল। তাতে কী হয়েছে?
আমাকে বলনি কেন?
আল্পনা বলল, ঘুমের মানুষ কথা বলতে পারে না।
তুমি বলে দিতে।
তাহলে কী হতো? রচনা বলল।
আমি জেগে জেগে তোমার ঘুম দেখতাম। প্রিয়জনের ঘুম দর্শনের স্বাদ কখনো পেয়েছ? আমি পাইনি, দেখেছি মায়ের মুখে। আমরা ঘুমালে তিনি চেয়ে চেয়ে দেখতেন আমাদের, দেখতেন— নিশ্বাস কীভাবে নামে-ওঠে, কিভাবে নড়া-চড়া করে ঘুমন্ত সন্তানের শরীর,  কীভাবে ধুকধুক করে কলজে। কিছুক্ষণ পরপর চুমো দিয়ে ঢেকে দিতেন আদরে।
আগামীকাল থেকে ডেকে দেব, কল্পনা বলল।
নিনি কোথায়?
আল্পনা বলল, তাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। সকালে উঠে দেখি দরজা খোলা।
আমি বললাম, পালিয়েছে। দেখো কিছু নিয়ে গেছে কি না।
কিছু নেয়নি।
রচনা ওঠে বাথরুমে ঢুকল

মায়ের সঙ্গে ড. মোহাম্মদ আমীন

। সে উঠতেই মায়ের কথা ভীষণভাবে মনে পড়ে গেল। অনেকদিন কথা হয় না তার সঙ্গে। অসুখ হলে মায়ের কথা মনে পড়ে। রিসিভার তুলে নিয়ে মাকে রিং করলাম।
মা কেমন আছ?
অ-পুত, যেইল্যা রাইক্কুস এইল্যা আছি। তুই-ই তো ভালা জানঅছ, আঁরে হইল্যা রাইক্কোচ। (বাবা, যেরকম রেখেছ সেরকম আছি। তুমিই তো জানো কেমন রেখেছ আমাকে।)
টেলিফোনে মায়ের কথায় কোনো মায়া পেলাম না। স্বাভাবিক মনে হলো না মাকে। প্রতিটা কথায় খোঁচা- নিশ্চয় কোনো বিষয় নিয়ে ভীষণ কষ্টে আছে।
আদুরে গলায় বললাম, কী হয়েছে মা?
অ-পুত, তুই নাকি বস্তির ওকগা মাইয়োপোয়া বিয়া গরি ঢাহা শ-অরত ইতিল্লই থাগস? একখানা হইলে অপুত কী হতি অইতো? আঁই তো অ-পুত না নগইরত্তাম। (বাবা, তুমি না কি বস্তির একটা মেয়েকে বিয়ে করে ঢাকা শহের তাকে নিয়ে থাকিস? একটু বললে কী ক্ষতি হতো? আমি তো না করতাম না।)
কানটা ঝাঁঝাঁ করে উঠল। অপমানে হাত-পা ছোটাছুটি করার জন্য অস্থির হয়ে উঠছে। এটি রাগের লক্ষণ। মায়ের সঙ্গে রাগারাগি করা ঠিক হবে না। পরে সব বুঝিয়ে বলা যাবে।
বললাম, মা এখন রাখি। তোমার সঙ্গে পরে কথা বলব। তুমি ভুল বুঝে আমার ওপর রেগে আছ, আমিও রেগে যেতে পারি।
মা বললেন, বিয়াআইত্তা পোয়ার ডইল্যা হথা হদ্দে কিল্লাই? তোর দুয়া আলি, ওকগা আলা। বেয়াকগুন তোর লগে থাগে। হালা মাইয়োপোয়া ওকগা বিয়া গইজ্জুছদে কিয়ল্লাই, দুনিয়াত আর মাইয়ো পোয়া ন-পছদে? (বিবাহিত ছেলের মতো কথা বলছ কেন? তোমার দুটি শালি, একটা শালা। সবাই তোমার সঙ্গে থাকে। কালো একটা মেয়ে কী জন্য বিয়ে করেছ? দুনিযাতে আর মেয়ে পাওনি?)
মা, তুমি এসব বিশ্বাস কর?
আঁই তো বিশ্বাস গইত্তাম নঅ-চাই। অপুত, ছবি তো মিছা হথা ন-হয়। ছবিত দেকখিদি, তোর বউয়ুর লই তোর আলা-আলি। অপুত তোরে বেয়াকগুনে জড়াই দইরজ্জে। এক লাই ছবি দেহাইয়ে। দেহিয়ের অপুত জিব্বাত হ-অর দি আঁই। (আমি তো বিশ্বাস করতে চাই না। বাবা, ছবি তো মিথ্যা কথা বলে না। ছবিতে দেখেছি তোমার বউয়ের সঙ্গে তোমার শালা-শালি। তোমাকে সবাই জড়িয়ে ধরেছে। এক ঝুড়ি ছবি দেখিয়েছে। দেখে বাবা জিহ্বায় কামড় দিয়েছি আমি। )
মা কাঁদছে। কেঁদে কেঁদে বলছে, অপুত, বেয়াকগুনের মুখত এগিন উনি উনি হইজ্জা ফাডি গিঅই। তারপর, অপুত তোর বীরপতীক দাদুর লই হথা হইয়েরে আসল ঘটনা জানিত পাজ্জি। তারপর হইজ্জান ঠান্ডা অইয়ে। (বাবা, সবার মুখে এসব কথা শুনে শুনে কলজে ফেটে গেছে। এরপর তোমার বীরপ্রতীক দাদুর সঙ্গে কথা বলে আসল কথা জানতে পারলাম। তারপর কলজেটা ঠান্ডা হলো।)
মা?
অপুত, তোরে পেডথ ল-অন আরলাই সার্থক অইয়ে। ( তোমাকে জন্মদান আমার সার্থক হয়েছে।)
মা।
কিন্তু অপুত আড়াইল্যা-পাড়াইল্যার মুখ কী গরি বন্ধ গইজ্জুম। তোর বাপ থাইলে একখানা সাহস পাইতাম। মাইনষে তো সবসময় হারাপ্পান দেহে। (কিন্তু, বাবা পাড়া-প্রতিবেশীর মুখ কী করে বন্ধ করব। তোর বাপ থাকলে একটু সাহস পেতাম। মানুষ সর্বদা খারাপটা দেখে।)
মায়ের কথায় মনটা ভালো হয়ে গেল। বললাম, মা তুমি ভালো জানলে পৃথিবীর আর কারও খারাপে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। আমি কী করতে পারব এবং কী করব না-করব তা তোমার চেয়ে ভালো কেউ জানে না।

মায়ের সঙ্গে কথা শেষ করার পর রচনা বলল, প্রোগ্রামের কথা মনে আছে?
যাত্রাবাড়ি বস্তিতে যাবার কথা। সামনে ইদ। রচনা তার পুরাতন প্রতিবেশীদের কিছু কাপড় এবং খাদ্যসামগ্রী দেবে। অনেক আগের পরিকল্পনা। কয়েক বছরের সঞ্চয় খালি করে কাজটি সে করছে। তার উদারতা আর মমত্ববোধে বিস্মিত না হয়ে পারা যায় না। স্থানীয় প্রশাসনকেও বলে দেওয়া হয়েছে। একটি এনজিও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব নিয়েছে। নাস্তা করে রেডি হয়ে নিলাম। সকাল সকাল বের হয়ে পড়ি সবাই। বস্তিতে গিয়ে দেখি আগের বস্তির কোনো চিহ্ন নেই। ওখানে নির্মাণ কাজ চলছে।
রচনা বলল, স্যার, চারদিকে একের পর এক বড়ো বড়ো ভবন হচ্ছে, কিন্তু রাস্তায় শুয়ে থাকা গৃহহীনের সংখ্যা তারপরও কমছে না, দিন বাড়ছে আর বাড়ছে। এরা কোথায় যাচ্ছে?
সারা ঢাকা শহরে যত্রতত্র ছড়িয়ে পড়ছে, আমি বললাম।
এভাবে ছড়িয়ে পড়লে পুরো ঢাকাই বস্তি হয়ে যাবে।
হয়েই তো গেছে।
আশেপাশে কয়েকটি বস্তি তখনও উচ্ছেদের অপেক্ষায়। তাদের মাঝে কাপড় এবং খাদ্রসামগ্রী বিতরণ করে বাসায় ফিরতে ফিরতে বিকেল হয়ে গেল। বাসায় ঢুকতে গিয়ে দেখি নিনি- দরজার গোড়ায় দাঁড়িয়ে।
আমি বললাম, কোথায় ছিলে সারাদিন?
আপনার লাইগা মদন বাবার তাবিজ আইনতে গেছলাম।
তাবিজ দিয়ে কী হবে?
আপনার বালা-মুসিবত দূর হবে।
যদি হারিয়ে যেতে?
রচনা বলল, এদের সব হারিয়ে গেছে, আর হারিয়ে যাওয়ার ভয় নেই। এখন কেবল যাকে আশ্রয় হিসেবে পেয়েছে তাকে হারিয়ে ফেলার ভয়।
আমি নিনিকে কাছে ডেকে নিচু হয়ে একটা চুমো দিলাম কপালে। এর চেয়ে বেশি আর কী দেব? আমি তো আর তার মতো এত কৃতজ্ঞ মনের অধিকারী না!
শুবাচ গ্রুপের লিংক: www.draminbd.com
error: Content is protected !!