হরিদাস পাল কে ছিলেন পরিচয়: প্রবাদ; বাল, তুমি কোন হরিদাস পাল

ড. মোহাম্মদ আমীন

হরিদাস পাল কে ছিলেন পরিচয়: কেন প্রবাদে হরিদাস এলেন; বাল, তুমি কোন হরিদাস পাল 

তুমি কোন হরিদাস পাল, তুমি বাল কোন হরিদাস পাল, তুমি কোন হরিদাস পাল যে তোমার কথা শুনতে হবে—  প্রভৃতি বাংলায় বহুল প্রচলিত প্রবাদকথন। কোনো ব্যক্তিবিশেষ  যা দাবি করছে বা যা দেখাচ্ছে প্রকৃতপক্ষে সে তা নয় এবং আসলে অযোগ্য ও তুচ্ছ ইত্যাদি প্রকাশে বস্তুত অবহেলার্থে প্রবাদকথনগুলো ব্যবহার করা হয়। এবার দেখা যাক বাংলায় এত দাস থাকতে প্রবাদকথনসমূহে হরিদাস নামটি কেন এবং কীভাবে এল

কথিত হয়, হরিদাস পাল  ১৮৭৬ খ্রিষ্টাব্দে বর্তমান পশ্চিমবঙ্গের রিশার এক অতি দরিদ্র গন্ধবণিক পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম ছিল নিতাইচরণ। পিতার মৃত্যুর পর দরিদ্র হরিদাস পাল ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দে জীবিকার সন্ধানে গ্রাম ছেড়ে কলকাতা চলে যান। কলকাতায় এসে এক স্বর্ণের দোকানে সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে কাজ শুরু করেন। ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দে হরিদাস পালের একমাত্র ধনী মামা নিঃসন্তান অবস্থায় মারা যান।  হরিদাস  উত্তরাধিকার সূত্রে মামার সমস্ত সম্পত্তির মালিকানা পেয়ে রাতারাতি ধনী হয়ে যান। এরপর তিনি কলকাতার বুড়াবাজারে কাচ ও লণ্ঠনের দোকান খুলেন। হরিদাস পাল ছিলেন  অত্যন্ত পরিশ্রমী,  সৎ, বুদ্ধিমান এবং দয়ালু। সবাই তাকে ভালোবাসত এবং বিশ্বাস করত।  কয়েক বছরের মধ্যে গৌহাটি-সহ কলকাতার আরও অনেক এলাকায় হরিদাসের বিভিন্ন ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠে।  এক দশকের মধ্যে তিনি বিপুল বিত্ত ও অপ্রতিরোধ্য সম্মানের অধিকারী হয়ে যান।

বিপুল বিত্তের অধিকারী হলেও হরিদাস পাল ছিলেন অত্যন্ত মার্জিত, দাতা, উদার এবং বুদ্ধিমান ও সহানুভূতিশীল। কলকাতায় তিনি অনেক প্রাসাদের মালিক ছিলেন। দরিদ্র ও সাধারণ জনগণের কল্যাণের জন্য তিনি অনেক দাতব্য প্রতিষ্ঠান এবং একাধিক দাতব্য ট্রাস্ট ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেন। তিনি তাঁর মালিকানাধীন অনেক প্রাসাদ দরিদ্রদের বিনামূল্যে বসবাস করার জন্য ছেড়ে দিয়েছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যে চারদিকে তার সুনাম ছড়িয়ে পড়ে।  সর্বস্তরের জনগণের কাছে তিনি অত্যন্ত শ্রদ্ধাষ্পদ ও প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা পান। তিনি কাউকে কিছু করার জন্য বললে সঙ্গে সঙ্গে তা পালিত হতো। কারণ লোকজন জানতেন হরিদাস যা করেন তা সবার মঙ্গলের জন্যই করেন। 

১৯৩৩ খ্রিষ্টাব্দে কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে হরিদাস পাল মারা যান। ১৯৬৫ খ্রিষ্টাব্দে কলকাতা সিটি কর্পোরেশন হরিদাস পালের সম্মানার্থে কলেজ লেন নাম  পরিবর্তন করে হরিদাস পাল লেন রাখে। তবে এটি শেষ কথা নয়, তার আরও পরিচয় এবং বর্ণনার একাধিক মতভেদ রয়েছে।

হরিদাসের মতো প্রভাব ফলানোর চেষ্টা করে কিন্তু প্রকৃতপক্ষে হরিদাসের মতো গুণাবলি নেই এমন লোকের কর্তৃত্বকে অবজ্ঞা করে প্রবাদটি বলা হয়। এর মাধ্যমে জানানো হয় যে, তিনি হরিদাস পাল নয় যে, তার কথা আমাকে মানতে হবে। হরিদাসের মতো গুণাবলি ও মর্যাদা তার নেই। অতএব, তার আদেশ নির্দেশ কিংবা প্রস্তাব পরামর্শ অপ্রয়োজনীয়, অবান্তর এবং মান্য বা অনুসরণ করার প্রয়োজন নেই।

কেউ কেউ মনে করেন, হরিদাস পাল  প্রকৃতপক্ষে একটি কাল্পনিক চরিত্র। বাঙালি হিন্দু হরিদাস পাল বিদ্যা-বুদ্ধি, গরিমা, মহত্ত, ধনসম্পদ, উদারতা এবং ঐশ্বর্যের জন্য সবার আদর্শ এবং স্বপ্ননায়কে পরিণত হন। মহান দাতা হিসেবে হরিদাস পাল ছিলেন অতুলনীয়। তাঁর মহৎ চিন্তাভাবনা ও কর্মের জন্য সমাজের সর্বস্তরে  অতি উঁচু সম্মানের আসনে অধিষ্ঠিত হন এবং সবার শ্রদ্ধেয় ও প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেন। ফলে সর্বসাধারণের ওপর তিনি প্রচণ্ড প্রভাবশালী ও আস্থাশীল হয়ে যান। তিনি যে আদেশই দিতেন তা সর্বাংশে সঙ্গে সঙ্গে পালিত হতো এবং পালন করার জন্য অনেক লোক হাজির হয়ে যেত। এই পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা মুল্লুকে যে-কোনো ধনী ও প্রভাবশালী লোককে হরিদাস পাল হিসেবে উল্লেখ করার রেওয়াজ শুরু হয়। একসময় উদাহরণটি বহুল প্রচলিত ছিল। তৎপরিপ্রেক্ষিতে সৃষ্টি হয় বাংলা প্রবাদ: আপনি ন হরিদাস পাল হে? বা “আপনি কোন হরিদাস পাল?”

আবার অনেকের মতে, হরিদাস পাল তৎকালীন পূর্ব বাংলা অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশের হরিপুর নামক গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন। তার পূর্বপুরুষগণ ছিলেন ধনী এবং ইংরেজ প্রশাসকদের বিশ্বস্ত। হরিদাস পাল ছিলেন উনবিংশ শতকের মানুষ।  সেসময় বাংলার ধনীরা ভোগবিলাস করার জন্য কলকাতায় চলে যেতেন। হরিদাস পালও নিজ গ্রাম হরিপুর ছেড়ে কলকাতায় চলে যান। সেখানে তিনি ইচ্ছেমতো দানখয়রাত এবং ভোগবিলাস শুরু করেন। ফলে কলকাতায় তিনি  দানশীল হিসেবে প্রভাবশালী হয়ে উঠেন। সেসময় কলকাতার সবাই তার কথা মান্য করত। তবে অতি খরচের কারণে একসময় হরিদাস পাল দরিদ্র হয়ে যান। তখন দরিদ্র হরিদাসকে কেউ মান্য করত না। সবাই তাকে অবহেলা করতে শুরু করে। অসুখ-বিসুখে তাঁর শরীর ভেঙে পড়ে। চিকিৎসার করার টাকা নেই। আগের হরিদাসের চেহারার কিছুই অবশিষ্ট নেই।

এরূপ অসহায় অবস্থায় অসুস্থ শরীর নিয়ে একদিন হরিদাস তাঁর এক প্রাক্তন কর্মচারীর কাছে গেলেন। কর্মচারী হরিদাস পালকে চিনতে পারলেন না। হরিদাস পাল একটি জরুরি কাজ করে দেওয়ার জন্য কর্মচারীকে বারবার অনুরোধ করতে থাকেন। কর্মচারী তার আদেশ অমান্য করলে হরিদাস পাল বললেন, আগে তুমি তো আমার কথা শুনতে। তখন ওই কর্মচারী বিরক্ত হয়ে বিদ্রুপার্থক গলায় বললেন, “তুমি কোন হরিদাস পাল যে, তোমার কথা শুনতে হবে?”

সূত্র: পৌরাণিক শব্দের উৎসকথন ও বিবর্তন অভিধান, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

১. Haridas Pal

২. হরিদাস পাল লেন

   হরিদাস পালের জন্ম পরিচয় বিস্তারিত; বাল, তুমি কোন হরিদাস পাল 

প্রয়োজনীয় লিংক

শুবাচ লিংক

শুবাচ লিংক/২

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/১

শুদ্ধ বানান চর্চা লিংক/২

 

পুরুষাঙ্গ: সংস্কৃত পুরুষাঙ্গ (পুরুষ+অঙ্গ) অর্থ (বিশেষ্যে) পুরুষজাতীয় প্রাণীর জননেন্দ্রিয়, শিশ্ন, পুংলিঙ্গ। এই অঙ্গটি পুরুষজাতীয় প্রাণী চিহ্নিত করার প্রধান লক্ষণ। তাই এটি পুরুষাঙ্গ। যদিও পুরুষাঙ্গ শব্দের আক্ষরিক অর্থ হয় পুরুষের অঙ্গ।

 

 

 

error: Content is protected !!