আহমদ ছফার বিয়ে না-করার কারণ

প্রমিতা দাশ লাবণী

নুরুন্নবীদের বাড়ি মাটির হলেও চারদিকে আভিজাত্যের ছাপ। মনসুর হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে বললেন, আপনাদের জন্য অপেক্ষা করছিলাম।
সোহেল মুহাম্মদ ফখরুদ-দীন বললেন, মনসুর কিন্তু ভালো লেখক। 
আমি বললাম, ছফার আত্মীয়, লেখক তো হবেই।
কয়েক মিনিটের মধ্যে খাবার এসে গেল। খাওয়া শেষ হতে না হতে ছফার ফুপাতো ভাই রহিম পান নিয়ে এলো। এক খিলি পান মুখে দিয়ে আমি উঠানে চলে এলাম। মনসুর পরিচয় করিয়ে দিলেন নুরুন্নবী সাহেবের সঙ্গে, আমার জ্যাঠা, আহমদ ছফার বাল্যবন্ধু।
নুরুন্নবী সাহেব বললেন, আমি বয়সে আহমদ ছফার চেয়ে আট-দশ বছরের বড়ো। ছোটো বেলায় আহমদ ছফা গ্রামে থাকাকালে প্রতিমাসে আমাদের বাড়িতে আসত।
: আহমদ ছফার কথা মনে পড়ে?
: আহমদ ছফার ফুপাতো ভাইয়ের বাড়িতে বেড়াতে এলে সে আমার সঙ্গে একই বিছানায় থাকত। সারা রাত বাতি জ্বালিয়ে পড়ত আর লেখত। আমরা খুব আন্তরিক ছিলাম। দুজন সারাদিন এখানে-ওখানে ঘুরতাম। আমার মা বলত- তোমার একজন আর একজনের কলিজা।
: শেষবার আহমদ ছফা কখন আপনার বাড়িতে আসেন?
: সম্ভবত আশি-একাশি সালে। তখন জিয়াউর রহমান প্রেসিডেন্ট। 
: আপনি বিয়ে করলেন, আহমদ ছফাকে করাননি যে? 
: বদুর পাড়ার এক মেয়ের সঙ্গে আহমদ ছফার বিয়ে ঠিক হয়েছিল। 
: কোন বছর?
নুরুন্নবী মুখে একটা পান দিয়ে বললেন, আমার বছর মনে নেই। পাকিস্তান আমলে। আহমদ ছফা দাওয়াত দেওয়ার জন্য আমাদের বাড়িতে এল।
: বদুরপাড়ার ওই মেয়ের নাম মনে আছে?
: মনে নেই।
: বিয়ে হয়নি কেন?
: বিয়ে কেন হলো না —
: হ্যাঁ।
: কথাবার্তা সব ঠিকঠাক। সব আনুষ্ঠানিকতাও সম্পন্ন হয়ে গেছে। বিয়ের তারিখও ঠিক। এত কিছু হওয়ার পর মানে, কী একটা গোলমালের জন্য বিয়েটা ভেঙে গেল।
: গোলমাল কোন পক্ষ থেকে হয়েছিল?
: মেয়ের পক্ষ থেকে একটা ঘৃণার কথা বলেছে। মানি বলেছে- আহমদ ছফার বউয়ের দরকার নেই। এমন ঘৃণার কথা বলে বিয়েটা ভেঙে দিল।
: প্রতিবাদ করেননি কেন?
: আহমদ ছফার বাবাকে বারোয়াইরো ধইন্যা বলত। তাদের বাড়ির পূর্বদিকে বরুমিত খাল না? 
: হ্যাঁ।
: খালের পাড়ে একটা বড়ো পুকুর ছিল। পুকুরটা এখন নেই, বালি পড়ে ভরাট হয়ে গেছে। খাল ভরাট করে দিয়েছে। পকুর পাড়ে কথা হচ্ছিল আহমদ ছফার সঙ্গে। আমি বলেছিলাম- এমন ঘৃণার কথা তো ভালো না। সবকিছু হওয়ার পর বিয়ের তারিখ পর্যন্ত ঠিকঠাক। এ অবস্থায় হঠাৎ এমন কাণ্ড, এটা তো ভালো না। ডাক্তার নুরুল ইসলাম আছে, ডাক্তার কালাম আছে- সবাই আমাদের পরিচিত। তাদের দিয়ে আহমদ ছফাকে পরীক্ষা করাব।
: তারপর কী হলো?
: আমদ ছফাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে পরীক্ষা করার কথা বললাম। 
তখন আহমদ ছফা বলল, এসব বাদ দাও। আমার শরীরের অবস্থা আসলে ঠিক না। ঝামেলা করে লাভ নেই।

প্রথম ছবি : ড. আমীনের অর্হণা।

দ্বিতীয় ছবি : প্রবন্ধের লেখিকা প্রমিতা দাশ লাবণী

তৃতীয় ছবি : ড. মোহাম্মদ আমীন।

 

সূত্র :  অর্হণা, ড. মোহাম্মদ অর্হণা

অর্হণা থেকে গৃহীত এই অংশটি মূলত ড. মোহাম্মদ আমীনের লেখা অর্হণা উপন্যাসের ৬৮ অনুচ্ছেদের( ১৪৭-১৪৯ ‍পৃষ্ঠা) কিয়দংশ। বইতে তা চট্টগ্রামের আঞ্চলিক ভাষায় ছিল। অর্হণা বইটির প্রকাশক পুথিনিলয়, বাংলাবাজার, ঢাকা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!