হাইপাতিয়া : ধর্মের কারণে গণপিটুনিতে নিহত বিজ্ঞানী ও গণিতজ্ঞ

ড. মোহাম্মদ আমীন

প্যাগান ধর্মানুসারী বিজ্ঞানী, জ্যোতির্বিদ এবং গণিতজ্ঞ ও দার্শনিক-বক্তা হাইপাতিয়া বিশ্বের প্রথম মহিলা গণিতজ্ঞ, যার কার্যাবলি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়া যায়। হাইপাতিয়া ৩৭০ খ্রিষ্টাব্দে রোমান সাম্রাজ্যের অর্ন্তগত মিশরের আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন।হাইপাতিয়ার বাবা তিয়ন; তিনিও ছিলেন গণিতজ্ঞ ।তিয়ন ইউক্লিডের “ইলামেন্টস (Elements) গ্রন্থের টীকা-ভাষ্যকার ও সম্পাদনার কাজ করেছিলেন।

দর্শন, বিজ্ঞান ও গণিতের উপর হাইপাতিয়ার প্রবল দখল ছিল। এসব বিষয় তিনি অনেকগুলো বই লিখেছেন। ত্রয়োদশ খণ্ডে রচিত দায়োফান্তাস ( Diophantus)-এর আর্থমেটিকা (Arithmetica) গ্রন্থের যথার্থ মন্তব্য ও টীকা লেখক হিসেবে হাইপাতিয়া আধুনিক গণিত জগতেও খ্যাত। এখনো পরম শ্রদ্ধায় স্মরিত হন তিনি। উল্লখ্য, টলেমির (Ptolemy) আলগেমিস্ট (Almagest) গ্রন্থের ভাষ্যকার হিসেবেও হাইপাতিয়া খ্যাত। অ্যাস্ট্রোবেল এবং হাইড্রোমিটার-এর উন্নয়ন ও আধুনিকায়নে অসাধারণ ভূমিকা রেখেছেন তিনি। বর্তমানে ব্যবহৃত হাইড্রোমিটার হাইপাতিয়ার হাতে এমন উন্নত হওয়ার পথ খুঁজে পায়।

হাইপাতিয়া ছিলেন তৎকালীন রোমান সাম্রাজ্যের সর্বশ্রেষ্ঠ গণিতজ্ঞ এবং অবিসংবাদিত দার্শনিক বক্তা। মাতবাদিক দ্বন্দ্বে বির্যস্ত মানুষকে নারী-পুরুষ এবং জাতি ও ধর্মনির্বিশেষে পরস্পর সহানুভূতিশীল করে তোলাই ছিল তার দর্শনের মূল। তিনি মনে করতেন, এটি নিশ্চিত করা গেলে বিশ্বশান্তি বহুলাংশে নিশ্চিত হয়ে যাবে। এসব নিয়ে তিনি বক্তৃতা দিয়ে বেড়াতেন। তাই তাকে প্রথম মহিলা দার্শনিক বক্তা বলা হয়। বৈজ্ঞানিক গবেষণার সঙ্গে সঙ্গে তিনি সর্বধর্মের প্রতি সৌহার্দ্য প্রদর্শনের মাধ্যমে সর্বজনীন ভ্রাতৃত্ববোধ জাগ্রত করার কাজ করতেন। বিদ্যমান কোনো ধর্মবিশ্বাসের প্রতি তার কোনো অশ্রদ্ধা ছিল না। সবার প্রতি তাঁর মমতা ও শ্রদ্ধাবোধ ছিল।

৪১৫ খ্রিষ্টাব্দের মধ্য ভাগের এক দিনের কথা। প্রতিদিনের মতো ওই দিনও হাইপাতিয়া ধর্মীয় সহিষ্ণুতার উপযোগ নিয়ে বক্তৃতা দিচ্ছিলেন। এসময় স্থানীয় সিটি বিশপ সেন্ট ক্যারিলের নির্দেশে এক পাদ্রির নেতৃত্বে এক দল খ্রিষ্টান এসে তাকে ধরে টেনে হিচড়ে গির্জার ভিতর নিয়ে যায়। হাইপাতিয়া এমন জঘন্য আচরণের কারণ জানতে চাইলেন।
মূর্খ ধর্মবাজ বিশপ ক্ষুব্ধ হয়ে বললেন, বিজ্ঞান ধর্মবিরুদ্ধ, বিজ্ঞানী ধর্মনাশক, অধিকন্তু তুমি নারী। নারী হয়েও তুমি ধর্মবিরুদ্ধ কাজ করে যাচ্ছ। তোমাকে বাঁচিয়ে রাখলে যিশু কষ্ট পাবেন।পবিত্র তিন আত্মার নির্দেশ এসেছে তোমাকে হত্যা করার। আমি তোমাকে পবিত্র আত্মার নির্দেশে মৃত্যুদণ্ড দিলাম। এরপর এক ঝাঁক ধর্মবাজ হাইপাতিয়ার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে। চরম নিষ্ঠুরতার সঙ্গে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়।
এক দিন পর তাঁর মৃত্যু সংবাদ শুনে রোমান সম্রাট দুঃখ প্রকাশ করে হাইপাতিয়াকে “দর্শনের জন্য শহিদ” আখ্যায়িত করেন। বর্তমানে হাইপাতিয়া নারীজাগরন আন্দোলনের বিশ্বপথিকৃৎ।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!