মূর্তি ও ভাস্কর্য

ড. মোহাম্মদ আমীন
প্রথমে বলে রাখি, আভিধানিক অর্থ বিবেচনায় মূর্তি ও ভাস্কর্যের মধ্যে পার্থক্য নেই বললেই চলে। তবে প্রায়োগিক, আদর্শিক, সাংস্কৃতিক, নান্দনিক, ঐতিহ্য-কৃষ্টিক ও অনুবোধগত বিবেচনায় উভয়ের মধ্যে রয়েছে বিস্তর পার্থক্য। অবশ্য শব্দ দুটোর অর্থ প্রায় অভিন্ন হলেও উভয়ের ব্যুৎপত্তিগত ভিন্নতা রয়েছে। যা মূর্তি ও ভাস্কর্য শব্দের প্রায়োগিক পার্থক্যের সুস্পষ্টতার প্রমাণ দেয়। ভাস্কর- সং ভাস্+কৃ+অ= ভাস্কর>ভাস্কর্য; মূর্তি- সং মূর্ছ্+তি। ভাস্কর্যের সঙ্গে শিল্পকর্মের প্রাধান্য আর মূর্তির সঙ্গে পূজার প্রাধান্য পরিদৃষ্ট হয়। তাই লেখাটি পড়ার আগে আভিধানিক অর্থের সঙ্গে ব্যুৎপত্তি ও প্রায়োগিক বিষয়টা গুলিয়ে ফেলা ঠিক হবে না।

‘বাংলা একাডেমি ব্যবহারিক বাংলা অভিধান’ অনুযায়ী ‘মূর্তি’ বা ‘মূরতি’ শব্দের অর্থ হচ্ছে – দেহ, আকৃতি, রূপ, প্রতিমা। ইংরেজিতে মূর্তি শব্দের প্রতিশব্দ Statue। ভাস্কর শব্দের আভিধানিক অর্থ হচ্ছে, প্রস্তরাদি থেকে মূর্তি প্রভৃতি নির্মাণকারী, যে ব্যক্তি প্রস্তরাদি প্রভৃতি থেকে মূর্তি নির্মাণ করে। ইংরেজি ভাষায় ভাস্কর শব্দের প্রতিশব্দ হচ্ছে Sculptor। একই অভিধানমতে, ভাস্কর্য শব্দের অর্থ হচ্ছে, প্রস্তরাদি খোদাই করে তা দিয়ে মূর্তি নির্মাণের কাজ, ভাস্কর শিল্প প্রভৃতি। ইংরেজিতে ভাস্কর্য শব্দের প্রতিশব্দ হচ্ছে sculpture। রবীন্দ্রনাথ লিখেছেন, ওগো মা, তোমার কী মুরতি আজি দেখি রে! এখানে মা বলতে দেশ নির্দেশ করা হয়েছে। দেশ হতে পারে প্রেম, পূজো — ব্যক্তিভেদে অন্য কিছু।

অর্থ থেকে দেখা যায়, প্রস্তরাদি খোদাই করে যে মূর্তি তৈরি করা হয় সেটিই ভাস্কর্য। প্রস্তরাদি খোদাই না করে অন্যভাবে মূর্তি বানানো হলে তা ভাস্কর্য নয়। এটি হচ্ছে আভিধানিক দিক। ইংরেজিতে statue এবং sculpture সমার্থক। বাংলাতেও আভিধানিক বিবেচনায় মূর্তি ও ভাস্কর্য অভিন্ন অর্থ দ্যোতিত করে। অর্থাৎ মূর্তি ও ভাস্কর্য সমার্থক। আভিধানিক অর্থ সবসময় প্রায়োগিক দিকের সবকিছুকে সম্পূর্ণভাবে পরিসজ্জিত করতে পারে না। এটি সম্ভবও নয়। শব্দের অর্থের প্রয়োগ নানা কারণে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হতে পারে এবং হয়। এক্ষেত্রেও তেমনটি দেখা যায়। আমরা মূর্তি বলতে সাধারণভাবে এমন একটা ভাস্কর্য বা প্রতিরূপ বুঝি যা পূজো করার জন্য স্থাপিত হয়েছে। কিন্তু ভাস্কর্য বলতে বুঝি এমন একটি প্রতিকৃতি যা পুজোর জন্য স্থাপিত হয়নি।

প্রায়োগিক দিক বিবেচনায় দেখা যায়, ভাস্কর্য প্রত্যক্ষভাবে নিয়মিত বা অনিয়মিত; যে ভাবে হোক না, কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর পূজা, প্রার্থনা, যজ্ঞ, আরধনা, মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান প্রভৃতি কাজে ব্যবহৃত হয় – সেটি, তৈরি বা উৎস নির্বিশেষে আমাদের দেশে মূর্তি হিসেবে পরিচিত। তবে যেসব ভাস্কর্য পূজা, প্রার্থনা, আরাধনা, মাঙ্গলিক কর্ম, যজ্ঞ প্রভৃতি কাজে সরাসরি ব্যবহৃত হয় না, বরং ঐতিহাসিক বা পৌরাণিক খ্যাতির জন্য নান্দনিক সংস্কৃতি, মূল্যবোধজনিত অনুভব, আদর্শিক শৈলী, বিশ্বায়ন প্রভৃতি পরিস্ফুটনে ব্যবহৃত হয় সেগুলো মূর্তি নয়; ভাস্কর্য। একটা বিষয় আমাদের মনে রাখা সমীচীন যে, সকল মূর্তি পূজ্য নয়৷ প্রয়োগিক দিক বিবেচনা করলে বলতে হয়, যে সকল প্রতিকৃতি পূজ্য নয়, তা-ই ভাস্কর্য৷

মূর্তি আর ভাস্কর্যের মধ্যে আর একটি ছোটো পার্থক্য দেখা যায়। ভাস্কর্যের মধ্যে ভাস্করের স্বকীয় সৃজনশীল চেতনার চিহ্ন যতটা পরিস্ফুট হয়, পূজোর লক্ষ্যে নির্মিত প্রতিকৃতিসমূহের মধ্যে ততটা হয় না। পূজার জন্য নির্মিত প্রতিকৃতিতে ব্যক্তির আসন-বসন ও বাহ্যিক রূপকে সবক্ষেত্রে প্রায় অভিন্ন রাখা হয়। কিন্তু ভাস্কর্যে, ভাস্কর নিজের সৃজনশীলতা দিয়ে তাকে নিজের অনুভবগত চেতনায় সৃষ্টি করে।

বুদ্ধের ভাস্কর্য প্রস্তরাদি খোদাই করে নির্মাণ করা হলেও সেটাকে যদি পূজা করা হয়, তাহলে সেটি মূর্তি হয়ে যায়, ভাস্কর্য থাকে না। তাই বুদ্ধের ভাস্কর্য মূর্তি। প্রায়োগিক ক্ষেত্রে মূর্তি ও ভাস্কর্যের পার্থক্য, নির্মাণ কৌশলের উপর নয় বরং ব্যবহারের উপর নির্ভর করে। নজরুলের বা রবীন্দ্রনাথের আকৃতি যেভাবে তৈরি করা হোক না কেন, তা যদি পূজো-প্রার্থনা, যজ্ঞ ইত্যাদি কাজে ব্যবহৃত হয় তা মূর্তি হয়ে যাবে। এগুলো পূজিত হয় না বলে ভাস্কর্য নামেই সমধিক গৃহীত।

প্রায়োগিক ব্যাখায় statue of liberty মূর্তি নয় ভাস্কর্য। কারণ এটি পূজিত হয় না। পূজিত হলে আমাদের প্রায়োগিক ও মনোগত ব্যাখ্যায় এটিও মূর্তি হয়ে যেত। পৃথিবীর বিভিন্ন মুসলিম প্রধান দেশের জনবহুল স্থানে রয়েছে অনেক ভাস্কর্য। ইংরেজিতে এগুলো স্টাচু বলা হয়, যার বাংলা সমার্থক শব্দ মূর্তি। কিন্তু এগুলো পূজিত হয় না বলে মূর্তি নয়, ভাস্কর্য নামে পরিচিত।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!