হরপ্রসাদ শাস্ত্রী: কীর্তিমান বাঙালি

ড. মোহাম্মদ আমীন

খ্যাতিমান ভারততত্ত্ববিদ, সংস্কৃত বিশারদ, সংরক্ষণবিদ, বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস রচয়িতা  এবং বাংলা সাহিত্যের প্রাচীনতম নিদর্শন চর্যাপদের আবিষ্কারক মহামহোপাধ্যায় হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৮৫৩ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর ব্রিটিশ শাসিত বাংলা প্রদেশের খুলনা জেলার কুমিরা গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। আজ তাঁর জন্মদিন। এই মহান ব্যক্তির প্রতি রইল গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা। তবে তাদের আদি নিবাস ছিল উত্তর চব্বিশ পরগনা জেলার নৈহাটিতেতাঁর আসল নাম ছিল হরপ্রসাদ ভট্টাচার্য। গ্রামের স্কুল থেকে প্রাথমিক শিক্ষা অর্জনের পর হরপ্রসাদ ভট্টাচার্য কলকাতার সংস্কৃত কলেজিয়েট স্কুলপ্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যয়ন করেন। প্রসঙ্গত, কলকাতায় তিনি তাঁর বড়দা নন্দকুমার ন্যায়চঞ্চুর বন্ধু সমাজ সংস্কারক ও পণ্ডিত ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সঙ্গে থাকতেন। ১৮৭১ খ্রিষ্টাব্দে হরপ্রসাদ প্রবেশিকা  এবং ১৮৭৩ খ্রিষ্টাব্দে ফার্স্ট আর্টস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।  ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে তিনি বিএ পাশ করেন এবং  ১৮৭৭ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কৃতে সাম্মানিক হন। এরপর এমএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে শাস্ত্রী উপাধি লাভ করেন। ওই পরীক্ষায় হরপ্রসাদই ছিলেন প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ একমাত্র ছাত্র। তিনি সন্ধ্যাকর নন্দী রচিত রামচরিতম্ বা রামচরিতমানস পুঁথির সংগ্রাহক।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী ১৮৭৮ খ্রিষ্টাব্দে  হেয়ার স্কুলে শিক্ষকরূপে যোগদান করেন। ১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে তিনি সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনা শুরু করেন। এই সময় বাংলা সরকার তাকে সহকারি অনুবাদক নিযুক্ত করে। ১৮৮৬ থেকে ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত সংস্কৃত কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি  বেঙ্গল লাইব্রেরিতে গ্রন্থাগারিকের দায়িত্বও পালন করেন। ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজের সংস্কৃত বিভাগের বিভাগীয় প্রধান এবং  ১৯০০ খ্রিষ্টাব্দে   সংস্কৃত কলেজের অধ্যক্ষ হন। ১৯০৮ খ্রিষ্টাব্দে সংস্কৃত কলেজ থেকে অবসর নিয়ে  সরকারের তথ্যকেন্দ্রে যোগ দেন। ১৯২১ থেকে ১৯২৪ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত তিনি  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা ও সংস্কৃত বিভাগের অধ্যাপক এবং বিভাগীয় প্রধান ছিলেন। সরকারি কাজের পাশাপাশি   তিনি  দু বছর এশিয়াটিক সোসাইটির সভাপতি, বারো বছর বঙ্গীয় সাহিত্য পরিষদের সভাপতি এবং লন্ডনের রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির সাম্মানিক সদস্য ছিলেন।

হরপ্রসাদ শাস্ত্রীর প্রথম গবেষণাপত্রটি ছাত্রকালীন ভারত মহিলা নামে বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় সম্পাদিত বঙ্গদর্শন পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।  হরপ্রসাদকে ভারততত্ত্ব বিষয়ে আগ্রহী করে তোলেন বিশিষ্ট ভারততত্ত্ববিদ রাজেন্দ্রলাল মিত্র। তিনি রাজেন্দ্রলালের দ্য সংস্কৃত বুদ্ধিস্ট লিটারেচার অফ নেপাল গ্রন্থে সঙ্কলিত বৌদ্ধ পুরাণসমূহের অনুবাদ শুরু করেন। এশিয়াটিক সোসাইটিতে তিনি রাজেন্দ্রলালের সহকারী ছিলেন। রাজেন্দ্রলালের মৃত্যুর পর এসিয়াটিক সোসাইটিতে সংস্কৃত পুঁথি অন্বেষণ বিভাগের পরিচালক হন। হরপ্রসাদের নেতৃত্বে এশিয়াটিক সোসাইটির দশ হাজার পুঁথির ক্যাটালগ প্রস্তুত করা হয়। এই ক্যাটালগের যে দীর্ঘ মুখবন্ধটি তিনি রচনা করেছিলেন, তা সংস্কৃত সাহিত্যের একটি মূল্যবান ইতিহাস। সংস্কৃত পুঁথি নিয়ে চর্চা করতে করতে গিয়ে হরপ্রসাদ বাংলা পুঁথির বিষয়েও আগ্রহী হয়ে ওঠেন। পুঁথির সন্ধানে তিনি অনেকবার নেপাল গিয়েছিলেন। সেখানেই ১৯০৭ খ্রিষ্টাব্দে  আবিষ্কার করেন বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাগীতি বা চর্যাপদের পুথি।  

১৯১৬ খ্রিষ্টাব্দে চর্যাপদের পুঁথি নিয়ে রচিত তাঁর গবেষণাপত্র হাজার বছরের পুরাণ বাঙ্গালা ভাষায় রচিত বৌদ্ধ গান ও দোঁহা নামে প্রকাশিত হয়। হরপ্রসাদ অনেক প্রাচীন গ্রন্থ সংগ্রহ করে প্রকাশ করেছিলেন।  বাল্মীকির জয়, মেঘদূত ব্যাখ্যা, বেণের মেয়ে (উপন্যাস), কাঞ্চনমালা (উপন্যাস), সচিত্র রামায়ণ, প্রাচীন বাংলার গৌরব ও বৌদ্ধধর্ম প্রভৃতি তার বাংল গ্রন্থ।  তাঁর উল্লেখযোগ্য ইংরেজি গ্রন্থের মধ্যে  মগধান লিটারেচার, সংস্কৃত কালচার ইন মডার্ন ইন্ডিয়া ও ডিসকভারি অফ লিভিং বুদ্ধিজম ইন বেঙ্গল প্রভৃতি অন্যতম।

১৯৩১ খ্রিষ্টাব্দের ১৭ই নভেম্বর তিনি মারা যান।

বাঙালি নিয়ে হরপ্রসাদের  উক্তি

বাঙালিয়ানা, বাঙালিত্ব, আমি বাঙালি এই বোধ। আমার বাঙালি বলিয়া যে একটা সত্তা আছে, এই জ্ঞান। বেশি সংস্কৃত পড়িলে লোকে ব্রাহ্মণ হইতে চায়, ঋষি হইতে চায়। সেটা খাঁটি বাংলার জিনিস নয়; তাহার সঞ্চার পশ্চিম হইতে। বেশি ইংরাজি পড়িলে কী হয় তাহা আর বলিয়া দিতে হইবে না।— — — 

বাঙালিয়ানার অর্থ এই যে, বাংলার যা ভালো তাহা ভালো বলিয়া জানা, আর যাহা মন্দ তাহা মন্দ বলিয়া জানা। ভালো লওয়া ও মন্দ না লওয়া তোমার নিজের কাজ। কিন্তু জানাটা প্রত্যেক বাঙালির দরকারি কাজ। জানিতে হইলে বুদ্ধিপূর্বক বাংলা দেশটা কী দেখিতে হইবে, বাংলায় কে থাকে দেখিতে হইবে, বাংলার আচার ব্যবহার, রীতি-নীতি, সমাজ-সংসার, উৎসব-আনন্দ, দুঃখ-শোক, কুস্তি লাঠিখেলা টোল পাঠশালা দেখিতে হইবে। ইহার গান গীতি পয়ার পাঁচালী, নাচ খেমটা, কীর্তন ঢপ যাত্রা কবি সব দেখিতে হইবে। মন প্রাণ দিয়া দেখিতে হইবে। আবার এখনকার কালে যাহা যাহা বদলাইতেছে, তাহাও দেখিতে হইবে। খবরের কাগজ, মাসিক পত্র, কনসার্ট, থিয়েটার, ইস্কুল, কলেজ, আপিস, আদালত সবই দেখিতে হইবে। বাংলার এবং বাঙালি জাতির সমস্ত জীবনটা ভালো করিয়া দেখিতে হইবে, তবেই তুমি বাঙালি হইবে।
হরপ্রসাদ শাস্ত্রী রচনা সংগ্রহ, ২য় খণ্ড

হরপ্রসাদ শাস্ত্রী: কীর্তিমান বাঙালি 

https://draminbd.com/হরপ্রসাদ-শাস্ত্রী-কীর্ত/

— — — — — — — — — — — — — — — — — — —

জোশুয়া মার্শম্যান ও সত্যেন সেন

লিংক: https://draminbd.com/জোশুয়া-মার্শম্যান-ও-সত্য/

error: Content is protected !!