সত্তা সত্ত্ব এবং স্বত্বা

ড. মোহাম্মদ আমীন


১. সত্তা
‘সত্তা’, ‘সত্ত্বা’ এবং ‘স্বত্ব’- এই তিনটি বানান শামীমা প্রায় সময় ভুল করে ফেলে। মাঝে মাঝে শিক্ষকও ভুল করে বসেন। একদিন বাসায় এসে মাকে বলল, শব্দ তিনটির বানান যদি ভালোভাবে শেখাতে না পার, তাহলে মাম, আমি আর স্কুলে যাচ্ছি না। বলে দিলাম কিন্তু।
মেয়ের জেদ মায়ে জানেন। একটু চিন্তা করে শামীমার মা প্রমিতা বললেন, সততা হতে সত্তা। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত এবং অন্তরের বিষয়। তাই প্রাণ, অস্তিত্ব, স্থিতি, বিদ্যমানতা, নিত্যতা, সাধুতা প্রভৃতি অর্থ প্রকাশে সত্তা লিখবে। এখানে ‘ব’ দেবে না।
শামীমা : ‘ব’ দেব না কেন?
প্রমিতা : সততা বানানে ব নেই এবং এর কোথাও যেতে কোনো বাহন লাগে না। তাই ‘সত্তা’ বানানে ব নেই। বুঝেছ?
শামীমা : বুঝেছি।
প্রমিতা : বুঝলে একটা উদাহরণ দাও।
শামীমা : আমার ছোটো ভাই আমার কাছে আমার সত্তার চেয়ে প্রিয়।

২. সত্ত্ব ও সত্ত্বা
শামীমা : ‘সত্ত্ব’ কখন লিখব?
প্রমিতা : ‘সত্ত্ব’ এবং ‘সত্ত্বা’ দুটি সমার্থক। তবে ‘সত্ত্ব’ শব্দটির স্বাধীন ব্যবহার নেই। এটি অন্য শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে বসে। যেমন : আমসত্ত্ব।
শামীমা : ‘সত্ত্বা’ কী?
প্রমিতা : ‘সত্ত্ব’ শব্দের স্ত্রীবাচক পদ। এটিও স্বাধীনভাবে বসে না। যেমন : অন্তঃসত্ত্বা। তোমার ছোটো চাচি ডাক্তারের কাছে কেন গিয়েছেন? 
শামীমা : তিনি অন্তঃসত্ত্বা, তাই।
প্রমিতা : ‘অন্তঃ’ শব্দের অর্থ বলতে পারবে?
শামীমা : ভিতর।
প্রমিতা : ‘অন্ত’ শব্দের অর্থ কী?
শামীমা : শেষ। মাম, চাচিকে ‘অন্তঃসত্ত্বা’ বলা হচ্ছে কেন?
প্রমিতা : কারণ তার ভিতরে আর একটি প্রাণের অস্তিত্ব বা বিদ্যমানতা রয়েছে। 
শামীমা : ‘সত্ত্ব’ বানানে দন্ত্য-স বর্ণে ‘ব’ দেব না কেন?
প্রমিতা : স্ব মানে কী?
শামীমা : নিজ। 
প্রমিতা : ‘সত্ত্ব’ এবং ‘সত্ত্বা’ শব্দটি যেহেতু নিজে একা ব্যবহৃত হয় না, তাই এর নিজস্বতা নেই। এজন্য স-য়ে ব দেবে না।
শামীমা : এখানে ত-য়ে ত দিয়ে তার নিচে আবার ব দেব কেন?
প্রমিতা : বললাম না, এই শব্দটা একা বসে না। তাই যত পারে দলবল নিয়ে চলে।

৩. স্বত্বা
শামীমা : ঝামেল হয় কিন্তু ‘স্বত্ব’ নিয়ে।
প্রমিতা : ঝামেলার কথা মনে রাখলে আর ঝামেলা হবে না। 
শামীমা : বুঝিয়ে বলো মাম।
প্রমিতা : ‘স্বত্ব’ শব্দের অর্থ অধিকার, বিষয় সম্পত্তি বা ব্যবসার মালিকানা প্রভৃতি। এগুলো ঝামেলার বিষয়। 
শামীমা : ঠিক বলেছ। তাহলে দুটো ‘ব’ কেন মাম?
প্রমিতা : অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ‘স’ এবং ‘ত’ দুটোকে থানা এবং আদালতে দৌড়াদৌড়ি করতে হয়। এজন্য ‘স্বত্ব’ শব্দের ‘স’ এবং ‘ত’ দুজনেই নিজেদের বহনকারী হিসেবে ‘ব’ বর্ণের উপর বসে থাকে। 
শামীমা : বুঝেছি।
প্রমিতা: বুঝলে ভালো একটা প্রয়োগ দেখাও।
শামীমা : অন্তঃসত্ত্বা লেখিকা ভাবী আমসত্ত্ব খেতে পছন্দ করেন। তিনি তার দুটো বইয়ের স্বত্ব আমাকে দিয়েছেন। সব স্বত্ব চলে গেলেও আমি সত্তা দেব না।


প্রমিতা : তারপরও ভুল রয়ে গেছে। 
শামীমা : কোথায় মাম?
প্রমিতা : খুঁজে নাও। 
শামীমা : দেখছি।
প্রমিতা : এটি কিন্তু ব্যাকরণ নয়, মনে রাখার কৌশল, নিমোনিক মাত্র।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!