বঙ্কিম-রবীন্দ্র সম্পর্ক

অধ্যাপক ড. ক্ষুদিরাম দাস

বঙ্কিম-রবীন্দ্র সম্পর্ক

সংযোগ: https://draminbd.com/বঙ্কিম-রবীন্দ্র-সম্পর্ক/
(প্রবন্ধে পদের বানান লেখক যেমন লিখেছেন তেমন রেখে দেওয়া হয়েছে।)
মহাকাশে দুই সমুজ্জ্বল গ্রহ-জ্যোতিষ্কের আপাত-ঘনিষ্ঠতা দর্শন কদাচিতের ব্যাপার। সাহিত্যাকাশেও তাই। মহাভারতকার রামায়ণকার এবং কালিদাসের মধ্যে শত শত বৎসরের ব্যবধান। কোথায় মহাকবি শেকস্‌পীয়ার আর কোথায় গোয়েটে। বাঙলার সৌভাগ্যক্রমে বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথ কিছুকালের জন্য নিকটবর্তী হয়েছিলেন। এই কারণে বিষয়টি পরবর্তী সাহিত্যরসিকদের কাছে লক্ষণীয় ব্যাপার হয়ে রয়েছে। তবে তা উভয়ের এমন বয়সে, যখন একজন খুবই ভাস্বর অন্যজন তখনও ক্ষীণ দীপ্তি। তা হোক, তবু এই কাছাকাছি হওয়া ক্ষীণতর জ্যোতিষ্কের কাছে অর্থহীন ও নিষ্ফল তো হয়ই নাই, বরং তেজস্ক্রিয়তাবর্ধক হয়েছে। কিন্তু কেবল উপন্যাস গল্প নির্মাণের ক্ষেত্রে নয়, রোম্যাণ্টিক কাব্যস্বপ্ন সৃজনের ক্ষেত্রেই এমনটি বিশেষভাবে ঘটেছে। এ হ’ল নিগূঢ় আভ্যন্তরীণ সম্পর্ক। মানস-প্রকৃতির গঠনের সৌসাদৃশ্য। তার আগে দেখা যাক বহিরঙ্গ ঘটনাচক্রে প্রৌঢ় এবং তরুণ কতটা কাছাকাছি হয়েছিলেন।
কবিরই লেখা ‘জীবন স্মৃতি’ গ্রন্থে দেখা যায়, কবির বয়স যখন পনেরো ষোলো তখন তিনি বঙ্কিমচন্দ্রকে প্রথম দেখেন। দেখেন রাজা সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুরের ভবনে, এমারেল্‌ড্‌ বাওয়ারে, এখন যার সংলগ্ন রবীন্দ্র-ভারতী বিশ্ববিদ্যালয় সেখানে, হিন্দু কলেজের প্রাক্‌তন ও নবীন ছাত্রদের রি-ইউনিয়ন সভায়, ১৮৭৬ খ্রীস্টাব্দে। এই প্রথম দর্শনে বঙ্কিমের উজ্জ্বল গম্ভীর অথচ ওষ্ঠাধরে কৌতুকের রেখা যুক্ত মুখশ্রী, খড়গের মত নাসিকা ও ভাষায় সুরুচির দিকে আগ্রহের বিষয় কবি উল্লেখ করেছেন। এর পরের বৎসর ‘হিন্দুমেলা’র বার্ষিক সভায় কবি নবীন সেনের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। যাইহোক, এর পর ইং ১৮৮১,’৮২, ‘৮৩ সালে বঙ্কিম যখন হাওড়া এবং কলকাতায় বউবাজার অঞ্চলে বাসাবদল করে থাকতেন তখন অগ্রজ দ্বিজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সহচর হয়ে রবীন্দ্রনাথও বঙ্কিমের সঙ্গে মাঝে মাঝে দেখা করতে যেতেন এ খবর পাওয়া যায়। ১৮৮২ খ্রীস্টাব্দে ৩ জানুয়ারি ঠাকুরপরিবারের জোড়াসাঁকো ভবনে তরুণ কবির লেখা ‘বাল্মীকি প্রতিভা’ গীতিনাট্যের অভিনয় উপলক্ষ্যে কবি নিজে গিয়ে বঙ্কিমচন্দ্রকে আমন্ত্রণ ক’রে নিয়ে আসেন। উক্ত বাল্মীকি-প্রতিভা অভিনয় উপলক্ষ্যে আরও যাঁরা আমন্ত্রিত হয়ে আসেন তাঁদের মধ্যে ছিলেন স্যার গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, হরপ্রসাদ শাস্ত্রী, রাজকৃষ্ণ রায়, রেভারেণ্ড কৃষ্ণমোহন বন্দ্যোপাধ্যায়, তারকনাথ পালিত, বিহারীলাল গুপ্ত, সৌরীন্দ্রমোহন ঠাকুর, মহেশচন্দ্র ন্যায়রত্ন। অবশ্য বঙ্কিম চন্দ্রের সঙ্গে কবির মানসিক পরিচয় ঘটে এসবের বহু আগে, কবির দশ বারো বৎসর বয়স থেকেই, দুর্গেশনন্দীনী, কপালকুণ্ডলা, মৃণালিনী ও বঙ্গদর্শনে প্রকাশিত বিষবৃক্ষ পাঠের মধ্য দিয়ে। বাল্মীকি-প্রতিভা অভিনয়ের ঘটনার পর বঙ্কিম-রবীন্দ্র সাক্ষাৎকারের একটি উল্লেখ্য বিবরণ পাই জীবনস্মৃতিতেই। রমেশচন্দ্র দত্তের কন্যার বিবাহ উপলক্ষ্যে সমকালীন উল্লেখ্য ব্যক্তিরা আমন্ত্রিত হয়েছিলেন। রবীন্দ্রনাথ এবং বঙ্কিমও এসেছিলেন। বঙ্কিম রমেশচন্দ্রের গৃহে প্রবেশ করতেই রমেশচন্দ্র তাঁকে ফুলের মালা পরিয়ে অভিনন্দিত করেন। পাশেই রবীন্দ্রনাথ দাঁড়িয়েছিলেন। বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথকে দেখেই মন্তব্য করেন- এ মালা এখন ইঁহার প্রাপ্য। রমেশ, তুমি ‘সন্ধ্যাসংগীত’ পড়েছ? রমেশচন্দ্র ‘না’ বলতেই বঙ্কিম সন্ধ্যাসংগীতের একটি কবিতার উল্লেখ করে কবির অজস্র প্রশংসা করেন। জীবন স্মৃতিতে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন- তখন তিনি সন্ধ্যাসংগীতের কোনো কবিতা সম্পর্কে যে মত ব্যক্ত করিলেন, তাহাতে আমি পুরস্কৃত হইয়াছিলাম। ১৮৮২ খ্রীস্টাব্দে জ্যোতিরিন্দ্র-রবীন্দ্র মিলে ‘বিদ্বজ্জন-সমাগমের’ পরিবর্তে ‘সারস্বত সমাজ’ নামে একটি সুধী-মিলন-কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সংকল্প করেন। রাজেন্দ্রলাল মিত্র সভাপতি ও বঙ্কিমচন্দ্র এর সহ-সভাপতি হ’তে রাজী হন। ঐ খ্রীস্টাব্দেই ভারতী পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ‘মেঘনাদবধ’ বিষয়ে দ্বিতীয় কিস্তির আলোচনা বের হয়। তাতে তিনি ‘মেঘনাদবধ’ মহাকাব্য কিনা ও ট্র্যাজেডি কিনা বিচার করেছিলেন। সেই সূত্রে বিষবৃক্ষ যে ট্র্যাজেডি এই অভিমত প্রকাশ করে লিখেছিলেন-“নগেন্দ্র ও সূর্যমুখীর মিলনে বুকের মধ্যে কুন্দনন্দিনীর মৃত্যু চিরকাল বাঁচিয়ে রহিল, ইহাই ট্র্যাজেডি”। কবির প্রথম উপন্যাস লেখার প্রয়াস ‘বউঠাকুরানীর হাট’ প্রকাশিত হ’লে (১৮৮৩) বঙ্কিমচন্দ্র স্বতঃপ্রণোদিত হ’য়ে রবীন্দ্রনাথকে ইংরেজীতে লেখা চিঠিতে তাঁর মন্তব্য জানান। এ বিষয়ে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন-“বইটি যদিও কাচাঁ বয়সের প্রথম লেখা তবু এর মধ্যে ক্ষমতার প্রভাব দেখা দিয়েছে” এমন মন্তব্য করেন। এ বইকে তিনি নিন্দা করেন নি। ছেলেমানুষির ভিতর থেকে এমন একটা কিছু তিনি দেখেছিলেন যাতে অপরিচিত বালককে হঠাৎ একটা চিঠি লিখতে তাঁকে প্রবৃত্ত করেছে।” যেমন এই প্রসঙ্গে তেমনি অন্যত্রও বঙ্কিমচন্দ্রের ব্যক্তিগত মহত্বের দিক সম্বন্ধে রবীন্দ্রনাথ বারংবার তাঁর অনুভব জানিয়েছেন।
পরের বৎসর অর্থাৎ ১৮৮৪ খ্রীস্টাব্দে আশ্বিন মাসে রবীন্দ্রনাথ আদি ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক নিযুক্ত হন। ঐ সালেই শ্রাবণ মাসে অক্ষয়চন্দ্র সরকারের ‘নব জীবন’ পত্রিকা এবং তার পক্ষকালের মধ্যে বঙ্কিম পরিচালিত ও তাঁর জামাতা রাখালচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘প্রচার’ পত্রিকা প্রকাশিত হয়। এই দুই পত্রিকা আশ্রয় ক’রে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর ধর্মতত্ব বা অনুশীলন ধর্ম বিষয়ক প্রবন্ধ এবং সেইসঙ্গে ভগবদ্‌গীতার ব্যাখ্যা ও ‘কৃষ্ণচরিত্র’ বিষয়ে লিখতে থাকেন। তিনি যুক্তিবিজ্ঞানমূলক নব্য হিন্দুধর্মের পক্ষপাতী ছিলেন এবং সেই হিসাবে ব্রাহ্মধর্মের সঙ্গে তাঁর অনেক বিষয়েই মিল ছিল। তিনি নিজমতে অটল থেকেও ব্রাহ্মধর্মমতের সপক্ষে শ্রদ্ধা পোষণ করতেন। তবে প্রতীক উপাসনার সপক্ষতা এবং কৃষ্ণ-ভগবান প্রভৃতি দু’একটা বিষয়ে ব্রাহ্মদের সঙ্গে তাঁর মতৈক্য ছিল না। এই সামান্য অনৈক্য থেকে আদি ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের সঙ্গে সাময়িকভাবে তাঁর একটু ভুল বোঝাবুঝি সুতরাং পারস্পরিক কটাক্ষপাতের সৃষ্টি হয়। রাজনারায়ণ বসু প্রমুখ ব্রাহ্মসমাজের নেতারাও তাঁকে কোঁত্‌ -প্রভাবিত নিরীশ্বরবাদী আখ্যা দেন। সে সব ১৮৮৪ খ্রীস্টাব্দের কথা। ‘নবজীবন’ ও ‘প্রচার’ পত্রিকায় লেখা বঙ্কিমের ‘ধর্মজিজ্ঞাসা’ ও ‘হিন্দুধর্মে’ এর বিপক্ষে ‘তত্ববোধিনী’তে নূতন ধর্মমত নামে সমালোচনা প্রকাশিত হয়। ‘সঞ্জীবনী’ এবং গোঁড়া হিন্দু পক্ষপাতী ‘বঙ্গবাসী’ও কথা কাটাকাটিতে যোগ দেয়। আশ্বিন মাসে আদি ব্রাহ্মসমাজের সম্পাদক হওয়ার কিছু পরেই তরুণ রবীন্দ্রনাথ অতিমাত্রায় কর্তব্যসচেতন হ’য়ে বঙ্কিমের ‘হিন্দুধর্ম’ প্রবন্ধের বিরুদ্ধ সমালোচনা লেখেন। বঙ্কিম তাঁর প্রবন্ধের একস্থানে এই উপলব্ধি প্রকাশ করেছিলেন যে, অধিকতর মানবহিত সম্পাদনের উদ্দেশ্যে সাময়িকভাবে মিথ্যাচরণ দোষের নয়। এর উপর রবীন্দ্রনাথ কটাক্ষ্য সহকারে লিখেছিলেন মিথ্যা কখনোই সত্য হয় না, বঙ্কিমবাবু বললেও নয়, স্বয়ং শ্রীকৃষ্ণ বললেও নয়। অগ্রহায়ণ মাসের ‘ভারতী’ পত্রিকায় একটি পুরাতন কথা’ নামে রবীন্দ্রনাথের এই সমালোচনা প্রকাশিত হয়। বঙ্কিম এর জবাবে লেখেন “আদি ব্রাহ্মসমাজ ও নব্য হিন্দু সম্প্রদায়” (প্রচার, অগ্রহায়ণ)। এতে বঙ্কিম তরুণ রবীন্দ্রনাথকে কোনো আক্রমণ তো করেনই নাই, বরং এমন কথা লেখেন যে স্নেহভাজন উদীয়মান রবির পিছনে রাহুর ছায়া রয়েছে বলেই এমনটা ঘটছে এবং এমন কথাও লেখেন যে প্রতিভাশালী তরুণ যদি দুএকটি বেশী কথা বলেই থাকেন, তা তাঁর সহ্য করাই কর্তব্য, ইত্যাদি। ‘জীবনস্মৃতিতে’ রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন- ‘বঙ্কিমবাবু সম্পূর্ণ ক্ষমার সহিত এই বিরোধের কাঁটাটুকু উৎপাটন করিয়া ফেলিয়াছিলেন। ’ বঙ্কিম ও রবীন্দ্র দুয়েরই উদারতা ও মহানুভবতা এই সাময়িক কলহের উপলক্ষ্যে ফুটে উঠেছে। আমরা অনুমান করি, এর পর প্রত্যক্ষে উভয়ের মধ্যে পূর্বেকার স্নেহ-শ্রদ্ধা অবিকৃতভাবেই রক্ষিত হয়েছিল।
১৮৯২ খ্রীস্টাব্দের শেষের দিকে ‘সাধনা’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের যুগান্তকারী ‘শিক্ষার হেরফের’ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটিতে ইংরাজির মাধ্যমে শিক্ষণের কৃত্রিমতা ও মাতৃভাষায় শিক্ষণের যৌক্তিকতার বিষয় মনোজ্ঞতার সঙ্গে তুলে ধরা হয়। আলোচনাটি বঙ্কিমচন্দ্র, স্যার গুরুদাস ও আনন্দমোহন বসু প্রমুখের প্রশংসা লাভ করে। প্রবন্ধটি পড়ে বঙ্কিম রবীন্দ্রনাথকে একটি চিঠি লেখেন। ঐ চিঠিটি ‘সাধনা’র চৈত্র সংখ্যায় রবীন্দ্রনাথের মন্তব্য সহ প্রকাশিত হয়। চিঠিতে বঙ্কিমের মন্তব্যে ছিল “ প্রতি ছত্রে আপনার সঙ্গে আমার মতের ঐক্য আছে”। এর পর ১৮৯৩ খ্রীস্টাব্দে শ্রাবণ-ভাদ্র মাসে বঙ্কিমচন্দ্রের সভাপতিত্বে রবীন্দ্রনাথ চৈতন্য লাইব্রেরীর বিশেষ অধিবেশনে তাঁর উল্লেখযোগ্য রাজনৈতিক প্রবন্ধ ‘ইংরেজ ও ভারতবাসী’ পাঠ করেন। পূর্বাহ্নেই তিনি বঙ্কিমচন্দ্রকে সভাপতিত্ব করার জন্য তাঁর বাসগৃহে প্রতাপ চ্যাটার্জি লেন-এ অনুরোধ জানাতে গিয়েছিলেন এবং প্রবন্ধটি তাঁকে পড়ে শুনিয়ে তাঁর মতামত জেনে নিয়ে স্থানবিশেষে গ্রহণ-বর্জনও করে নিয়েছিলেন। প্রবন্ধটি ১৮৯৪ (১৩০১ বঙ্গাব্দ) এর বৈশাখ ‘সাধনায়’ প্রকাশিত হয়। বঙ্কিমচন্দ্রের প্রয়াণের মাত্র কয়েকদিন আগে ১৩০০ চৈত্র সংখ্যার ‘সাধনা’ পত্রিকায় রবীন্দ্রনাথের ‘রাজসিংহ” প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়। সুতরাং বঙ্কিম প্রবন্ধটি দেখে যেতে পারেন নি এমনই মনে হয়। তবে শুনে থাকতে পারেন। প্রবন্ধটি ‘রাজসিংহ’ উপন্যাসের সমালোচনা নয়, হৃদয়মন দিয়ে রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধির প্রকাশ মাত্র। শোনা যায়, ঐ বৎসরেই একদিন নিজসুর সংযোগে ‘বন্দেমাতরম্‌’ গানের প্রারম্ভ অংশ তিনি বঙ্কিমচন্দ্রকে শুনিয়ে এসেছিলেন। পরের বৎসর কলকাতার কংগ্রেস অধিবেশনে উদ্বোধনী সংগীতরূপে তাঁর বন্দেমাতরম্‌ গান সাধারণ্যে পরিবেশিত হয়।
এই হল বঙ্কিমের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের প্রত্যক্ষ যোগাযোগের অধ্যায় ১৮৭৬ খ্রীস্টাব্দ থেকে ১৮৯৪ অর্থাৎ রবীন্দ্রনাথের ১৫-১৬ বৎসর বয়স থেকে চৌত্রিশ বৎসর পর্যন্ত ব্যাপ্ত। মনে হয়, বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর জীবৎকাল মধ্যে রবীন্দ্রনাথের ‘সোনার তরী’র কবিতানিচয়, এমন কি ‘চিত্রা’ কাব্যেরও দু’একটি কবিতা, চিত্রাঙ্গদা ও বিদায়-অভিশাপের মত কাব্যনাট্য এবং ‘কাবুলিওয়ালার’ মত প্রথম শ্রেণীর গল্প প্রভৃতি পড়ে নিয়ে সুমহৎ ভাবী সাহিত্যিক হিসাবে রবীন্দ্র-বিষয়ে দৃঢ় আশা পোষণ করে যেতে পেরেছিলেন।
বঙ্কিমের প্রয়াণের পর রবীন্দ্রনাথ নানান অবকাশে বঙ্কিমের আলোচনা সমালোচনা করেছেন এবং প্রসঙ্গক্রমে স্থানে স্থানে তাঁর বঙ্কিম-ভাবনার পরিচয় দিয়েছেন। এগুলি পথিকৃৎ সাহিত্য স্রষ্টা হিসাবে পূর্বসূরির প্রতি তাঁর সুগভীর শ্রদ্ধাবোধের পরিচয় চিহ্নিত করে। বঙ্কিম-প্রয়াণের অব্যবহিত পরেই রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিম সম্পর্কে তাঁর অপরিসীম শ্রদ্ধাভক্তির নিদর্শন প্রকাশ করেন তাঁর শোকসভা উপলক্ষ্যে ‘বঙ্কিমচন্দ্র’ নামে একটি অতিশয় সুলিখিত প্রবন্ধ পাঠ ক’রে। প্রবন্ধটি চৈতন্য লাইব্রেরীতে পঠিত ও ১৩০১ বঙ্গাব্দের বৈশাখের ‘সাধনা’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। প্রবন্ধটির শেষে রবীন্দ্রনাথ তাঁর নিজ সাহিত্যকৃতি নিয়ে বঙ্কিমের অযোচিত প্রশংসা বিষয়ে সশ্রদ্ধভাবে উল্লেখ করেছেন- “তদপেক্ষা উচ্চতর পুরস্কার এ জীবনে আর প্রত্যাশা করিতে পারিব না”। এই প্রবন্ধের জন্য সুরেশচন্দ্র সমাজপতি সম্পাদিত ‘সাহিত্য’ পত্রিকা , যা রবীন্দ্রকৃতিকে সব সময় ভালো চোখে দেখতে অভ্যস্ত ছিল না, তাও রবীন্দ্রনাথের উচ্ছুসিত প্রশংসা ক’রে জানায়- “ এরূপ প্রবন্ধ ভাষায় গৌরব”। ১৮৯২ খ্রীস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর কৃষ্ণচরিত্র দ্বিতীয়ভাগ লিখে উক্ত গ্রন্থ সমাপ্ত করেন। রবীন্দ্রনাথ কৃষ্ণচরিত্র বিষয়ে আলোচনা করেন ১৮৯৫ খ্রীস্টাব্দে-এর মাঘ-ফাল্গুনে ‘সাধনা’ পত্রিকায়। বঙ্কিমের কোনো কৃতিত্ব নিয়ে এটিই রবীন্দ্রনাথের প্রথম সমালোচনা। লোক প্রচলিত কৃষ্ণচরিত্র বা কৃষ্ণ-গোপী সম্পর্কিত ঐতিহ্য সম্পূর্ণ অস্বীকার ক’রে মহাভারত ধ’রে কৃষ্ণচরিত্রের ঐতিহাসিকতা ও মহত্ব প্রতিপাদনের উদ্দেশ্যে বঙ্কিমের মননশীলতা ও অধ্যাবসায়ের ভূয়সী প্রশংসা ক’রেও রবীন্দ্রনাথ এই মন্তব্য করেন যে, মূল মহাভারতেই কৃষ্ণচরিত্র লৌকিকে-অলৌকিকে এমনভাবে জট-পাকানো অবস্থায় রয়েছে যে তা থেকে আসল শ্রীকৃষ্ণকে আবিষ্কার করা অসাধ্য বললেই চলে। কৃষ্ণচরিত্রের কোন্‌ অংশ গ্রহণ করব এবং কোন্‌ অংশ করব না এরকম বাছাই করার মূলে রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমচন্দ্রের একটি আদর্শ মানসিকতার ক্রিয়া লক্ষ্য করেছেন। অর্থাৎ বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর পূর্বপ্রতিপাদিত অনুশীলনতত্ত্বের অনুকুল শ্রীকৃষ্ণকেই সর্বত্র খুঁজেছেন, এই হল রবীন্দ্রনাথের সমালোচনার কঠোর দিক। নতুবা বাংলা সাহিত্যে তথা ভারতীয় প্রাচীন ইতিহাসের ক্ষেত্রে এটিই প্রথম গবেষণার প্রয়াস বলে রবীন্দ্রনাথ ‘কৃষ্ণচরিত্র’ গ্রন্থকে অভিনন্দিতই করেছেন।
১৯০১ খ্রীস্টাদের গোড়ায় দিকে রবীন্দ্রনাথ ‘চোখের বালি’ উপন্যাস লেখায় হাত দেন। উপন্যাসটি ‘বঙ্গদর্শন’ নবপর্যায়ের বঙ্গাব্দ ১৩০৮ বৈশাখ থেকে আরম্ভ করে ১৩০৯ কার্তিক সংখ্যায় শেষ হয়। উক্ত উপন্যাসের পাঠকেরা নিশ্চয়ই লক্ষ্য করেছেন যে উপন্যাসটির ভূমিকায় এমনকি মূল কলেবরেও রবীন্দ্রনাথ ‘বিষবৃক্ষ’ উপন্যাসের নাম করেছেন ৩-৪ বার। আসলে ‘চোখের বালি’ বিষবৃক্ষের কাঠামো ধ’রেই লেখা। কেবল গুরুতর পার্থক্য ঘটেছে বিধবার মনস্তাত্বিক চরিত্র গঠনে। রবীন্দ্রনির্মিত এই আধুনিকতা বিষবৃক্ষে নেই, সুতরাং মুখ্য চরিত্র নির্মাণে রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমের সোজাসুজি অনুবর্তন না ক’রে বিপরীতভাবে করেছেন।
এর পরেও রবীন্দ্রনাথকে তাঁর বিভিন্ন প্রবন্ধে, ভাষণে, চিঠিপত্রেও বঙ্কিমের সাহিত্যসৃষ্টি বিষয়ে প্রাসঙ্গিকভাবে মন্তব্য করতে দেখা যায়। এগুলি বিশেষভাবে বঙ্কিমের সাহিত্য সংগঠন প্রতিভা, চরিত্র নির্মাণ ও সৌন্দর্যসৃষ্টি বিষয়ক। কোথাও কোথাও কবির বঙ্কিমী পন্থা ত্যাগ করে নিজ উপলব্ধি আস্থার পরিচয়ও চিহ্নিত হয়েছেন। যেমন, ‘কুমারসম্ভব ও শকুন্তলা’ প্রবন্ধে (১৯০১) তিনি বঙ্কিমের ‘শকুন্তলা, মিরান্দা ও দেসদিমনা’ প্রবন্ধে বর্ণিত মিরান্দা চরিত্রের বিশ্লেষণ ও শকুন্তলার সঙ্গে মিরান্দার সাদৃশ্য দেখানোর সমালোচনা ক’রে বুঝিয়ে দিলেন যে দুয়ের মধ্যে বহিরঙ্গে কিছু সাদৃশ্য থাকলেও অন্তরঙ্গে নেই। দেখালেন যে মিরান্দার মত শকুন্তলা নিঃসঙ্গ নন, আর তপোবনের তরুলতা ও মৃগদের সঙ্গে শকুন্তলার যে ঘনিষ্ঠা সম্পর্ক, দ্বীপ প্রকৃতির সঙ্গে মিরান্দার তা গড়ে ওঠেনি। দেখালেন চারিত্রিক সারল্যের দিক দিয়েও শকুন্তলা মিরান্দার বহু উপরে। শকুন্তলার সারল্য তার অন্তরের অটল বিশ্বাস থেকে সমুৎপন্ন, মিরান্দার সরলতা বাইরের পরিবেশগত, মিরান্দার সরলতার অগ্নিপরীক্ষা হয় নাই, ইত্যাদি। “এমন স্থলে তুলনায় সমালোচনা বৃথা” “এই দুই কাব্যকে পাশাপাশি রাখিলে উভয়ের ঐক্য অপেক্ষা বৈসাদৃশ্যই বেশী ফুটিয়া উঠে।”
এর বহু পূর্বেই অবশ্য রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিমের সৃষ্টির একটি অপূর্ণতা বিষয়ে ‘ভারতী’ পত্রিকায় ইঙ্গিত করেন। “ বঙ্কিম যেখানে individual চরিত্র ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করেছেন সেখানে তিনি চমৎকার সফল। কিন্তু যেখানে মানুষের সমষ্টি নিয়ে নাড়াচাড়া করেছেন সেখানে সব তালগোল পাকিয়ে গেছে। আনন্দমঠের সমস্ত আনন্দগুলিই যেন এক রকমের”। এটা ১৮৮০-৮২ মধ্যে সঞ্জীবচন্দ্র–সম্পাদিত বঙ্গদর্শনে বঙ্কিমের আনন্দমঠ বের হবার পর। ১৯০৮ খ্রীস্টাব্দে লেখা ‘পূর্ব ও পশ্চিম’ প্রবন্ধের এক জায়গায় আমাদের অকুণ্ঠচিত্তে ইংরেজি সাহিত্যে বস্তু বরণ ক’রে নেওয়ার প্রসঙ্গ তুলে রবীন্দ্রনাথ এইভাবে বঙ্কিম প্রশস্তি করেছেন- “ বঙ্গদর্শনে যেদিন অকস্মাৎ পূর্ব-পশ্চিমের মিলনযজ্ঞ আহ্বান করিলেন সেইদিন হইতে বঙ্গসাহিত্যে অমরতার আবাহন হইল- বঙ্কিম যাহা রচনা করিয়াছেন কেবল তাহারই জন্য যে তিনি বড়ো তাহা নহে, তিনিই বাঙ্‌লা সাহিত্যে পূর্ব-পশ্চিমের আদান-প্রদানের রাজপথকে প্রতিভাবলে ভালো করিয়া মিলাইয়া দিতে পারিয়াছেন”। ‘সাহিত্য’ পুস্তকের এক জায়গায় দেখা যায় বন্ধু লোকেন্দ্রনাথ পালিতকে লেখা একটি চিঠিতে তিনি লিখছেন “আমার তো মনে হয় বঙ্কিমবাবুর নভেলগুলি ঠিক নভেল যত বড়ো হওয়া উচিত তার আদর্শ”। রবীন্দ্রনাথের ‘সাহিত্যের পথে’ পুস্তকের ‘সাহিত্যরূপ’ প্রবন্ধে রূপসৃষ্টি বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বঙ্কিম-প্রসঙ্গ টেনে বলেছেন- “ গল্পে নোতুন রূপের স্রষ্টা বঙ্কিম। সাহিত্যের একটি রূপ পশ্চিম থেকে সংগ্রহ করে বাঙলায় তার প্রতিষ্ঠা দিলেন। তাই মধুসূদনের মত বঙ্কিমও নবীনের অগ্রদূত। ….. সেকালের পাশ্চাত্য সাহিত্যিক স্কট বা লিটনের কাছ থেকে তিনি যদি ধার নিয়ে থাকেন সেটাতে আশ্চর্যের কথা কিছু নেই। আশ্চর্য এই যে বাঙ্‌লা সাহিত্যের ক্ষেত্রে তা থেকে তিনি ফসল ফলিয়ে তুললেন …. কথাসাহিত্যের নোতুন রূপ প্রবর্তন করলেন”। পশ্চিম থেকে সাহিত্য–সম্পদ আহরণ ক’রে নিজ সাহিত্যে তার রূপান্তরকে একান্ত স্বাভাবিক ক’রে তোলা’র যে বঙ্কিমী শক্তি তাকে কবি পুনঃপুন অভিনন্দন জানিয়েছেন। প্রবাসী বঙ্গসাহিত্য সম্মেলন উপলক্ষে প্রদত্ত একটি ভাষণে বাঙ্‌লা সাহিত্যের ক্রমবিকাশের পরিচয় দিতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ পুনশ্চ বঙ্কিমের ইংরেজি সাহিত্য বরণ ও আমাদের মনে তার আনন্দময় অভিঘাতের বিষয় এইভাবে উল্লেখ করেছেন-“ তখন অন্তঃপুরে বটতলার ফাঁকে ফাঁকে দুর্গেশনন্দিনী, মৃণালিণী, কপালকুণ্ডলা সঞ্চরণ করছে দেখতে পাই- একথা মানতেই হবে বঙ্কিম তাঁর নভেলে আধুনিক রীতিরই রূপ ও রস এনেছিলেন। তাঁর ভাষা পূর্ববর্তী প্রাকৃত বাঙ্‌লা ও সংস্কৃত বাঙ্‌লা থেকে অনেক ভিন্ন। তাঁর রচনার আদর্শ কী বিষয়ে, কী ভাবে, কী ভঙ্গিতে পাশ্চাত্ব্য আদর্শের অনুগত তাতে সন্দেহ নেই”। অথচ সে লেখা ইংরেজি শিক্ষাহীন তরুণীদের হৃদয়ে প্রবেশ করতে বাধা পায়নি।….. “ এই নব্য রচনারীতির ভিতর দিয়ে সেদিনকার বাঙালি মন মানসিক চিরাভ্যাসের অপ্রশস্ত বেষ্টনকে অতিক্রম করতে পারলে…… এমন সময় বঙ্গদর্শন মাসিকপত্র দেখা দিল। তখন থেকে বাঙালির চিত্তে নব্য বাঙ্‌লাসাহিত্যের অধিকার দেখতে দেখতে অবারিত হল সর্বত্র। ….. তরুণীরা সবাই রোম্যান্‌টিক হয়ে উঠছে এটাই তখনকার দিনের ব্যঙ্গরসিকদের প্রহসনের বিষয় হয়ে উঠল। ….. ক্লাসিকের অর্থাৎ চিরাগত রীতির বাইরেই রোম্যান্‌টিকের লীলা। রোম্যান্‌টিকের মুক্ত ক্ষেত্রে হৃদয়ের বিহার।” (বাঙ্‌লা সাহিত্যের ক্রমবিকাশ’ প্রবন্ধ দ্রঃ)। সংগীত বিষয়ে দিলীপকুমার রায়ের সঙ্গে কথাবার্তার মধ্যেও রবীন্দ্রনাথ ইংরেজি সাহিত্য ও বঙ্কিম বিষয়ে একই প্রসঙ্গ তুলেছেন দেখি- “ হাজার প্রমাণ দাও না যে ‘বিজয়বসন্ত’ বাঙলার বিশুদ্ধ কথা সাহিত্য, বঙ্কিমের নভেল বিশুদ্ধ বঙ্গীয় বস্তু নয়। তবু বাঙ্‌লার আবালবৃদ্ধ বনিতা বিজয়বসন্তকে ত্যাগ ক’রে বিষবৃক্ষকে গ্রহণ করার দ্বারা প্রমাণ করেছে যে, ইংরেজি-সাহিত্য বিশারদ বঙ্কিমের নভেল বাঙ্‌লার নিজস্ব জিনিস।” সুতরাং রবীন্দ্রনাথের বক্তব্য এই যে টপ্পাই হোক, খেয়ালই হোক এমন কি আরও পশ্চিম পদ্ধতিই হোক, সংগীতে বাইরে থেকে আসা বহু জিনিস বাঙ্‌লার নিজস্ব সম্পদে পরিণত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথ তাঁর “বঙ্কিমচন্দ্র” প্রবন্ধ এবং অন্যত্রও বঙ্কিমের বাঙ্‌লা গদ্যসৃষ্টির প্রতিভার দিক বারংবার সশ্রদ্ধ চিত্তে স্মরণ করেছেন, তিনিও এবিষয়ে যে বঙ্কিমের দ্বারা প্রভাবিত তার পরিচয় তাঁর স্টাইলে পরিস্ফুট, কিন্তু স্টাইলের অনুবর্তন সর্বসাহিত্যিক সাধারণ বস্তু, কেবল রবীন্দ্রনাথেরই একলার নয়, তাই সেসবের উল্লেখ বর্তমান অবসরে বাহুল্য মাত্র।
শেষ কথা এই যে, বঙ্কিমের নিসর্গ-পরিবেশ রচনায় এবং নরনারী প্রণয় প্রদর্শনে যে রোম্যান্‌টিকতা, যে বন্ধনহীনতা প্রকাশ পেয়েছে, নারী-চরিত্র কল্পনায় অজানা, অপরিচিতার দিকে বঙ্কিম যেভাবে পক্ষপাত সহ জোর দিয়েছেন এবং তাতে বিরহ-প্রাধ্যন্য ও অপ্রাপ্যতার দিক যেভাবে ফুটে উঠেছে, তা থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর রোম্যান্‌টিক কল্পনাভঙ্গির প্রেরণা পেয়েছিলেন এ মন্তব্য স্বচ্ছন্দে করা যায়।

সূত্র: Professor Khudiram Das, শুদ্ধ বানান চর্চা (শুবাচ), বঙ্কিম-রবীন্দ্র সম্পর্ক

All Link : শুবাচে প্রকাশিত গুরুত্বপূর্ণ লেখা

ক্ষুদিরাম দাসের আরও কিছু লেখার সংযোগ:
error: Content is protected !!