হ্রস্বস্বর আর দীর্ঘস্বর: উচ্চারণগত দীর্ঘস্বর ও তার অস্তিত্ব

এবি ছিদ্দিক
এই পোস্টের সংযোগ: https://draminbd.com/হ্রস্বস্বর-আর-দীর্ঘস্বর/
 
যেসকল ধ্বনির উচ্চারণে ফুসফুসতাড়িত বাতাস বাগ্‌যন্ত্রের কোথাও বাধা প্রাপ্ত হয় না; অর্থাৎ, যেসকল ধ্বনি আমরা যতক্ষণ ইচ্ছে টেনে পড়তে পারি, সেসকল ধ্বনিকে স্বরধ্বনি বলে। যেমন: অ, আ, ই, এ, ও প্রভৃতি। আমরা চাইলে [অ], [আ], [ই] প্রভৃতি ধ্বনি যতক্ষণ ইচ্ছে টেনে ধরে /অঅঅঅঅঅঅ…/, /আআআআ…/, /ইইইইই…/ প্রভৃতিরূপে পড়তে পারি। তাই, এগুলো স্বরধ্বনি।
 
ধ্বনিবিজ্ঞানের আলোচনায় দুইটি মাপকাঠির ভিত্তিতে এই স্বরধ্বনিসমূহের শ্রেণিবিভাগ বা বর্গীকরণ করা হয়:— ১. স্বরধ্বনি উচ্চারণের কাল-পরিমাপের ওপর; এবং ২. স্বরধ্বনি উচ্চারণের সময় শ্বাসবায়ুর যাতায়াতের পথের আকৃতির ওপর। লেখার পরিধির কথা বিবেচনা করে আমার পরবর্তী আলোচনা কেবল এক নম্বর মানদণ্ডের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে।
 
উল্লেখ-করা প্রকরণের প্রথমটির ওপর ভিত্তি করে যে শ্রেণিবিভাগ করা হয়, তাকে পরিমাপগত শ্রেণিবিভাগ বলা হয়। উচ্চারণের সময়কালের (যতক্ষণ সময় লাগে, তার পরিধি বা স্থায়িত্ব হচ্ছে ‘সময়কাল’) ওপর ভিত্তি করেই এই শ্রেণিবিভাগ করা হয় বলে এটির এরূপ নামকরণ করা হয়েছে। উচ্চারণ পরিমাপের একক ‘মাত্রা’ হওয়ায় একে মাত্রাগত শ্রেণিবিভাগও বলা হয়। এই মানদণ্ডের ভিত্তিতে কোনো ভাষার স্বরধ্বনিকে হ্রস্ব আর দীর্ঘ— এই দুইটি শ্রেণিতে ভাগ করা হয়। সাধারণত একই স্বরধ্বনির মধ্যে যেটি উচ্চারণ করতে কম সময় লাগে, সেটিকে হ্রস্ব, এবং যেটি উচ্চারণ করতে বেশি সময় লাগে, সেটিকে দীর্ঘ স্বরধ্বনি বলা হয়। ইংরেজি, সংস্কৃত, হিন্দি, উর্দু, জার্মান প্রভৃতি ভাষায় স্বরধ্বনির এরূপ দ্বৈত রূপ একেবারেই স্বাভাবিক। যেমন: ইংরেজি ‘pull’ শব্দটি উচ্চারণ করার সময় ‘u’ বর্ণটির জন্যে যে উচ্চারণ (/pʊl/) পাওয়া যায়, সেটি হচ্ছে উ-স্বরের হ্রস্ব রূপ (short u); এবং ‘pool’ শব্দটি উচ্চারণের (/puːl/) সময় ‘oo’ বর্ণদ্বয়ের জন্যে যে উচ্চারণ, পাওয়া যায়, সেটি হচ্ছে উ-স্বরের দীর্ঘ রূপ (long u)। একইভাবে, ‘ship’ শব্দের উচ্চারণে ই-স্বরের হ্রস্ব রূপ [ɪ] এবং ‘sheep’ শব্দের উচ্চারণে দীর্ঘ রূপ [iː] পাওয়া যায়।
সংস্কৃত ভাষায়ও উচ্চারণের এই তারতম্য বিরাজমান। সংস্কৃত ভাষায় আ, ঈ, ঊ, এ আর ও স্বর যথাক্রমে /aː/, /iː/, /uː/, /eː/ আর /oː/ রূপে দীর্ঘস্বর হিসেবে উচ্চারিত হয়।
 
এসব ভাষায় কোনো শব্দের মধ্যে একই স্বরধ্বনির এরূপ হ্রস্ব আর দীর্ঘ উচ্চারণের কারণে শব্দের অর্থ বদলে যায়। তাই, এসব ভাষায় স্বরধ্বনির কাল-পরিমাপ গত শ্রেণিবিভাগ খুবই দরকারি। সংস্কৃত ভাষায় যখন কবিতা বা পদ্যের মাত্রা হিসেব করা হয়, তখন এই হ্রস্ব ও দীর্ঘ স্বরের কারণে মাত্রার সংখ্যাও ভিন্ন হয়ে যায়। যেমন: দি = এক মাত্রা, কিন্তু দী = দুই মাত্রা।
 
বাংলা ভাষার সঙ্গে এই সংস্কৃত ভাষার সম্পর্ক অত্যন্ত গভীর। বাংলা বর্ণমালার সিংহভাগ বর্ণ সংস্কৃত ভাষা থেকেই নেওয়া হয়েছে। ফলে সংস্কৃতের ঈ, ঊ, ঋ প্রভৃতি বর্ণ বাংলা বর্ণমালায়ও ঢুকে পড়েছে। সংস্কৃতে এসব বর্ণের জন্যে স্বতন্ত্র ধ্বনি বা উচ্চারণ থাকলেও বাংলায় ধ্বনিগত দিক থেকে এসব বর্ণের কোনো স্বকীয়তা নেই। প্রকৃত অর্থে বাংলা ভাষায় হ্রস্বস্বর বা দীর্ঘস্বর বলে কোনো শ্রেণিবিভাগ নেই। বাংলা ধ্বনিতত্ত্বে ‘ই’ মানে যা, ‘ঈ’ মানেও তা; ‘উ’ যে ধ্বনিতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে, ‘ঊ’-ও একই বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।
 
বাংলা ভাষায় যে সাতটি মৌলিক স্বরধ্বনি পাওয়া যায়, সেগুলোর প্রত্যেকটির অবস্থান ‘Cardinal Vowels’-এর (স্বরধ্বনির গুণগত বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণের মাপকাঠি) মাঝামাঝি স্থানে। অর্থাৎ, বাংলা ভাষার প্রতিটি স্বরধ্বনি উচ্চারণের দিক থেকে মধ্যম। শব্দের মধ্যে ব্যবহারের ফলে কোনো বাঙালির উচ্চারণের সময় আবেগ বা বিস্ময়ের কারণে কোনো স্বরধ্বনি দীর্ঘ বা দীর্ঘতর হিসেবে উচ্চারিত হতে পারে। যেমন: অতিরিক্ত বড়ো বোঝাতে ‘বিশাল’ শব্দটি যখন কেউ /বিশাːল্/ (কিংবা /বিশাআআআআআল্/) বলে টেনে উচ্চারণ করে, তখন /আ/ স্বরটি দীর্ঘ স্বরে পরিণত হয়। কিন্তু এতে শব্দটির মূল অর্থের কোনো পরিবর্তন হয় না। একইভাবে, যখন কেউ একটু সামনে দিয়ে প্রিয় আপুকে হেঁটে যেতে দেখে ডাক দেয়, তখন তার মুখ দিয়ে /আপু/ উচ্চারিত না হয় /আপুː/ (কিংবা /আপুউউউউউ…/) উচ্চারিত হওয়াটা মোটেও অস্বাভাবিক নয়। অথচ এখানে ‘উ’ হচ্ছে হ্রস্বস্বর নির্দেশক বর্ণ (কার-চিহ্ন)।
 
তাছাড়া ‘উ’-এর এরূপ দীর্ঘ উচ্চারণেও ‘আপু’ শব্দের অর্থের কোনো পরিবর্তন হয় না। বাংলা একাক্ষর শব্দে আদ্য স্বরধ্বনির উচ্চারণও সামান্য দীর্ঘ হয়, তা সেটি রূপগত দিক থেকে হ্রস্ব কিংবা দীর্ঘের যেটিই হোক না কেন। দিন, দীন, রুশ, রূপ প্রভৃতি একাক্ষর শব্দের বানানে আদ্যবর্ণ সমূহের সঙ্গে যুক্ত স্বরধ্বনিসমূহের মধ্যে বর্ণগত (কার-গত) দিক থেকে ভিন্নতা থাকলেও উচ্চারণগত দিক থেকে কোনো ভিন্নতা নেই; অর্থাৎ, এসব শব্দের প্রত্যেকটির উচ্চারণে আদ্যস্বরের উচ্চারণ সামান্য দীর্ঘ হয়। কিন্তু এসব শব্দের উচ্চারণে স্বরধ্বনিসমূহ স্বাভাবিকভাবে উচ্চারণ করলেও অর্থের কোনো হেরফের হয় না। তাই, বাংলা একাডেমি-প্রকাশিত সর্বশেষ অভিধানের সংস্করণে এসব শব্দের উচ্চারণ দীর্ঘ হিসেবে উল্লেখ না-করে স্বাভাবিক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
 
এটুকু পড়ার পর একটি প্রশ্নের উদ্ভব ঘটা একেবারেই স্বাভাবিক, এবং সেটি হচ্ছে— “তাহলে বাংলা বর্ণমালায় আ, ঈ, ঊ, ঋ প্রভৃতি দীর্ঘ স্বর নির্দেশক বর্ণ রাখা হয়েছে কেন?”
 
এই প্রশ্নের উত্তর বাংলা ব্যাকরণের রূপতত্ত্বে দিকে তাকালে সহজেই অনুধাবন করা যায়। বাংলা ভাষার বৈয়াকরণগণ এখনো নিজেদের ভাষার জন্যে কোনো পূর্ণাঙ্গ তো দূর, কোনোরকমে চলার মতো বিধিবিধানও তৈরি করতে পারেননি। তাই, বাংলা ভাষাকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে সংস্কৃতের ব্যাকরণ দিয়ে কাজ চালাতে হয়। সংস্কৃতের নিয়ম দিয়েই বাংলা ভাষার ধাতু, প্রত্যয়, সন্ধি, সমাস প্রভৃতির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের পাঠ চালিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এসব দীর্ঘস্বর নির্দেশক বা ধ্বনিতাত্ত্বিক দিক থেকে অপ্রয়োজনীয় বর্ণ পরিহার করতে হলে ’কৃ’ থেকে ‘করণ’, ‘ধৃ’ থেকে ‘ধরন’, ‘বিশ্ব’ থেকে ‘বৈশ্বিক’, ‘সুন্দর’ থেকে ‘সৌন্দর্য’, শীত আর ঋত মিলে ‘শীতার্ত’, শুভ আর ইচ্ছে মিলে ‘শুভেচ্ছা’, ইতি আর আদি মিলে ইত্যাদি বানানোর পথ আগে তৈরি করে রাখতে হবে।
 
তাছাড়া বাংলা ভাষায় ব্যবহৃত বেশিরভাগ শব্দের উৎস সংস্কৃত ভাষা। আর, এসকল দীর্ঘস্বর নির্দেশক বর্ণ বা ধ্বনিতাত্ত্বিক গুরুত্বহীন বর্ণ নিজেদের বর্ণমালায় না-থাকলে সংস্কৃত ভাষা থেকে আগত ঐসব শব্দের ব্যুৎপত্তি নির্ণয় বা নির্দেশ করাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে। তাই, এসবের জন্যেও বিকল্প ব্যবস্থা করে রাখতে হবে। এত্তসব ঝামেলা সামাল দেওয়ার মতো কাজ বাংলা বৈয়াকরণগণ এখনও সম্পন্ন করতে পারেননি বলে বাংলা ভাষায় এই দীর্ঘ স্বরধ্বনি নির্দেশক বর্ণ এবং কতিপয় ধ্বনিতাত্ত্বিক গুরুত্বহীন বর্ণও (ঈ, ঊ, ঋ, ঐ, ঔ, ং, ঃ, ঞ, ণ, ৎ, য, ষ) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
[ জ্ঞাতব্য: আন্তর্জাতিক ধ্বনিমূলক বর্ণমালায় কোনো স্বরের দীর্ঘ উচ্চারণ বোঝাতে [ː] চিহ্নটি ব্যবহার করা হয়। ]
 
নিচের সংযোগে শুবাচে প্রকাশিত এবি ছিদ্দিক (Ab Chhiddiq)-এর প্রায় সব লেখা পাবেন।
 
 
 
error: Content is protected !!