হ্যাপি নিউ ইয়ার: স্যার না ডাকলে ভাঙচুর শুরু হবে

ড. মোহাম্মদ আমীন
সংযোগ: https://draminbd.com/হ্যাপি-নিউ-ইয়ার-স্যার-না-ড/
অনেক বছর আগের কথা। সহকারী কমিশনার (ভূমি) পদে বদলি হলাম একটি উপজেলায়।
জেলাপ্রশাসক স্বাগত জানিয়ে বললেন : তোমার উপজেলার ওই রাজনীতিক দলের সভাপতি খুব স্পর্শকাতর মানুষ। তাকে ‘স্যার’ সম্বোধন করতে হবে। নইলে চেয়ার- টেবিল ভাঙচুর করবেন।
চাকরিতে নতুন নই। অনেক জাঁদরেল লোকের সঙ্গে কাজ করেছি। কেউ এমন উদ্ভট দাবি করেননি। ছোটো হোক বড়ো হোক, কাউকে স্যার ডাকতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু জোর করে স্যার আদায় এক ধরনের মাস্তানি। ক্যাডার অফিসারদের মধ্যে এমন প্রবণতা বেশি দেখা যায়।
জেলাপ্রশাসককে বললাম : এটা কি উচিত হবে?
: উচিত-অনুচিত বুঝি না। তোমার আগের জনও এমন করেছে। ফলো সিনিয়র।
: আমি তো এমন মাস্তানি সম্বোধনে অভ্যস্ত নই।
: অভ্যস্ত হবার চেষ্টা কর। অভিযোজন সফলতার সোপান। প্রশাসনে এটি খুব প্রয়োজন। কারো মাথায় ছাতি, কারো মাথায় লাথি।
এরপর আর কথা চলে না। সায় দিয়ে বেরিয়ে এলাম। মনটা খারাপ, নতুন স্টেশনে সময়টা ভালো যাবে বলে মনে হয় না। একত্রিশে ডিসেম্বর উপজেলায় যোগদান করি। ইউএনও সাহেব পূর্ব-পরিচিত। রাফ এন্ড টাফ ম্যান। ভেবেছিলাম তিনি ভিন্ন কিছু শোনাবেন। সালাম দিয়ে বসতে না বসতে তিনিও জেলাপ্রশাসকের মতো উপদেশ দিলেন : সভাপতিকে স্যার সম্বোধন করবে।
: আপনিও কি তাকে স্যার ডাকেন?
: আমার কথা আলাদা। উপজেলার বাকি অফিসারদের জন্য বাধ্যতামূলক। স্যার ডাকলে তিনি খুশি হন। কাউকে খুশি করতে আপত্তি কীসের।
: না ডাকলে?
: চেয়ার-টেবিল ভাঙবেন, কাগজপত্র ছিঁড়বেন, গালাগালি করবেন। উপজেলা প্রকৌশলী সাহেব কয়েকদিন আগে জয়েন করেছেন। স্যার সম্বোধন করেননি বলে সভাপতি সাহেবের লোকজন চেয়ার-টেবিল এবং দরজা-জানালা ভেঙে চুরমার করে দিয়েছে। এখন ডাকেন। ঠেলার নাম বাবাজি।
: অফিস ভাঙলে মামলা করব।
: পুলিশ তোমার মামলা নেবে কেন?
: নেবে না কেন?
: পুলিশ ক্ষমতার পাশে পাশে থাকে। যেভাবে বলছি সেভাবে করো। বয়স্ক লোক, স্যার ডাকলে এমন কী সর্বনাশ হয়ে যাবে? উল্টোপাল্টা করো না।
আমি বললাম : ঠিক আছে।
ইউএনও সাহেবে বললেন: সভাপতি সাহেব তোমার অফিসে গিয়ে বক্তৃতা দেবেন, উপদেশ দেবেন। মন দিয়ে শোনার চেষ্টা করবে। প্রতিকথায় সায় দেবে। প্রশংসা করবে। তাহলে এখানে যতদিন থাক, রাজার হালে থাকতে পারবে। সবচেয়ে মিষ্টি কলাটা তোমার বাসায় চলে আসবে। আর একটা কথা, সভাপতি সাহেব বলতে শুরু করলে ঘণ্টার আগে থামেন না। অস্বস্তি প্রকাশ করবে না। বক্তৃতা শেষ হলে জোরে তালি দেবে। কিছু কিছু পয়েন্ট নোট করে রেখে তাকে শুনিয়ে বলবে, অ্যাক্সিলেন্ট হয়েছে।
ই্উএনও সাহেবের অফিস থেকে বের হয়ে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ কর্মকর্তার অফিসে গেলাম। তারও একই মত। সভাপতি সাহেব মারাত্মক লোক। স্যার না ডাকলে ক্ষেপে যান।
অফিসারদের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ শেষ করে আমার অফিসে ঢুকতে ঢুকতে তিনটা বেজে গেল। অফিসে বসে সভাপতিকে উদ্দেশ করে একটা পত্র লিখলাম। নাজিরকে দিয়ে তা সভাপতি সাহেবের কাছে পাঠিয়ে দিই। বাসা দূরে নয় তার, অফিস থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটা-পথ।
পত্রে কী লিখেছি তা এখন পুরোটা মনে পড়ছে না। যতটুকু মনে পড়ে লিখেছিলাম : স্যার, অদ্য আপনার উপজেলায় যোগদান করেছি। স্যার, আপনার বাসায় গিয়ে আপনার সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাতে আগ্রহী। স্যার, তা যদি সম্ভব না হয় আগামীকাল নববর্ষের প্রথম দিন আমার অফিসে আপনাকে সাদর আমন্ত্রণ জানাচ্ছি। স্যার, নববর্ষের সূচনাটা আপনার মহানুভব উপস্থিতি দিয়ে স্মরণীয় করে রাখতে চাই। স্যার, অনুগ্রহপূর্বক সময় দিয়ে বাধিত করবেন।
নাজির ফিরে এলেন আধ ঘণ্টার মধ্যে। মুখে হাসি, সঙ্গে একজন মুটে। মুটের বাম হতে আমভর্তি (বারোমাসি) ঝুড়ি, ডান হাতে কলা।
কী হলো? জানতে চাইলাম।
নাজির একগাল হেসে বললেন : সভাপতি স্যার পত্র পড়ে অভিভূত। আমাকে খুব আপ্যায়ন করেছেন। আপনার জন্য আম আর কলা পাঠিয়েছেন। আমি স্যার, চৌদ্দ বছর এই অফিসে। সভাপতি স্যার এমন মধুর ব্যবহার আর কারো সঙ্গে করেননি। মন্ত্রীও তাকে ভয় পান। তিনি যাকে বেশি পছন্দ করেন তার জন্য আম ও কলা পাঠান।
: কখন যাব তার বাসায়?
: যেতে হবে না। তিনিই আসবেন। আগামীকাল সকাল নয়টায়। নববর্ষের সূচনাটা আমাদের অফিস পরিদর্শনের মাধ্যমে শুরু করবেন।
অফিসের সবাইকে নতুন পোশাক পরে আসতে বললাম। ঢাকা থেকে একটা দামি তোয়ালে কিনেছিলাম। সেটি অফিসে আনিয়ে নিলাম। উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় থেকে একটি ভালো চেয়ার এনে আমার পাশে রাখলাম। দামি তোয়ালেটা দেওয়ার পর চেয়ারটা রাজকীয় দেখাচ্ছিল। মন্ত্রী-সচিবদের সফরে এমন করা হয়।
আমার অফিসের লোকদের মন খারাপ। একজন লোক, যিনি জোর করে স্যার ডাক আদায় করেন তার আগমন এমন গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়াকে কেউ মেনে নিতে পারছিল না। তাদের হাবভাব দেখে বুঝতে পারছিলাম। তারা আমাকে মাজাহীন তেলবাজ অফিসার ধরে নিয়ে কপাল চাপড়াচ্ছিলেন।
সন্ধ্যায় নাজিরকে বাজারে পাঠিয়ে গ্লাস, কাপ-পিরিচ, নাস্তা আনিয়ে নিলাম। স্পেশাল মিষ্টির স্পেশাল অর্ডার দিলাম। সব ঠিকঠাক, রীতিমতো রাজকীয়।
পরদিন যথাসময়ে সভাপতি সাহেব দলবল নিয়ে হাজির। তার আগমন সংবাদ পেয়ে আমি পড়িমড়ি করে বারান্দায় ছুটে এসে বললাম : স্যার, হ্যাপি, নিউ ইয়ার। স্যার, আপনার জন্য অপেক্ষা করছিলাম। পথে কোনো অসুবিধা হয়নি তো?
সভাপতি সাহেব বললেন : আপনি খুব ভালো অফিসার।
: স্যার, আপনার মন্তব্য হ্যাপি নিউ ইয়ারের প্রথম দিনে আমার বিরল সম্মান।
পিয়ন বাসেত ফুলের তোড়া নিয়ে দাঁড়িয়ে। পিয়ন মনীন্দ্রের হাতে গামছা। সভাপতি সাহেব রুমে ঢুকে হাসিতে উদ্বেল। নতুন চেয়ার, নতুন তোয়ালে, সবার গায়ে নতুন পোশাক। তার বুকটা গর্বে তিন হাত। এমন আপ্যায়ন আর কোনো অফিসে পাননি।
সভাপতি সাহেব চেয়ারে বসার আগে আমাকে বসতে অনুরোধ জানালেন।
আমি বললাম : স্যার, আগে আপনি বসুন। স্যার, আপনি আমার মুরুব্বি। উপজেলার একচ্ছত্র নেতা। অধিকন্তু আমার সম্মানিত মেহমান।
সভাপতি সাহেব চেয়ারে বসার পর আমি ডাক দিলাম পিয়নকে : বাসেত স্যার, ওহ্ বাসেত স্যার, আপনি কোথায়? ঝাড়ুদার স্যারকে বলুন, বারান্দাটা আবার ঝাড় দিতে।
ফুলের তোড়া নিয়ে পিয়ন বাসেত দৌড়ে এলেন। তোড়াটা নিয়ে সভাপতি সাহেবের দিকে এগিয়ে দিলাম। চেয়ারে বসার সময় সভাপতির চোখেমুখে যে উৎফুল্লতা ছিল, পিয়ন-ঝাড়ুদারকে স্যার ডাকার পর দেখলাম তা অনেকটা মিইয়ে গেছে।
সভাপতি সাহেবের সঙ্গে আগত অতিথিদের বসার অনুরোধ জানিয়ে ডাক দিলাম : মনীন্দ্র স্যার, ও মনীন্দ্র স্যার, আপনি কোথায়? অফিসের সব স্যারকে আসতে বলুন।
প্রথমে এল ক্লিনার গোপাল। তাকে বললাম : গোপাল স্যার, আপনি সবসময় মেঝের দিকে খেয়াল রাখবেন। একটা বালিও যেন না পড়ে।
ক্লিনারকে স্যার ডাকতে শুনে সভাপতি সাহেব আরও হতভম্ব।
অফিসের সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন ; স্যার, হ্যাপি নিউ ইয়ার।
পরিচয়পর্ব শেষ হবার পর সভাপতি সাহেবকে কিছু বলার অনুরোধ করি। তিনি বিষণ্ণ মুখে বললেন : শরীরটা ভালো লাগছে না। জ্বর আসছে মনে হয়। আজ কিছু বলব না। আরেক দিন।
তার সঙ্গীদের দিকে তাকিয়ে বললাম : স্যার, আপনারা কিছু বলবেন?
এবার উঠে দাঁড়ালেন সভাপতি। ঘামছেন তিনি। কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন : এসি ল্যান্ড সাহেব আমি গেলাম।
আমি বললাম : মিষ্টি ছিল স্যার।
: আমি মিষ্টি খাই না। ডায়বেটিস আসি আসি করছে।
: আপনার জন্য ছোট্ট একটা উপহার ছিল স্যার।
নাজিরের হাত থেকে উপহারটা নিতে নিতে বললেন : আমি গেলাম।
: স্যার, হ্যাপি নিউ ইয়ার। আবার কখন আসবেন স্যার?
কোনো উত্তর পাওয়া গেল না। বড়ো বড়ো চোখে বিস্ময় টেনে আমার দিকে তাকিয়ে গাড়িতে উঠে গেলেন। আমি অফিসে ঢুকলাম।
আধঘণ্টা পর জেলাপ্রশাসক রিং করলেন : তুমি কী করেছ?
: আপনার কথামত সভাপতি সাহেবকে স্যার ডেকেছি।
: তুমি নাকি পাগল?
: কী করলাম আমি?
: ক্লিনার, পিয়ন, নাজির, সহকারী, ড্রাইভার সবাইকে না কি স্যার ডাকা শুরু করেছ?
: তাদের তো স্যার ডাকতে নিষেধ করেননি।
: সভাপতি তোমাকে কী বলেছেন জানো?
: কী বলেছেন?
: কী অফিসার পাঠালেন, ক্লিনার থেকে পিয়ন পর্যন্ত সবাইকে স্যার ডাকে।
: স্যার ডাকলে ক্ষতি কী?
: ক্ষতি নেই।
: সভাপতি কী রুষ্ট হয়েছেন?
: না, তিনি বলেছেন তোমার, তাকে আর স্যার ডাকতে হবে না।
আমি বললাম : কেন স্যার?
জেলাপ্রশাসক বললেন : অত কথা বলতে পারব না। স্যার, ভেরি ভেরি হ্যাপি নিউ ইয়ার। ভালো থেক।
সূত্র: ভালোবাসা শুধুই ভালোবাসা (গল্প সংগ্রহ)

 

error: Content is protected !!