স্যমন্তক: সপ্তবিংশ পর্ব

ড. মোহাম্মদ আমীন
কিছু একটা দিতে হবে রচনাকে। সাফল্য তা যতই নগণ্য হোক না— ছোটোখাটো উপহার চমৎকার উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। যেখান থেকে আসুক এবং যেভাবেই আসুক প্রাত্যহিক জীবনের প্রত্যেকটি বিষয় এক-একটি উপহার। জীবনটাও উপহার। তাই জীবনকে জীবনের মতো উছল রাখতে হলে মাঝে মাঝে উপহার আবশ্যক।
কী দিই?
অলংকার সে পরে না। উপহার হিসেবে অলংকার আমার কাছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রতিযোগিতাসমূহে দেওয়া থালাবাটির মতো নিকৃষ্ট মনে হয়। অলংকার কেউ নিজের জন্য পরে না, অন্যকে সন্তুষ্ট করার জন্য নিজে ধারণ করে। তাই অলংকারের প্রাচীনতম পৌরাণিক নাম ছিল আর্বজনা। অলংকার আর অহংকার খুব কাছাকাছির জিনিস। সুতরাং অলংকার বাতিল।
এ মুহূর্তে তার কী প্রয়োজন এবং কেন? যদিও অনেকে উপহার প্রদানের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তাকে বিবেচনা করে না, আমি করি।
কি দেওয়া যায়?
বেশিক্ষণ ভাবতে হলো না। পেয়ে যাই— রবীন্দ্র রচনাবলি। আগের সেটিটি ছিল অসম্পূর্ণ, কয়েকটি খণ্ড নষ্ট হয়ে গেছে।  কয়েকটি হারিয়ে গেছে। হয়তো কল্পনা ফেরিওয়ালার কাছে দিয়ে পাঁপড় খেয়েছে। ইবলিশটা সব করতে পারে— এখন আরও দুষ্ট হয়েছে। সুযোগ পেলে জিহ্বা দিয়ে কানের লতিতে সুড়সুড়ি দিতেও ছাড়ে না। এমন চঞ্চল, দুষ্ট কিন্তু সজাগ ও বুদ্ধিমান শিশু আর পাইনি। দর্শনেও বেশ মনোময়ী।
ফুরফুরে মনে এক সেট রবীন্দ্র রচনাবলি নিয়ে অন্যান্য দিনের চেয়ে একটু আগে বাসায় ফিরলাম। রচনা তখনো ফেরেনি দেখে ফুরফুরে মনটা মুহূর্তের মধ্যে বিমর্ষ হয়ে গেল। নিশ্চয় বন্ধুদের নিয়ে রেজাল্ট সেলিব্রেট করছে। আমি প্যাকেটটা আল্পনার টেবিলে রেখে বললাম, রচনার জন্য উপহার।
এত বড়ো, এত বাড়ি এবং এতগুলো, কী? আল্পনা বলল।
রবীন্দ্র রচনাবলি, সাতাশ খণ্ড।
আপুর ছিল বারো খণ্ড।
আল্পনা জুতো খুলতে শুরু করল। কল্পনা খুলছে— জামা। এটি প্রতিদিনের রুটিন। তবে রচনা থাকলে এরা তেমন একটা সুবিধা করতে পারে না। আমি রুমে গিয়ে হাতমুখ ধুয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিলাম— ঘুমাতে নয় সময় কাটাতে।
সময় থমকে আছে। নড়ছে না একটুও। মাঝে মাঝে সময় এভাবে থেমে থাকে অভিমানী বালিকার মতো গাল ফুলিয়ে। আবার অনেক সময় এমনভাবে চলে যায়, মনে হয়— সে আসেইনি কখনো। এই তো সেদিন রচনা ভর্তি হলো, এরমধ্যে বছর পার হয়ে গেছে অনেক আগে। সময় আসলে দ্রুত চলে না, আস্তে আস্তে যায় কিন্তু কখনো থামে না বলেই মনে হয় দ্রুত যায়।
কিছুক্ষণ পর আল্পনা-কল্পনার সঙ্গে একটি চলমান কঙ্কাল রুমে ঢুকল। নাস্তা নিয়ে এসেছে সবাই। আমি কঙ্কালটির দিকে তাকাই। গায়ে কল্পনার জামা। 
আল্পনা বলল, এ আমাদের নিনি। পরিবারের নতুন সদস্য।
কল্পনা দেখিয়ে দিল নিনিকে— আমাকে কীভাবে সালাম করতে হবে।
ভাইয়া হা করেন, বলেই কল্পনা একটা আঙুর এগিয়ে দিল আমার মুখে। খেতে ইচ্ছে করছিল না। ক্ষুধার সঙ্গে মনের যোগ জিহ্বা আর খাবারের স্বাদের চেয়ে

কল্পনা

অনেক বেশি নিবিড়। নিনির দিকে আরেক বার দৃষ্টি দিলাম। রচনা ঠিকই বলেছে— চামড়া আর হড়ের মাঝখানে কিছু নেই। একসময় আল্পনা-কল্পনাও এমন ছিল। এখন তাদের চামড়া আর হাড়ের মাঝখানে ফসলি জমির উর্বর পলি বিমল আকর্ষণের মূর্ততায় প্রতিদিন সজীব হচ্ছে।
কল্পনা বলল, ভাইয়া, নিনিকে স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেবেন?
হ্যাঁ।
রচনা বাসায় নেই তাই সময়টা থমকে আছে। কল্পনা মাথার চুল টানছে— এটি আমার কাছে খুব আরামদায়ক একটি বিষয়। ঘুম আসছে না, কলিংবেলের আওয়াজের অপেক্ষায় থাকতে থাকতে অস্থির হয়ে পড়ি।
নিনির জন্য একটা খাট লাগবে, কল্পনা বলল।
টুটুল কোথায়?
আফজল দাদুর বাসায় খেলতে গেছে।
ভবনের অদূরে আফজল চৌধুরীর ফার্নিচারের বিশাল দোকান। বাসার সব আসবাব তাঁর দোকান থেকে আনা হয়েছে। ইন্টারকমে তাঁকে বলে দিলাম একটা সিঙ্গেল খাট দেওয়ার জন্য—  ঠিক আল্পু-কল্পুদের মতো।
আফজল চৌধুরী বললেন, আজই পাঠিয়ে দেব।
বাইরে মেঘ, বাতাস দিচ্ছে বেশ, বৃষ্টি হতে পারে। আমার বৃষ্টি ভালো লাগে, বৃষ্টির সঙ্গে বাতাস আরও ভালো লাগে, আজ ভালো লাগছে না। মেয়েটা আসবে কীভাবে?
হঠাৎ কলিংবেল বেজে ওঠে।
রচনা।
রচনাই কেবল এভাবে নরম শব্দে কলিংবেল বাজাতে পারে। কলিংবেলের শব্দ নয় যেন আদুরে ডাক,
আমি এসেছি— তোমার প্রতীক্ষার
মৃত্যু ঘনিয়ে এল এবার
উচ্ছ্বাসে মাতাতে হে—
প্রিয়তম আমার বর্ণিল কোলাহলে।
আমার কবিতা আমাকেই মুগ্ধ করে দিল। বাসায় ঢুকে রচনা জড়িয়ে ধরল আমাকে। কল্পনার হাত আমার মাথা থেকে সরে গেল। অভিমানি গলায় কল্পনা বলল, আপু, আমার হাত সরিয়ে দিলে কেন?
সরায়নি, সরে গেছে। আমি এলে তোমাদের হাত এভাবে সরে যাবে বারবার। মনে রেখো। বড়োদের কাছে কৈফিয়ত চাইতে নেই। আমার স্যারের ভাগ নিতে এস না। তিনি পুরোই আমার।

আমাদের?
আমি যতটুকু দিই ততটুকু।
রচনার আবেগময় টানে আমার আনন্দগুলো ঢেউয়ের মতো সরব হয়ে ওঠে। আমি হতভম্ব। তার বড়ো বড়ো শ্বাসে প্রবল উচ্ছ্বাস। আনন্দরাশি চোখের পাতার মতো নাচছে বেশরম প্রজাপতির স্বাধীনতায়। দেখতে না দেখতে চোখ তার ভরে গেল জলে, চোখের জল বন্যা হয়ে গড়িয়ে পড়ছে মুখ থেকে গণ্ড বেয়ে আরও নিচে।
ছাড়ো মেয়ে এবার।
ছাড়ব না।
রচনা চুমো খেল, তার দেখাদেখি কল্পনাও। রচনা কাঁদছে। ভীষণ শব্দহীন কান্না। আমি অভাবিত আনন্দে অভিভূত হয়ে বললাম, এত জল কেন চোখে?

আল্পনা

আল্পনা প্রশ্ন করল গানে গানে, এত জল ও কাজল চোখে আপুনি আনলে বলো কে?
রচনা হাসির ঢেউয়ে কান্নার জলকে আন্দোলিত করে বলল, আমি প্রথম হয়েছি স্যার। স্যার, আমি প্রথম হয়েছি। জানেন স্যার, আমি প্রথম হয়েছি?
তার উচ্ছ্বাস আমাকে আরও আবেগ্রপবণ করে দিল। এবার সে নয়, আমিই জড়িয়ে ধরলাম— একদম খাবলে ধরার মতো নির্মম মমতার কুসুম উষ্ণতায়। ফাঁক নেই তিলবৎ।মমতায় ফাঁক রাখতে নেই, ভালোবাসায় রাখতে নেই বিশ্বাস। ভালোবাসা প্রাতিষ্ঠানিক ধর্ম  নয় যে, বাঁচিয়ে রাখতে হলে বিশ্বাস আবশ্যক। বিশ্বাসের প্রশ্ন এলে ভালোবাসা দোকানির সন্ধ্যকালীন মাছের মত পচনশীল হয়ে যায়।
মেয়ে, তোমার সফলতা আমার সম্মান।
স্যার, আমি আপনার রচনা। আপনি আমার রচয়িতা। আপনার তুলিতে আমার সরবতা। আপনি না-থাকলে আমি কোথায় হারিয়ে যেতাম।
হারিয়ে যেতে না, হারিয়ে দিতে আমাদের।
স্যার, আপনার পায়ে একটা চুমো দিই? না, এখন দেব না। বুকে জড়িয়ে রাখব অনেক্ষণ, তারপর দেব—
My bounty is as boundless as the sea,
My love as deep; the more I give to thee,
The more I have, for both are infinite.” 

এবার ছাড়ো, বাড়াবাড়ি ভালো না।
মেয়ে, বোন, বন্ধু— আমি একের ভেতর তিন, বাড়াবাড়ি হবে কেন? বরং বলুন, কম হয়েছে।  বাড়াবাড়ি আপনিই করছেন—  আমাকে বাধা দিয়ে।
এত বড়ো মেয়ে, শরম করে না?
আল্পনা বলল, বাবার কাছে কি মেয়ে কখনো বড়ো হয়? শরম কীসের ভাইয়া?
রচনা বলল, অতি অনুভূতি আমার শরমকে অনুভূতিহীন করে দিয়েছে, যেমন  অতি কম্পাঙ্ক শ্রবণহীন করে দেয় কান
। প্রকৃতিও আপনার মতো বাড়াবাড়ি করছে। স্যার, আকাশে মেঘ। বৃষ্টি হতে পারে। হেমন্তে বৃষ্টি, বাড়াবাড়িই তো! বৃষ্টি এলে সবাই ছাদে ভিজব, ভিজবেন তো? অনেকদিন বৃষ্টিতে ভিজিনি, স্যার। কে আছে আমার। কেউ ভিজতে চায় না, সবাই শুধু ভেজাতে চায়।
আমি তোমার কে?
Nothing, but short of my everything.

রচনা এখনও পুরো ছাড়েনি আমাকে। ছাড়িয়ে নিতেও ইচ্ছে করছে না। মেয়েটি আমাকে জড়িয়ে ধরে যদি শান্তি পায় ক্ষতি কী! নিচের বস্তি থেকে ঝগড়া আর গালাগালির চিৎকার ভেসে আসছে। ওই চিৎকার মেঘের ডাকের চেয়ে বিকট মনে হলো।

স্যার, আমাদের বস্তিতেও এমন গালাগালি হতো। গালাগাল আর ঝগড়া অভাবের নিশ্বাস। এগুলো ছাড়া অভাব মরা প্রজাপতির মতো দুঃখময়।
রচনা উবু হয়ে আমার পায়ে চুমো খেল, স্যার, আপনাকে আমার শ্রদ্ধা ছাড়া আর কিছু দেওয়ার নেই। এটুকু দিতে যদি কখনো বাধা পাই, সোজা আবার বস্তিতে ফিরে যাব। গরিবের পৃথিবী অবারিত, যেখানে রাত হয় সেখানে কাত হওয়ার মাটি এসে হাজির হয়। আমাদের ভবন লাগে না, পবনই যথেষ্ট।
কল্পনা বয়স্ক লোকের মতো ভরাট গলায় দরদ ঢেলে বলল, ভাইয়া, আমার কিন্তু অনেক কিছু আছে দেবার। আমি সবকিছু দেব আপনাকে।
আমি বললাম, কী কী?
কল্পনা বলল, চুমো দেব, মাথার চুল টেনে দেব, পা টিপে দেব, খাইয়ে দেব, জুতো খুলে দেব, জামা পরিয়ে দেব, গোসল করিয়ে দেব, টাই পরিয়ে দেব, নখ কেটে দেব, গায়ে পাউডার মেখে দেব, আইসক্রিম দেব, ভালোবাসা দেব …,।
রচনার জলো-চোখে খুশির ফোয়ারা বিয়েবাড়ির আলোর মতো কোনো নিয়মকানুন ছাড়াই নাচানাচি করছে।
আমি বললাম, যাও মেয়ে, এবার হাতমুখ ধুয়ে এসো।
আমি কোনোদিন ভাবিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারব, এত সুন্দর বাসায় থাকতে পারব। আমার ভাইবোন পড়তে পারবে। স্যার, আপনার দয়ায় সব হয়েছে। নইলে এতদিন কোথায় হারিয়ে যেতাম, কারও বাসায় কাজের বুয়া, নয়তো বা… বলুন স্যার, আপনি কী চান?
কথাগুলো বলেই রচনা হঠাৎ আনমনা হয়ে পড়ে—  সরি স্যার। আমার কিছু নেই দেওয়ার, আমিও যে আপনার? আপনার জিনিস আপনাকে কী দেবে? তবু বলুন না স্যার, আপনি কী চান?
আমি চাই তুমি সময়ের শ্রেষ্ঠ মানুষ হও। পদে নয়, হৃদে; ধনে নয় মনে।
আমি কী চাই জানার ইচ্ছে হয় না, স্যার?
কী চাও?
আমি যদি কখনো দূরে চলে যাই, আমার কথা কী আপনার মনে থাকবে?
ভুলতে গেলে কি সবকিছু ভোলা যায়?
ভুলে যাবেন না তো, স্যার?
আমার রচনা, আমি কীভাবে ভুলি?
বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মাঝে মাঝে মেঘ ডাকছে। কল্পনা আমার ডান হাতে টেনে নিয়ে গুনগুন করে ওঠল—  তুমি এলে, অনেক দিনের পরে যেন বৃষ্টি এল। রচনা বাম হাত টেনে নিয়ে কোলে রেখে বলল, স্যার বৃষ্টি আপনার হাতের মতোই আমার পৃথিবীর জন্য উর্বর আশীর্বাদ। কী মধুর লাগছে বৃষ্টি আর আপনাকে।
কল্পনা বলল, বস্তিতে সন্ধ্যায় বৃষ্টি হলে আমাদের কেয়ামত হয়ে যেত। এখন খুব আনন্দ লাগছে। বৃষ্টি নামুক বৃষ্টি থাকুক; হাজার বছর হাজার বছর। রোদ চাই না, কান্না আসুক কান্না থাকুক, লক্ষ বছর লক্ষ বছর। নাচতে ইচ্ছে করছে বাইরে গিয়ে। ভাইয়া, যাব?
না, এটি শহর। এখানে ছাতাহীনেরা বৃষ্টিতে ভেজে। তোমার ছাতা আছে। ছাদ আছে, ছাদের নিচে ঝরনা আছে।
রচনা বলল, একসময় ছিল না।
সে সময় অন্য সময়। যে সময় যায় সেটি মরার মতো লাশ হয়ে যায়। ফেরে না আর কখনো। নতুন সময়কে নতুন সময় দিয়ে বরণ করে নিতে হয়।
টুটুল এসে গেছে।
রচনা আমার কথায় কান দিলেও মন দিল না, বিষণ্ন গলায় বলল, বস্তিতে বৃষ্টিকে মনে হতো ক্ষুধার্ত টুটুলের অশ্রু, বিদ্যুতের ঝলকে দেখতাম কসাই

ড. মোহাম্মদ আমীন

মইজ্জার লোলুপ চাহনি, মেঘের ডাকে ভেসে আসত পঙ্গু বাবার ব্যথার্ত চিৎকার। স্যার, আকাশটাকে কী মনে হতো জানেন? ক্ষুধা। আকাশ সমান ক্ষুধা নিয়ে আকাশের নিচে বসে আকাশের দিকে চেয়ে থাকতাম। আকাশ কিছুই করতে পারত না। তার বিশালত্বকে মনে হতো ভণ্ডামি।
চোখ ভিজে গেল রচনার। আমার ইশারা পেয়ে আল্পনা-কল্পনা একসঙ্গে ধরাধরি করে উপহারের প্যাকেটটা নিয়ে এল।
রচনা চোখ মুছতে মুছতে বলল, এটা কী?
ভাইয়া এনেছেন। তোমার জন্য, অনেক ভারী; কোমর ধরে গেছে আমাদের।
রচনা আমার হাত থেকে প্যাকেটটা নিয়ে পায়ের কাছে রেখে পা ছুঁয়ে দিল শ্রদ্ধা-জড়ানো মমতায়। তাকে অনুসরণ করল আল্পনা, কল্পনা ও টুটুল।
আল্পনা বলল, আপু বলো তো এগুলো কী?
রবীন্দ্র রচনাবলি।
আমি বললাম, তুমি আমাকে অনেক বেশি জেনে ফেলেছ মেয়ে।
রচনা সোফা হতে উঠে অনেকটা নেচে নেচে গাইতে শুর করল—
“আজি ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে
জানি নে, জানি নে
কিছুতেই কেন যে মন লাগে না ।।
ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে
এই চঞ্চল সজল পবন-বেগে
উদ্ভ্রান্ত  মেঘে মন চায়,
মন চায় ওই বলাকার পথখানি নিতে চিনে ।।
ঝরো ঝরো মুখর বাদর দিনে।
বাইরের রিমঝিম এখন ঝুমঝুমে। তিন পিচ্চি বারান্দায় বৃষ্টি দেখছে। আমার হাত দুটো টেনে নিয়ে রচনা বারান্দার দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে যেতে বলল, স্যার সবকিছু অবস্থানের ওপর নির্ভর করে। তাই না?
যেমন?
বস্তিতে বৃষ্টি দেখলে টুটুল আর কল্পনার কান্নায় চারপাশ আরও ভয়ংকর হয়ে উঠত। বৃষ্টির সব জল আমাদের ঝুপড়িতেই ঝরত। দেখুন স্যর— এখন তারা কী আনন্দে বৃষ্টি উপভোগ করছে। খুব ভালো লাগছে।
বৃষ্টির ঝাপটায় বেশিক্ষণ দাঁড়ানো গেল না বারান্দায়। ভেতরে ঢুকে রচনা উপহারের প্যাকেট খুলে সবগুলো বই টেবিলে রাখল। আল্পনা এসে টেনে নিল গীতবিতান। আমার অনামিকা দিয়ে একটা পৃষ্ঠা চেপে ধরে রচনার দিকে এগিয়ে দিয়ে বলল, একটা গান ধরলাম, না দেখে নয়, দেখেই পছন্দ করেছি। আপু, এ গানটাই গাইতে হবে তোমাকে। হারমোনিয়াম নিয়ে আসছি। কল্পনা হারমোনিয়াম নিয়ে এল। রচনা গানটির দিকে একবার তাকিয়ে গাইতে শুরু করে—
তার হাতে ছিল হাসির ফুলের হার, কত রঙে রঙ করা
রঙে রঙে রং করা, তার হাতে ছিল।
মোর সাথে ছিল দুঃখের ফলের ভার, অশ্রুর রসে ভরা।
রসে রসে ভরা, তার হাতে ছিল।
গান থামল, বৃষ্টি ঝরেই যাচ্ছে।
আকাশ বুঝি ফুটো হয়ে গেল আজ।

———————————————————
তিনে দুয়ে দশ: শেষ পর্ব ও সমগ্র শুবাচ লিংক
error: Content is protected !!