ছোটো মুখে বড়ো কথা



আমি লেখালেখি করি।
আগে এটি ছিল নেশা, এখন পেশা। নেশাকে টিকিয়ে রাখতে হলে পেশার প্রয়োজন। তাই নেশার জন্য নেশাকে পেশা করে নিতে বাধ্য হই। এটি প্রেমিকার সঙ্গে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার মতো ব্যাপার। কে না জানে, বিবাহ মানে ভালোবাসার মরণ। এজন্য ছেলেমেয়েরা প্রেমে পড়লে বুদ্ধিমান অভিভাবকগণ বিয়ে পড়িয়ে দেন। আমি লেখালেখিকে নেশা থেকে পেশায় এনে ওই দশায় পতিত হয়েছি।

অন্যান্য লেখকের মতো আমার লেখাতেও মাঝেমধ্যে দুই একটা আকর্ষণীয় অনুচ্ছেদ বা বাক্য কাকতালীয়ভাবে চয়িত হয়ে যায়। ওই লেখার প্রশংসা করতে গিয়ে, অনেকে বলেন, একদম রবীন্দ্রনাথের মতো চিরন্তন অনুভব, ভাষাটা শরৎচন্দ্রের কলমের ন্যায় নির্ঝর, অনুভূতি বিভূতিভূষণের চেয়েও মনোহর, মানিকের মতো প্রাঞ্জল বাক্যে বনফুলের ছোঁয়া পাওয়া যায় – – আহ! সব উপমান মৃত এবং সমাধিতে শায়িত নিশ্চল ঠাকুর-দেবতার সঙ্গে । একজন জীবিত লোকও কি বাংলাদেশে নেই, যার সঙ্গে আমার মতো সাধারণ একজন লেখক উপমেয় হতে পারে?

আছে। থাকলেও করবে না। মৃতদের সঙ্গে যখন উপমেয় হতে হয়, তখন বুঝতে পারি, আমাদের সাহিত্য এখনো ঊনবিংশ শতকেই রয়ে গেছে। এক পা-ও এগোতে পারেনি। নইলে আমার ভক্ত কিংবা চাটুকারেরা বর্তমান কালের জীবিত কাউকে আমার উপমান করত। অবশ্য এক্ষেত্রে আমি কীভাবে বিষয়টি নিতাম, সেটিও একটা বিষয়। বাঙালি জীবিতদের এতই অবহেলা করে যে, জীবিত কাউকে উপমান করতেও কুণ্ঠিত হয়।

যে লেখক জীবদ্দশায় গাড়িভাড়া পর্যন্ত জোগাড় করতে পারত না, মরার পর সেই লেখকের বই বিক্রি করে প্রকাশক নয় তলা ভবন বানায়। এজন্য প্রকাশকেরা জীবদ্দশায় লেখকদের এমন আর্থিক চাপে রাখে, যাতে তারা (লেখকরা) অপুষ্টিতে আক্রান্ত হয়ে তাড়াতাড়ি মারা যেতে পারে। এমন কিছু প্রকাশক আছে, যারা লেখককে নানা নেশায় উদ্বুদ্ধ করে অনুগত বানিয়ে নেয়। লেখক মরলে মৃতপ্রেমী 
বাঙালি পাঠক মড়ার বইয়ে হুমড়ি খেয়ে পড়ে। স্বাজাত্যবোধ বাঙালিদের আছে। মড়ার প্রতি জীবিতদের প্রবল আকর্ষণ এটাই প্রমাণ করে যে, জীবিত বাঙালিরাও মৃত, ঠিক মৃত না-হলেও মৃতপ্রায়। মরতেই যখন হবে, মৃতদের প্রতি আগেভাগে একটু সহানুভূতি দেখিয়ে যায়- এর আর কী!

রবীন্দ্রনাথ ১৯১৩ খ্রিষ্টাব্দে বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। শতবর্ষ পার হয়ে গেছে। আর কেউ বাংলা সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পায়নি। তাহলে কী বাংলা সাহিত্যে শতবর্ষেও কোনো প্রতিভাবান লেখক জন্মায়নি? তা ঠিক বলতে পারব না। তবে এটি বলতে পারি, প্রতিভা বিকাশের জন্য যে ক্ষেত্র থাকা আবশ্যক, মেধার স্ফুরণের জন্য যে ঐকান্তিক লালন প্রয়োজন তা হতে বাঙালি লেখকগণ সম্পূর্ণ বঞ্চিত। বঙ্কিম-মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল, জীবনানন্দ-সুকান্ত, সত্যজিত-সুকুমার, মানিক-বিভূতি প্রমুখ মৃত লেখকদের নিয়ে আমাদের প্রকাশকগণ যে পরিমাণ ব্যস্ত থাকেন, তার সহস্রাংশও যদি জীবিতরা পেতেন, তাহলে প্রতিভা জন্ম নিচ্ছে কি না শতবর্ষে আর কয়জন সাহিত্যে নোবেল পুরস্কার পেত তা জানা যেত। যদিও একমাত্র নোবেল পুরস্কার শ্রেষ্ঠত্বের কোনো মাপকাঠি নয়।

বর্তমানে বিভিন্ন খ্যাতিমান প্রকাশনা সংস্থার আশি ভাগ শ্রমই মৃতদের সাহিত্য নকলে ব্যস্ত। জীবিত লেখকের পাণ্ডুলিপি তাদের আকৃষ্ট করে না। প্রকাশকদের অভিযোগ,আকর্ষণীয় পাণ্ডুলিপি পাওয়া যাচ্ছে না। এই অভিযোগ অমূলক নয়। কিন্তু আকর্ষণীয় পাণ্ডুলিপি পাওয়ার ক্ষেত্র কি তারা প্রস্তুত করছে? শুধু উন্নত বীজ হলে প্রত্যাশিত ফসল আসে না। ওই বীজকে মুকুলিত করার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ যেমন প্রয়োজন তেমনি ফলবান করার জন্য আবশ্যক উর্বর ভূমি ও পর্যাপ্ত পরিচর্যা। আমরা তার কিছুই না-করে কেবল বিপুল ফসলের অপেক্ষায় থাকি। ফলে উন্নত বীজও হয়তো হারিয়ে যাচ্ছে অবহেলায়।

অতীত লেখকদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গবেষণা হয়, পুস্তক প্রকাশিত হয় কিন্তু তা বর্তমান লেখকদের বঞ্চিত করে নয়। তারা জীবিত লেখকদের প্রতিভার বিকাশ-ক্ষেত্রকে পুরোপুরি সচল রেখে মৃতদের বন্দনা করে। আগে জীবিতদের লালন তারপর মৃতদের বন্দনা। ফলে অতীত-বর্তমান উভয়ের মধ্যে সৃষ্টি হয় নিবিড় সেতুবন্ধন। কিন্তু আমরা করি উলটো। আমাদের প্রকাশকেরা জীবতদের সম্পূর্ণ অবহেলা করে কেবল মৃতদের সাহিত্যকর্ম নিয়ে ব্যস্ত থাকে। মৃতদের জন্য জীবতরা প্রকাশকদের কাছে ঘেষতে পারে না। ফলে উভয়ের মধ্যে সৃষ্টি হয় প্রবল দূরত্ব। এর মানে, আমি অতীতের লেখকদের অবহেলার পক্ষে বলছি না; বলছি, যাতে বর্তমান লেখকদের অবহেলা না-করা হয়। জীবতদের, মৃতের চেয়ে বেশি গুরত্ব দেওয়া হয়।

নতুনদের বই প্রকাশের জন্য প্রকাশকদের টাকা দিতে হয়, হাতেপায়ে ধরতে হয়, ধর্ণা দিতে হয় বার বার। যাদের অধিকাংশই নিম্নমধ্যবিত্ত। লেখক হওয়ার প্রত্যাশায় বউয়ের গয়না, মায়ের দুল বিক্রি করে, আবার অনেকে ধারকর্জ করে টাকা দেন। কিন্তু বই বিক্রি হয় না। কীভাবে হবে? মৃতদের বইয়ের নিচে চাপা পড়ে যায় নতুনদের বই। প্রকাশকগণ মনে করেন, বই চলছে না। তারা এর কারণ অনুসন্ধান না-করে মরাদের সাহিত্য নিয়ে ব্যবসায় করেন। অন্যদিকে নিজের পয়সা খরচ করেও বই বিক্রি না হওয়ায় জীবত লেখকরা হতাশাগ্রস্ত হয়ে পড়ে। এভাবে অনেক প্রতিভাবান হারিয়ে যায় অনুর্বর অবহেলার পাথুরে ক্ষেত্রে।

বঙ্কিম-মাইকেল, রবীন্দ্রনাথ-নজরুল, জীবনানন্দ-সুকান্ত, সত্যজিত-সুকুমার, মানিক-বিভূতি প্রমুখ মৃত লেখকদের লালনে এত ব্যস্ত থাকলে জীবতদের লালন কীভাবে হবে? আমাদের উচিত হবে, অতীত সাহিত্যের চেয়ে জীবতদের সাহিত্যকর্মকে অধিক গুরুত্ব দেওয়া। তাহলে প্রতিভার বিকাশক্ষেত্র সমৃদ্ধ হবে, বিস্তৃত হবে। যদিও রাতারাতি ফল আসবে না কিন্তু একদিন এর সুফল অবশ্যই আসবে। বিকশিত হবে বিশ্বের অন্যতম ভাষা বাংলার সাহিত্যকর্ম বিশ্ব নান্দনিকতায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!