হাইফেন আর ড্যাশ-এর প্রয়োগবিধি: পর্ব-০১

এবি ছিদ্দিক

সূক্ষ্ম পার্থক্য: হাইফেন আর ড্যাশের প্রয়োগবিধি: পর্ব-০১
 
‘১.১। টম টটেনহাম-প্যারিস ঘুরতে যাবে।
১.২। টম টটেনহাম–প্যারিস ঘুরতে যাবে।
২.১। ১-৫ বছরের শিশুদের টিকা দেওয়া যাবে না।
২.২। ১–৫ বছরের শিশুদের টিকা দেওয়া যাবে না।’
 
ওপরের বাক্য কটি ব্ল্যাকবোর্ডে লেখা সম্পন্ন হতেই খোকন স্যার শিক্ষার্থীদের কাতারে গিয়ে প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে বললেন, “আমার লেখা যুগল বাক্যগুলোর মধ্যে কোনটি সংগত আর কোনটি অসংগত?”
 
উদ্ধৃতিচিহ্নের ঘটনার পর থেকে সানার শিক্ষা হয়ে গিয়েছে; সেদিন থেকে ব্যাকরণে ক্লাসে সে আর সবজান্তা সাজতে যায় না। আর ছাফিয়া? সে তো সেদিন থেকে তারকা বনে গিয়েছে! স্যারের প্রশ্ন শুনে প্রত্যেক শিক্ষার্থীই তার (ছাফিয়ার) দিকে উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। “মনে হচ্ছে আজকেও তোমাকেই বলতে হবে,” ছাফিয়াকে লক্ষ্য (উদ্দেশ্য) করে খোকন স্যার কথাটি বললেন। স্যার যে এমনটি বলবেন, ছাফিয়া তা আগে থেকেই আঁচ করতে পেরেছিল, স্যারের বলাতে তা পূর্ণতা পেল। ছাফিয়া অলস, কিন্তু অত্যন্ত নান্দনিক ভঙ্গিতে বলল, “আপনার লেখা প্রতিটি বাক্যই শুদ্ধ, তবে অর্থের দিক থেকে বিস্তর পার্থক্য রয়েছে, স্যার।” ছাফিয়ার পূর্ণ আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উত্তর দেওয়ার ধরন এবং স্যারের মুখে খুশির ছাপ দেখে অন্যরা নড়েচড়ে বসল। তারা নিশ্চিত হয়ে গেল যে, ছাফিয়া একদম ঠিক উত্তর দিয়েছে এবং গত ক্লাসের মতো আজকেও দুইটি যতিচিহ্নের যথাযথ প্রয়োগ শিখতে মিলবে।
 
“তাহলে দেরি কীসে! তোমার ব্যাখ্যা শুনতে তোমার সহপাঠীরা কেমন অধীর হয়ে আছে, তা দেখতে পাচ্ছ না!” খোকন স্যার ছাফিয়াকে তাগিদ দিয়ে বললেন। এবার ছাফিয়া বলতে শুরু করল—
“বাক্যের মধ্যে দুইটি সমজাতীয় শব্দের মধ্যখানে তখনই হাইফেন ( – ) বসে, যখন ওই শব্দ দুটির মধ্যে দ্বন্দ্ব সমাস সম্পন্ন হয়। দ্বন্দ্ব সমাসে সমাসবদ্ধ পদে ব্যাসবাক্যের ‘ও’/‘আর’/‘এবং’ আর ‘কিংবা’/‘বা’/‘অথবা’ লোপ পেয়ে সেগুলোর পরিবর্তে হাইফেন বসে। অর্থাৎ, মা ও বাবা = মা-বাবা; হাত ও পা = হাত-পা; ভালো ও মন্দ = ভালো-মন্দ ; দেশ ও বিদেশ = দেশ-বিদেশ; উত্তর ও দক্ষিণ = উত্তর-দক্ষিণ; খাওয়া ও পরা = খাওয়া-পরা; পন্টিং, স্মিথ, ওয়ার্নার ও ম্যাক্সওয়েলের ফিল্ডিং = পন্টিং-স্মিথ-ওয়ার্নার-ম্যাক্সওয়েলের ফিল্ডিং; সাত ও পাঁচ = সাত-পাঁচ; রাজা ও রানি = রাজা-রানি, পেলে ও ম্যারাডোনা = পেলে-ম্যারাডোনা প্রভৃতি। একইভাবে, টটেনহাম ও প্যারিস = টটেনহাম-প্যারিস ; ১ ও ৫ = ১-৫। অর্থাৎ, ১.১ নম্বর বাক্যে টম কোনো একটি জায়গায় থাকে। সে সেখান থেকে টটেনহাম ও প্যারিসে ঘুরতে যাবে। বাক্য ২.১-এ কেবল ১ বছরের আর ৫ বছরের শিশুদের টিকা দেওয়া যাবে না; ২, ৩ ও ৪ বছরের কিংবা তার চেয়ে বেশি বয়সের শিশুদের টিকা দিতে কোনো সমস্যা নেই।
এবার ড্যাশযুক্ত বাক্য দুটি নিয়ে বলছি। দুই বা তারও অধিক সময় (কাল) বা দূরত্ব নির্দেশক শব্দের মধ্যখান থেকে ‘থেকে’ বা ‘হতে’ বাদ দিলে তার পরিবর্তে ‘ড্যাশ’ (এন ড্যাশ) বসাতে হয়। যেমন: ঢাকা থেকে কলকাতা = ঢাকা–কলকাতা; ১০ থেকে ১৫ জন = ১০–১৫ জন; মে থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত = মে–সেপ্টেম্বর পর্যন্ত; চট্টগ্রাম থেকে দিল্লি, তারপর দিল্লি থেকে সিডনি = চট্টগ্রাম–দিল্লি–সিডনি; শনি থেকে বুধবার পর্যন্ত = শনি–বুধবার পর্যন্ত; ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১ = ১৯৪৭–১৯৭১। একইভাবে, টটেনহাম থেকে প্যারিস = টটেনহাম–প্যারিস; ১ থেকে ৫ বছরের = ১–৫ বছরের। অর্থাৎ, ১.২ নম্বর বাক্যে টম টটেনহামে থাকে। সে সেখান (টটেনহাম) থেকে প্যারিসে ঘুরতে যাবে। বাক্য ২.২-এ ১ থেকে ৫ বছরের মধ্যে কোনো শিশুকেই টিকা দেওয়া যাবে। স্যার!”
 
ছাফিয়ার বলা শেষ হতে না-হতেই সানা দাঁড়িয়ে গেল আর জিজ্ঞেস করল, “ তা, ‘কিংবা’-র পরিবর্তে হাইফেনের প্রয়োগ কীভাবে করব?” ছাফিয়া আবারও বলতে শুরু করল—
“দুইটি সাংখ্যিক মানের মধ্যে সন্দেহ বা দ্বিধা থাকলে ওই সংখ্যা দুটির মধ্যখানে যে কিংবা/বা/অথবা ব্যবহার করা হয়, সেটি না-দিলে তার পরিবর্তে হাইফেন দিতে হয়। যেমন: ৫ কিংবা ৬ বছর লাগবে = ৫-৬ বছর লাগবে; উনিশ কিংবা বিশ = উনিশ-বিশ প্রভৃতি।”
“ ‘হাইফেন’ আর কোন কোন ক্ষেত্রে ব্যবহার করতে হবে?” এবার খোকন স্যার নিজেই জিজ্ঞেস করলেন।
শিক্ষক-শিক্ষক ভাব নিয়ে ছাফিয়ার বলা আবারও শুরু হলো—
হাইফেন মূলত সমাসবদ্ধকরণে ব্যবহৃত হয়। হাইফেনের প্রধান ব্যবহার ইতোমধ্যে বলা হয়ে গিয়েছে। অর্থাৎ, যেখানেই দ্বন্দ্ব সমাস সম্ভব, সেখানেই হাইফেন দেওয়া যাবে; যেখানে ‘ও’ ব্যবহার করা যাবে, সেখানে ‘ও’-র পরিবর্তে হাইফেন ব্যবহার করা যাবে। ক্রিয়াপদের শুরুতে ব্যবহৃত না-বাচক ‘না’-ও হাইফেন দিয়ে লেখাটা সংগততর।
“যেমন: না-বলা, না-করা, না-মানা প্রভৃতি। তাই না?” ছাফিয়ার কাজ আরও একটু এগিয়ে দিয়ে খোকন স্যার বললেন।
— একদম, স্যার!
“আর কোথায় লিখতে হবে?” খোকন স্যার পুনরায় জিজ্ঞেস করলেন।
— অনুরোধ বোঝাতে ক্রিয়াপদের শেষে হাইফেন দিয়ে ‘করুন-না’, ‘বলুন-না’, ‘ছাড়ুন-না’ প্রভৃতিরূপে লিখতেও কোনো বাধা নেই। সর্বনামের সঙ্গে পরবর্তী বিশেষ্য বা সর্বনাম যুক্ত করার ক্ষেত্রেও হাইফেন ব্যবহার করা যায়।
“যেমন: যে-কোনো, যে-কেউ, যা-তা, সে-জন, যে-কারণে প্রভৃতি,” দ্বিতীয় বেঞ্চ থেকে তাসিয়া জোর-গলায় বলে উঠল।
— ঠিক তাই, তাসিয়া! আবার, দ্বিরুক্তির ক্ষেত্রে দ্বিতীয় শব্দের সামান্য পরিবর্তন হলে শব্দ দুটি নিরেটভাবে লিখতে হয়। যেমন: মাঝেমধ্যে, তাড়াতাড়ি প্রভৃতি। কিন্তু, যদি এরূপ ক্ষেত্রে শব্দ দুটি নিরেটভাবে লিখলে দৃষ্টিকটু মনে হয়, তাহলে মধ্যখানে হাইফেন ব্যবহার করা যাবে। অনুগামী ক্রিয়ার ক্ষেত্রেও একই নিয়ম।
“তবে ওলটা-পালটা, যেখানে-সেখানে, এপার-ওপার, যেতে-যেতে, পড়তে-পড়তে প্রভৃতি বানানে হাইফেন দেওয়ার এই কারণ!” বিস্ময়ের সঙ্গে সাবিত বলল।
— আর নয়তো কী! বাক্যের মধ্যে যৌগিক ক্রিয়াপদকে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহার করা হলে ওই পদদ্বয় বা পদগুলোর মধ্যখানেও হাইফেন দেওয়া যায়। “সেদিন মোরশেদ স্যারের লেখায় ‘উল্লেখ-করা’, ‘এঁকে-দেওয়া’, ‘বাড়িয়ে-বলা’ প্রভৃতি রূপ তাহলে এই নিয়মে লেখা হয়েছে?” অবশেষে ক্লাসের নিশ্চুপ ছাত্র ইশমামের মুখ দিয়েও প্রশ্ন বেরিয়ে এল।
— তোমার উপলব্ধি কী আর ভুল হতে পারে! তারপর, সন্ধির ঝামেলা এড়াতে ‘কু-অভ্যাস’, ‘অতি-অল্প’, ‘সহ-অধিনায়ক’, ‘পালটা-আক্রমণ’ প্রভৃতি ক্ষেত্রেও নির্দ্বিধায় হাইফেন ব্যবহার করা যাবে। সংখ্যার সঙ্গে বিভক্তি যুক্ত করতে কিংবা শব্দের মূল বানান অবিকৃত রাখতে হাইফেনের ব্যবহার কিন্তু আবশ্যক হয়ে দাঁড়ায়।
“৩-এর, ১৭৪৭-এ, ‘শুবাচ’-এ, ‘ক’-এর, ‘মামা’-র প্রভৃতি হচ্ছে এই নিয়মের প্রকৃষ্ট উদাহরণ,” টমের আরেক ছাত্রী আফসানা এক নিশ্বাসে বলে দিল।
— যথার্থ বলেছ, পিমা! কোনো জায়গার পরিচয়ে কোনো ঘটনা বা বিষয় কিংবা অনুষ্ঠানের নামকরণের ক্ষেত্রেও হাইফেন ব্যবহার করা যায়।
“মদিনা-সনদ, তিস্তা-চুক্তি, রিও-অলিম্পিক, লর্ডস-টেস্ট প্রভৃতি এই নিয়মে লেখা হয়েছে,” সানজুর সপ্রতিভ মন্তব্য।
— বহত খুব! দাপ্তরিক বা প্রাতিষ্ঠানিক পদধারীর পদমর্যাদা বা কমিটির নাম লিখতেও হাইফেন ব্যবহার করা যায়। ‘শিক্ষা-সচিব’, ‘আহ্বায়ক-কমিটি’ প্রভৃতি রূপ এই নিয়মের লেখা হয়। এক বর্ণের শব্দকে অন্য শব্দের সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার ক্ষেত্রেও হাইফেনের ব্যবহার দৃষ্টিনন্দন।
“তাহলে কি ‘ব-তে বই’ ‘n-তম পদ’ ‘ক-সংখ্যক ব্যক্তি’ লিখতে কোনো সমস্যা নেই?” সাফাও প্রশ্ন করার লোভ সামলাতে পারল না।
— উঁহুঁ, কোনো সমস্যা নেই। হাইফেনের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে পঙ্‌ক্তি শেষে শব্দ ভাঙার ক্ষেত্রে। কোনো লাইনে একটি শব্দের পুরোটার সংকুলান সম্ভব না-হলে ওই শব্দটি ভেঙে বাকি অর্ধেক পরবর্তী লাইনে লেখার সময় পূর্ববর্তী লাইনের ভাঙা অংশের পরে হাইফেন জুড়ে দিতে হয়।
“বুদ্ধি-/মতি, মাতৃ-/হারা, লাগাম-/ছাড়া— এভাবে তো?” আকলিমা গাম্ভীর্যের সঙ্গে প্রশ্ন করল।
— আমার বন্ধুমহলের উপলব্ধি ভুল কীভাবে হয়! ‘বর্ণ-পরিচয়’, ‘স্বাধীনতা-যুদ্ধ’, ‘অক্ষর-জ্ঞান’, ‘দুর্যোগ-কবলিত’, ‘পরীক্ষা-হল’ প্রভৃতি সমাসবদ্ধ পদের অনুরূপ পদে সম্বন্ধবাচক আর নিমিত্তবাচক বিভক্তি কিংবা অনুসর্গের পরিবর্তে হাইফেন লেখা হয়; লিখতে কোনো বাধাও নেই। আর হ্যাঁ, কোনো শব্দের শেষে ‘সহিত’ বা ‘সুদ্ধ’ অর্থে ‘সহ’ সবসময় হাইফেন দিয়ে লিখতে হবে।
“বই-সহ, টাকা-সহ, প্রমাণ-সহ, শিক্ষক-সহ প্রভৃতি হচ্ছে এই নিয়মের দৃষ্টান্ত” শ্রেণির প্রাজ্ঞ ছাত্রী লিজার অংশগ্রহণও বাদ গেল না।
— জি হ্যাঁ, লিজু। এসবের পাশাপাশি সংখ্যার সাহায্যে খেলার ফলাফল প্রকাশের ক্ষেত্রেও হাইফেন ব্যবহার করতে পারলে হাইফেনের কাজ মোটামুটি চালিয়ে নেওয়া যাবে।
“গতকাল ফুটবল খেলায় ব্রাজিল আর্জেন্টিনাকে ৩-০ গোলের ব্যবধানে হারিয়েছে। আর, আজ দাবা খেলায় আমি, সুমাইয়াকে ৫-১ পয়েন্টে হারিয়েছি।” শ্রেণির সবচেয়ে ঢঙি ছাত্রী মুনতাহা বরাবরের মতো ঢঙে পূর্ণ চমৎকার ভঙ্গিমায় ছাফিয়ার শেষ নিয়মটির উদাহরণ দিয়ে দিল।
— মুনতাহার উদাহরণে হাইফেন নিয়ে আমার বক্তব্য এখানেই ফুরোচ্ছে, স্যার।
ছাফিয়ার কথা শেষ করে না-বসতেই তাসিয়া কিছু বলবার উদ্দেশ্যে দাঁড়িয়ে গেল। সে বলল, “হাইফেনের ব্যবহার তো গেল, এবার কোন কোন ক্ষেত্রে ড্যাশ ব্যব…”
তাসিয়ার কথা শেষ না-হতেই ক্লাস সমাপ্তির ঘণ্টা পড়ে যাওয়ায় খোকন স্যার তাসিয়াকে থামিয়ে দিয়ে ক্লাসের ইতি টেনে দিতে বাধ্য হলেন।
লিংক: https://draminbd.com/হাইফেন-আর-ড্যাশ-এর-প্রয়োগ/
 
error: Content is protected !!