হাঙ্গেরি (Hungary) : ইতিহাস ও নামকরণ

কীভাবে হলো দেশের নাম (ইউরোপ)

ড. মোহাম্মদ আমীন

হাঙ্গেরি (Hungary)

হাঙ্গেরি বা হাঙ্গেরীয় প্রজাতন্ত্র মধ্য ইউরোপের একটি স্থলবেষ্টিত প্রজাতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এর উত্তরে স্লোভাকিয়া, পূর্বে ইউক্রেন ও রোমানিয়া, দক্ষিণে সার্বিয়া ও ক্রোয়েশিয়া, দক্ষিণ-পশ্চিমে স্লোভেনিয়া এবং পশ্চিমে অস্ট্রিয়া। হাঙ্গেরির অধিকাংশ এলাকা দানিউব উপত্যকার সমতল ভূমিতে অবস্থিত। এই সমতলভূমির ভেতর দিয়ে দানিউব নদী প্রবাহিত হয়েছে। হাঙ্গেরির রাজধানী ও বৃহত্তম শহর বুদাপেস্ট দানিউব নদীর উভয় তীরে অবস্থিত। শহরটি পূর্ব মধ্য ইউরোপের সাংস্কৃতিক ও বাণিজ্যিক কেন্দ্র। হাঙ্গেরির বর্তমান সীমানা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর ত্রিয়াননের চুক্তিতে ১৯২০ সালে নির্ধারিত হয়।১৯৫৭ খ্রিষ্টাব্দের ১ অক্টোবর হাঙ্গেরির প্রথম গৃহীত হয়।

তুর্কীয় (Turkic) অন-ওগা (on-ogur) শব্দ হতে হাঙ্গেরি নামের উৎপত্তি। এর অর্থ দশ তীরের লোক, এককথায় বলা যায় দশ-উপজাতির জোট।  তাহলে উপজাতি দশ তীর হলো কেন? তীর ছিল শক্তি, গতি ও ঐতিহ্যের প্রতীক। প্রত্যেক উপজাতি নিজেদের তীরের মত শক্তিশালী, ক্ষীপ্র ও ঐতিহ্যময় ভাবত। তাই তীর দিয়ে উপজাতিকে নির্দেশ করা ছিল সম্মানের বিষয়। বাইজেনটিয়ান (Byzantine) উপ্যাখ্যানে হাঙ্গেরিয়ানদের এ নাম দেওয়া হয়। বংশবিবরণে ভুলবশত হাঙ্গেরিয়ানদের যাযাবর আচরণ, মুখাবয়ব দেখে তাদের এ নামে অভিহিত করা হয়। যদিও তাদের ভাষা ছিল উরালিক (Uralic)। পরবর্তীকালে হাঙ্গেরিয়ান উপজাতিরা ৭টি হাঙ্গেরিয়ান উপ-গোষ্ঠী ও ৩টি খাজারিয়ান উপজাতির মধ্যে জোট গঠন করে। কিন্তু নাম আগের মতোই থেকে যায়।

কথিত হয় হাঙ্গেরি নামের এইচ (H) ল্যাটিন হাঙ্গারিয়ার প্রতিচিহ্ন এবং অধিকাংশ গবেষকের অভিমত এটি প্রকৃতপক্ষে হানস জনগোষ্ঠীর ছদ্মনাম ও পরিবির্ততি ইতিহাসের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত। এ ছদ্ম বা পরিবর্তিত হানসরা আভারদের (Avar) পুর্বে এখানে আবাস গড়ে তুলেছিল। এইচ এর পরবর্তী শব্দ এসেছে বাইজানটাইন-গ্রিক হতে উদ্ভুত ল্যাটিন শব্দ ওংগ্রিও (Oungroi) হতে। যার অর্থ অঙ্গুর (Onogur) এর দশ উপজাতি।

হাঙ্গেরির জনগণ নিজেদেরকে ‘মজর’ (গধমুধৎ) নামে ডাকে। মজরেরা ছিল এশিয়া  থেকে আগত যাযাবর গোষ্ঠী। ৯ম শতকের শেষভাগে আরপাদের নতৃত্বে মজরেরা দানিউব ও তিসজা নদীর মধ্যবর্তী সমভূমি জয় করে নেয়। যা বর্তমান হাঙ্গেরীয় সমভূমির মধ্যভাগ। ১১শ শতকের শুরুর দিকেই মজরেরা রাজনীতিকভাবে সংঘবদ্ধ হয় এবং খ্রিস্টধর্মে ধর্মান্তরিত হয়। হাঙ্গেরির প্রথম রাজা ছিলেন প্রথম স্টিফেন (১০০০ খ্রিস্টাব্দ)। ১০৮৩ খ্রিষ্টাব্দে  তাঁকে সাধু ঘোষণা করা হয়। অনেকে বলেন, হাঙরি বা ক্ষুধার্থ শব্দ হতে হাঙ্গেরি নামের উদ্ভব। এশিয়া হতে আগত মজর যাযাবর গোষ্ঠীর লোকের ছিল গরীব ও ক্ষুধার্থ। তারা এখানে এসে যা পাচ্ছিল তাই খেতে শুরু এবং পরবর্তীকালে সামনে যে ভূখণ্ড পাচ্ছিল তা-ও নিজেদের গ্রাসে নিয়ে আসছিল। এজন্য তাদের বলা হতো হাঙ্গার। কথিত হয়, এ হাঙরি থেকে হাঙ্গেরি নামের উদ্ভব।

হাঙ্গেরির মোট আয়তন ৯৩,০৩০ র্বগকিলোমিটার বা ৩৫,৯১৯ বর্গমাইল। তন্মধ্যে জলীয় ভাগের পরিমাণ ০.৭৪%। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, হাঙ্গেরির মোট জনসংখ্যা ৯৮,৭৭,৩৬৫  এবং প্রতি বর্গকিলোমিটারে জনসংখ্যার ঘনত্ব ১০৭.২। আয়তন বিবেচনায় হাঙ্গেরি পৃথিবীর ১০৯-তম এবং জনসংখ্যা বিবেচনায় ৮৪-তম বৃহত্তম দেশ কিন্তু জনসংখ্যার ঘনত্ব বিবেচনায় এটি ৯৪-তম জনবহুল দেশ। বুদাপেস্ট হাঙ্গেরিরর রাজধানী ও বৃহত্তম শহর। দাপ্তরিক ভাষা হাঙ্গারিয়ান এবং সরকার ব্যবস্থা ইউনিটারি সংসদীয় সাংবিধানিক গণতন্ত্র। সরকারিভাবে হাঙ্গেরির অধিবাসীদের হাঙ্গারিয়ান বলা হয়।

২০১৫ খ্রিষ্টাব্দের হিসাবমতে, হাঙ্গেরির জিডিপি (পিপিপি) ২৫৫.২৫৪ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং সে হিসাবে মাথাপিছু আয় ২৫,২৩৯ ইউএস ডলার। অন্যদিকে, জিডিপি (নমিনাল) ১২৬.৬৯১ বিলিয়ন ইউএস ডলার এবং মাথাপিছু আয় ১২,৮৫৩ ইউএস ডলার। উল্লেখ্য বিশ্বের জনগণের মাথাপিছু আয় ১৩,১০০ ইউএস ডলার। মুদ্রার নাম ফরিন্ট। মাথাপিছু আয় বিবেচনায় এটি পৃথিবরি ৫৭-তম ধনী দেশ।

১৪শ শতকে বিদেশি শাসকেরা হাঙ্গেরি জয় করে। ১৪শ ও ১৫শ শতক ধরে বিভিন্ন ইউরোপীয় রাজবংশ হাঙ্গেরি শাসন করে। এরপর ১৬শ ও ১৭শ শতকে দেশটির অধিকাংশ ছিল উসমানীয় সাম্রাজ্যের দখলে। এ সময় দেশটির পশ্চিমের কিয়দংশ অস্ট্রিয়ার হাব্সবুর্গ রাজবংশ নিয়ন্ত্রণ করত। ১৭শ শতকের শেষভাগে এসে হাব্সবুর্গেরা প্রায় সমস্ত হাঙ্গেরি দখলে নিতে সক্ষম হয়। হাঙ্গেরীয়রা ১৮৪৮ খ্রিষ্টাব্দে  হাব্সবুর্গদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করে, কিন্তু তা দমন করা হয়। ১৮৬৭ খ্রিষ্টাব্দে  দুই পক্ষ সন্ধিচুক্তির মাধ্যমে একটি দ্বৈত সাম্রাজ্য গঠন করে, যার নাম দেওয়া হয় অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের (১৯১৪-১৯১৮) পর অস্ট্রো-হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্য বিলীন হয়ে যায় এবং হাঙ্গেরি পূর্ণ স্বাধীনতা লাভ করে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর হাঙ্গেরিতে সাম্যবাদী সরকার ক্ষমতা দখল করে এবং দেশটি সোভিয়েত ব্লকে চলে যায়।  ১৯৯০ খ্রিষ্টাব্দের নির্বাচনের পর হাঙ্গেরিতে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়। 

হাঙ্গেরিয়ান জ্যানোস ইরিনভি (Janos Irinyi) শব্দহীন ম্যাচ, (noiseless match) ইর্নো রুবিক (Erno Rubik) আবিষ্কার করেন রুবিক কিউব এবং ইমরে ব্রডি আবিষ্কার করেন ক্রিপটন ইলেকট্রিক বাল্ব। হাঙ্গেরির ভাষা বলা ও শেখায় খুব কঠিন। পৃথিবীর বৃহত্তম ভূ-গুহা (geothermal cave) পদ্ধতি হাঙ্গেরিতে পাওয়া গিয়েছে। এটি বুদাপেস্টের ভূগর্ভে পাওয়া গিয়েছে। ইউরোপের বৃহত্তম ভূগর্ভস্থ হ্রদও হাঙ্গেরিতে অবস্থিত।

হাঙ্গেরি প্রাচীন রোমান যুগ হতে তার বৃহৎ ও সম্প্রসারিত গোসলখানার জন্য বিখ্যাত। ইউরোপের বৃহত্তম স্নান-স্পা কমপ্লেক্স হাঙ্গেরিতে অবস্থিত। হাঙ্গেরির সংস্কৃতির খুব অল্প স্থান ভেদেও ভিন্নতা দেখা যায়। কয়েক কিলোমিটার ভ্রমণ করলে নানা সংস্কৃতির  দেখা মেলে। খাদ্যের ক্ষেত্রের বিষয়টি প্রযোজ্য। অল্প দূরত্বের হোটেলগুলোতে খাদ্যের ভিন্নতা চোখে পড়ার মতো। এটি গেলার্ট পাহাড়ে পাওয়া গিয়েছে।

হাঙ্গেরির সংসদ ভবনের আয়তন ১৮,০০০ বর্গমিটার বা ১,৯৩,৭৫০ বর্গফুট। ৯৬ মিটার ৩১৫ ফুট উঁচু এ ভবনে ৬৯১টি কক্ষ এবং ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ সিড়ি রয়েছে। ৯০টি স্টাচু এবং ২৩ ক্যারেটের ৪০ কিলোগ্রাম স্বর্ণ দিয়ে অভ্যন্তরীণ সজ্জা সম্পন্ন করা হয়েছে। এটি পৃথিবীর তৃতীয় বৃহত্তম পার্লামেন্ট ভবন। ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দে  এর নির্মাণ কাজ শুরু হয় এবং ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দে  শেষ হয়। এর নাম নিউ- গোথিক প্রসাদ।

হাঙ্গেরিতে তুর্কি দরবেশ গুল বাবার মাজার রয়েছে। তিনি ষোড়শ শতকে তুর্কি অভিযানের সময় হাঙ্গেরি এসেছিলেন। ১৫৪১ খ্রিষ্টাব্দে  তার মৃত্যুর পর বুদায় সমাহিত করা হয় এবং তখন থেকে তার মাজার ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের পূণ্যস্থান হিসাবে গণ্য হয়ে আসছে। বুদাপেস্টে এখনও অক্ষত কয়েকটি তুর্কি অবকাঠামোর মধ্যে এটি অন্যতম। এটি পৃথিবীর সর্ব-উত্তরে অবস্থিত ইসলাম ধর্মাবলম্বীদের একমাত্র তীর্থস্থান।

লন্ডনের পর বুদাপেস্ট পৃথিবীর প্রাচীনতম ভূগর্ভস্থ রেলওয়ে যোগাযোগ ব্যবস্থার অধিকারী।  ১৮৯৬ খ্রিষ্টাব্দে  হাঙ্গেরির সহস্রবর্ষ স্বাধীনতা দিবস উদ্‌যাপনের দিন এটি উদ্‌বোধন করা হয়। এ জন্য এর নাম মিলেনিয়াম আন্ডারগ্রাউন্ড।

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সংগীত উৎসব হয় হাঙ্গেরিতে। এ উৎসবের নাম সিগেট ফেস্টিভল (Sziget Festival)। প্রতিবছর আগস্ট মাসে এটি অনুষ্ঠিত হয় এবং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ থেকে ৪ লাখের অধিক সংগীতপ্রেমী বুদাপেস্টের শিপইয়ার্ড দ্বীপে অনুষ্ঠিত এ উৎসবে অংশগ্রহণ করেন।


জর্জিয়া (Georgia) : ইতিহাস ও নামকরণ

জার্মানি (Germany) : ইতিহাস ও নামকরণ

গ্রিস (Greece) : ইতিহাস ও নামকরণ

সূত্র:  কীভাবে হলো দেশের নাম, ড. মোহাম্মদ আমীন, পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

সাধারণ জ্ঞান সমগ্র

বাংলাদেশ ও বাংলাদেশবিষয়ক সকল গুরুত্বপূর্ণ সাধারণজ্ঞান লিংক

 

error: Content is protected !!