জাঙ্গিয়ার আগুন আর সিগারেটের ধুয়া

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলাদেশে ড্রাইভার গাড়ির ডান দিকে বসে। 
ইউরোপে বামদিকে। 
পৃথিবীর আরও অনেক দেশে এমন দেখা যায়। 
বাংলাদেশে মন্ত্রীর সাথে গাড়ির ডানে বসতাম । 
ডানে মানে ড্রাইভারের পেছনে। ড্রাইভারের বামপাশে বডিগার্ড।
মন্ত্রী বসেন বামে, বডিগার্ডের পেছনে। 
এটাই সম্মান, সিনিয়রগণ বাংলাদেশে গাড়ির বামপাশে বসেন। 
গাড়িতে বসার ক্ষেত্রে বাম মানে ‘বাহারি মান’। 
গাড়ির জন্য বাম দিক সম্মানের। অন্যান্য ক্ষেত্রে ডান।
ডানহাত- বামহাত নিয়েও ভেদাভেদ, 
বাম হাতকে ডান হাতের চেয়ে কম মর্যাদাকর মনে করা হয়।
কিন্তু কেন?
অথচ সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করা হয় বাম হাত দিয়ে।
বাথরুমে ধৈাতকরণ কাজটি কিন্তু সবসময় বামহাতই সম্পন্ন করে থাকে।
এজন্য তাকে কৃতিত্ব দেয়া হয় না, বরং অবহেলা করা হয়।
আট ঘণ্টার কনফারেন্স, মানে পুরো দিন।
হোটেল থেকে নেমে যথারীতি সোজা গাড়ির ডানে, 
দরজা খুলে উঠার অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। মন্ত্রী মহোদয় উঠার পর আমি।
মন্ত্রী বামে নেই। 
কোথায়?
তিনি আমার পেছনে। ডানে, কেন? রাস্তায় চোখ দিয়ে বুঝতে পারি।
বুঝতে পারি, এটি বাংলাদেশ নয়। 
লজ্জা পেয়ে বাম দিকে ড্রাইভারের পেছনে চলে যাই। 
বিমান বন্দরেও এমনটি হয়েছে।
বহুদিনের অভ্যাস, ভুল হওয়ায় স্বাভাবিক। 
বাংলাদেশে যেটি এক নম্বর এখানে সেটি দুই। 
জাতিসংঘ ভবনে কনফারেন্স।
অনেক দেশের মন্ত্রী, কয়েকটি দেশের সরকার প্রধানও আছেন।
সাথে অনেক হোমড়া-চোমড়া, 
শীর্ষ সম্মেলন যেমনটি হয়।
সম্মেলন খারাপ না লাগলেও আনুষ্ঠানিকতা অসহ্য মনে হয়। 
আমার মত চঞ্চল মানুষের পক্ষে বেশিক্ষণ চুপচাপ বসে থাকা কষ্টকর। 
তবু থাকতে হয়। এটাই চাকরি, অনিচ্ছাসত্ত্বেও যা করতে হয়। 
কনফারেন্সে ঢুকলে মন আরও চঞ্চল হয়ে উঠে। অনেকটা কারাগার থেকে বন্দিদের বেড়িয়ে আসার তীব্র প্রত্যাশার মত। 
চাকুরির অত্যাবশ্যক প্রশিক্ষণগুলোতে পেছনের সারিতে বসতাম,
যাতে নড়তে পারি, 
বলতে পারি। ছোট ছোট দুষ্টোমি করতে পারি।
সঙ্গীও জুটে যেতো। ঈশ্বর সবার জন্য জোড়া সৃষ্টি করে নাকি পৃথিবী সাজিয়েছেন। 
ঈশ্বর বড় বোকা। খারাপ কাজের জন্য সঙ্গীর অভাব রাখেন নি। অথচ খারাপ কাজ বন্ধ করার জন্য কত আগুনের ভয়, নারী-মদের লোভ। প্রশিক্ষক বক বক করে যেতেন, কী বলতেন এক বিন্দু শুনতাম না। 
এখানে তেমনটি করা যাবে না। সিট নির্ধারিত। তবে ঘুমানো যাবে, কেউ প্রশ্ন করবে না। 
কিন্তু আমার সামনে বাংলাদেশ লেখা প্লেকার্ড দেখে লোকজন কী ভাববে?
যদি ঘুমোয়! 
ভাববে: বাংলাদেশ ঘুমায়। ঘুমোনো যাবে না। 
আমার ডান পাশে এক নাইজেরিয়ান। নাম চিমুকা। দুই মিনিট আলাপ করে বুঝে নেই চলবে।
বাম পাশে ইসরাইলি এক মহিলা। মাহিলা না বলে রমণী বলাই ভাল। 
চুলের ডগা থেকে পায়ের তালু পর্যন্ত জেহোভার আদর। 
সুন্দরের ঐশ্বর্য্য তেল আবিবেরর মত সকল তেল যেন উপচে। 
উহ্ মাই গড, এমন সুন্দর মানুষ হয়!
নাম রাইসা। 
বেশ একাগ্রে কনফারেন্সের প্রতিটা অক্ষর নোট করছেন।
আমার সামনে মন্ত্রী, বাংলাদেশ দলের প্রধান। তার দিকে তাকালাম। অনুগত ছাত্রের মত বক্তার প্রতিটা শব্দ গিলছেন। 
আর লিখছেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ছিলেন, 
হাইকমিশনার ছিলেন,
অ্যাম্বাসেডার ছিলেন, 
সচিব ছিলেন। 
এমপি হয়েছেন, তারপর মন্ত্রী।
পুরো ডিজিটাল ম্যান, কনফারেন্সে চমৎকার বক্তৃতা দিয়েছেন। 
হাত তালিতে পুরো রুম ফেটে যাবার যোগাড়। এত সুন্দর বক্তব্য অন্য কেউ দিতে পারেননি।
গর্বে বুক ফুলে আকাশ।
কনফারেন্স শেষ হতে হতে বিকেল পাঁচটা। 
আমার না হয় বয়স কম।
মন্ত্রী বেচারা ক্লান্ত।
ভেবেছিলাম ফাঁকি দিয়ে আগে বের হয়ে কয়েকটা জায়গা ঘুরে আসব। আবার কখন আসা হয় না হয়।
কনফারেন্সের জন্য নিজের ইচ্ছেটাকে বলি দিতে হল। তবে না এলেও চলত। কিন্তু প্রতিবেদন লেখা কষ্ট হত।
অন্য মন্ত্রণালয় থেকে আরও চারজন এসেছেন। তারা কিছুক্ষণ থেকে বেরিয়ে গেছেন। 
আমি মন্ত্রীকে বলেছিলাম: স্যার, আমিও যাই।
ধমক দিয়ে থামিয়ে দিয়েছেন: ফাঁকি দেয়ার একটা সীমা আছে। যে কাজে এসেছো সেটি করার পর অন্য কিছু।
ঠিক পাঁচটায় কনফারেন্স শেষ।
গাড়ি নিয়ে সোজা হোটেল, মোবাইলে পাঁচটা ত্রিশ। 
গাড়ি হতে রুমে। 
মন্ত্রী মহোদয় হাতমুখ ধুঁয়ে বিছানায়।
আমি ছোটকাল হতে এলোমেলো। জামা প্যান্ট না খুলে ধপাস।
এবং কয়েক মিনিটের মধ্যে ঘুম।
আমরা দুজন একই রুমে।
রুম একটি হলেও দুটি সাবরুম। বড়টায় মন্ত্রী, ছোটটায় আমি। যার যেমন পদবি।
হঠাৎ ঘুম ভেঙ্গে যায়, নাকে ধোঁয়া, মানে গন্ধ।
মোবাইলের পর্দায় চোখ দেই, না বিশ মিনিটও ঘুমোয়নি। এর মধ্যে গন্ধ এল কোত্থেকে!
ধোঁয়ায় আমার প্রচণ্ড ভয়।
সিগারেট নয়। 
মন্ত্রী ধূমপান করেন না।
অন্য কিছু পোড়ার গন্ধ, কাপড় কাপড় ভাব।
সতর্ক হই।
নিশ্চয় রুমের কোথাও আগুন লেগেছে। 
লেপ সরিয়ে হুড়মুড় উঠে পড়ি। ধোয়ার প্রাবল্য বাড়ছে। 
সাব-ডোর ঠেলে মন্ত্রীর রুমে ঢুকে পড়ি।
তিনি লেপের নিচে। 
গন্ধটা এখানে আরও প্রকট। রুম হিটারের কোন সংযোগ নষ্ট হল না তো!
এমনটি হবার জো নেই। 
এটি বাংলাদেশ নয়, পৃথিবীর শ্রেষ্ঠতম একটি দেশ।
কেয়ামত হয়ে যাবে হোটেল মালিকের।
হোটেল মালিক ইহুদি। যেমন আয় করে তেমন খরচ, পুরো হোটেল চকচক তকতক।
ইস্তাম্বুলে যে হোটেলে উঠেছিলাম সেটিরও মালিক ছিলেন ইহুদি। 
অন্যান্য ব্যবসার মত পৃথিবীর সব উন্নত দেশের হোটেল ব্যবসার বিরাট অংশ ইহুদিদের দখলে। 
দে ডিজার্ভ ইট।
স্যার?
পাতলা ঘুম মন্ত্রীর। ধড়ফর করে চোখ খুলেন: কী ব্যাপার?
গন্ধ পাচ্ছেন?
ধোয়ার গন্ধ। কী হয়েছে?
জানি না তো।
ধোঁয়া আমার ভাস্কর বন্ধুর কথা মনে পড়িয়ে দেয়। বিখ্যাত ভাস্কর, আরবি-বাংলা মেশানো নাম। তিনি পৃথিবীর সবচেয়ে দামি সিগারেট টেনেছেন। সিগারেটটির দাম পড়েছিল এক হাজার ইউএস ডলার, 
মানে একাশি হাজার টাকা।
সেটি অন্য দেশের ঘটনা।
ভাষ্কর চেইন-স্মোকার। গোসলেও সিগারেট টানেন, ভাত খাওয়ার সময়ও, এমনকি বাথরুমে ঝর্ণার নিচেও। একটা সিগারেট শেষ করতে সাত মিনিট লাগে। তিনি ষোল ঘণ্টা জেগে থাকেন। এ হিসেবে প্রতিদিন লাগে দশ প্যাকেট সিগারেট।
বিদেশে গেলে একটু সমস্যা হয়। তাই পারতপক্ষে বিদেশে যান না।
তিন মিনিটও হয়নি সিগারেট জ্বালিয়েছেন ভাষ্কার, হঠাৎ কলিং বেল।
হোটেল সিকিউরটি হাজির: স্যার, এটি নন-স্মোকিং জোন।
আমি তো জ্বালিয়ে ফেলেছি।
জরিমানা দিতে হবে
কত?
এক হাজার ডলার।
নিভিয়ে দেই?
স্মোক সেন্সিং মেশিন হোটেলে এক হাজার ডলার জরিমানা পাঠিয়ে দিয়েছে।
আমি মাত্র অর্ধেক শেষ করেছি। পাঁচশ ডলার দিলে হবে?
এক হাজার ডলার দিতে হবে।
তাহলে পুরোটা খেয়ে নেই। আর মাত্র সাড়ে তিন মিনিট।
কী হয়েছে ভালভাবে দেখো। মন্ত্রীর কণ্ঠে বর্তমানে ফিরে আসি। 
চোখ যায় লাইট স্ট্যান্ডে। 
মরিচারোধী চকচকে সিলভার স্ট্যান্ডের উপর প্লাস্টিকের একটা পাটাতন, তার উপর লাইট। 
লাইটের উপর ধোঁয়া।
চেয়ার টেনে উপরে উঠি।
বাল্বের উপর একটা অন্তরীয় (আন্ডারওয়্যার)। 
ওটা পুড়ছে। 
তাড়াতাড়ি নামিয়ে বারান্দায় নিয়ে পানি ঢেলে নিভিয়ে দেই।
এটা এখানে কে রেখেছে?
আমার প্রশ্নে মন্ত্রী লজ্জাকাতর: আমি রেখেছি। ধুয়ে শুকানোর জন্য। ভেবেছিলাম লাইটের উপর প্লাস্টিক আছে।
রুমে তখনও গন্ধ। জানাল খুলে দেই। দরজাও।
কানে সাইরেনের আওয়াজ। বারান্দায় গিয়ে দেখি নিচে পুলিশ, ফায়ার ব্রিগেড।
কী ব্যাপার?
মন্ত্রী: কত কী হতে পারে।
কয়েক মিনিট পর দরজায় টকটক আওয়াজ।
ফায়ারম্যান, পুলিশ আর হোটেল-ম্যানেজার। 
সবার চোখেমুখে উৎকণ্ঠা। আমাকে এক প্রকার ঠেলা দিয়ে রুমে ঢুকে পড়েন ম্যানেজার।
ম্যানেজার: আপনাদের রুমে আগুন লেগেছে।
আমি আর মন্ত্রী দুজনই লজ্জানত।
কী হয়েছে বলুন তো? ম্যানেজার ফ্রেঞ্চ আর ইংরেজি ভাষায় বললেন।
ঘটনা খুলে বললাম। 
তারা আমাদের আচরণে অবাক হলেন কি না বুঝা গেল না।
ভাগ্য ভালো, জরিমানা করেনি। 
তবে সাবধান থাকার অনুরোধ করেছেন।
দুজন অনেক্ষণ বাকহীন।
তিনশ বর্গফুটের একটা রুমে ধোঁয়ার উৎস খুজে বের করতে আমাদের পাঁচ মিনিট লেগেছে। 
এ দেশের ফায়ার ব্রিগেড আট মিনিটে দশ কিলোমিটার দূর থেকে চলে এসেছে হোটেল রুমে।
বাংলাদেশের সাথে তুলনা করলাম। 
মরে-পুড়ে অঙ্গার হবার পর ফায়ার ব্রিগেড খবর পায়।
টেলিভিশনে মৃত্যুর সংখ্যা নিয়ে শুরু হয় গবেষণা, 
টকশো; রাজনীতি, 
বাঁচানো নয়,
লাশের সংখ্যা কত কম হতে পারত!

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!