মৃত্যুঞ্জয়ী আহমদ ছফার করুণ মৃত্যু

ড. মোহাম্মদ আমীন

২০০১ খ্রিস্টাব্দ, ১৯ জুলাই, সম্ভবত সকাল ১০.৪৫ মিনিটের ঘটনা। ফোন করেছেন ছফা। 
বললেন : কয়েকদিন আগে ডাক্তারের কাছে গিয়েছিলেম, আমাকে পরীক্ষা করে ডাক্তারের ভালো মনে হয়নি। জটিল রোগ, ভুগতে হবে নাকি অনেকদিন। ভালোভাবে চিকিৎসা না হলে না-ও বাঁচতে পারি। জানো, নাম শুনে আমার, ডাক্তার সাহেব ফি-টাও নেয়নি! লাইনেও দাঁড়াতে হয়নি। এখনও লেখকের দাম আছে সমাজে, বুঝলে? আমার বইয়ের কোনো প্রকাশক হলে ফি নিয়েই ছাড়ত। বলত : ছফা ভাই ত্রিশ কপি বইয়ের রয়্যালটি পাবেন না, চিকিৎসা ফি বাবদ কেটে নিলাম। 
কী বলেছেন ডা্ক্তার? 
তাড়াতাড়ি নাকি অপারেশন করাতে হবে। বার বার করে বলে দিয়েছে। ফি এর বদলে একটা সিগারেট দিতে চেয়েছিলাম। নেয়নি, হেসেই ফিরিয়ে দিয়েছে ডাক্তার। বলল : ছফা ভাই আমি নন-স্মোকার। 
রোগটা কী? 
ফুসফুস নাকি ছাই হয়ে গেছে প্রায়, দ্রুত অপারেশন ছাড়া নাকি বেশিদিন বাঁচব না। বেশিদিন বাঁচলে আরও কয়েকটা বই লিখতে পারব। ডাক্তার আমাকেও নন-স্মোকার হয়ে যেতে বলল। 
আপনি কী বললেন? 
ওয়াল্লা, আমি কীভাবে সিগারেট ছাড়ব? ঔষধের সঙ্গে সঙ্গে সিগারেটও চালিয়ে যাচ্ছি। এখন আমার রোগ শরীর থেকে খাটে, খাটের খুঁটি বেয়ে বাসার মেঝে পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে। বাথরুমে যেতেও কষ্ট হয়। তেলেপোকার দল নাকে সুড়সুড়ি দেয় সুড় দিয়ে।হাত দিয়ে সরাতেও পারি না। মাছির কথা না-হয় বাদই দিলাম। মানুষ বন্ধুরা যত দূরে সরে যাচ্ছে পোকামাকড়গুলো তত ঘনিষ্ঠ হচ্ছে, কাছে আসছে। এটা কি তাহলে মানুষ হতে চিরকালের জন্য দূরে চলে যাওয়ার ঈঙ্গিত? 
এখন আপনি কেমন আছেন? 
বিছানা থেকেও ওঠতে কষ্ট হয়। কফ-কাশি সব ছাদরেই ফেলি, কম্বলেই মুছি। গ্লাসে জল ঢালতেও কষ্ট হয়, সিগারেট জ্বালাতেও কষ্ট হয়। তবু না করে উপায় নেই।
সিগারেট আর টানবেন না।
সিগারেট আর জল- এ দুটো না-খেয়ে উপায় নেই। পুরো বাসাটা আমার মতো নিজের মাঝে অদ্ভুদভাবে অন্তর্মুখী হয়ে গেছে।বারান্দায় গাছের যে পাতাটা এক মাস আগে পড়েছে, এখনও সেটা সেখানে রয়ে গেছে। পরিষ্কার করার কেউ নেই। পাতাটা হয় বাতাসে উড়ে গেছে বা পঁচে গেছে, নয়তো শুকিয়ে গেছে। তুমি এলে গন্ধে ঢুকতেই পারবে না বাসায়। এজন্য হয়তো তোমরা, লেখকেরা আর আগের মতো আড্ডা দিতে আস না।সিগারেট কেনারও লোক পাই না।চায়ের পাতা কেনার লোকও কমে গেছে। বইগুলো ছাড়া আমার আর কেউ নেই।ওগুলোও এখন সুপ্ত, মরার পর জেগে ওঠবে হয়তো জীবনানন্দের কাব্যের মতো।হেমচন্দ্রের মতো তখন আমার জন্য সবাই হাহুতাশ করবে। আমি কাশতে পারি কিন্তু লিখতে পারি না। কাশতে, লেখার জন্য বেশি শক্তি ক্ষয় করতে হয়। তবু কাশতে পারি কিন্তু লিখতে পারি না কেন?
পারবেন। 
দেখিও মরার পর আমার বই কীভাবে বিক্রি হয়, আমি কত জনপ্রিয় হই। তখন রয়ালটি নেওয়ার জন্য ঝগড়া করবে আমার ভাতিজারা। 
আপনার বন্ধুরা আসেন না? 
এখন আমার কাছে তেমন কেউ আসে না। মাঝে মাঝে কয়েকজন আসে। তারা আমার কাশি আর শরীরের অবস্থা দেখে ডাক্তারের কাছে যাওয়ার উপদেশ দিয়ে চলে যায়। এমন দুর্বল শরীরে ডাক্তারের কাছে যাওয়াও সম্ভব নয়। কেউ ডাক্তারের কাছে নিয়েও যায় না। আমিও বলি না। মরব, তবু কারও কাছে ছোট হব না। আমি তাদের কাছ থেকে এটুকু স্বতঃস্ফুর্ত কিছু সেবা আশা করতে পারি না? 
অবশ্যই পারেন। 
আমি থাকি পাঁচ তলায়, তুমি জানো বাসায় লিফট নেই। অ্যাজমা রোগী আমি, ভাতিজারাও অ্যাজমায় ভুগছে। বুঝতে পারে- উঠতে-নামতে কী কষ্ট আমার হয়। আগে যারা ঘন ঘন আসত এখন তাদের রিং করেও আনা যায় না। সবাই ব্যস্ত নিজেদের নিয়ে। লিফট ছাড় পাঁচ তলায় ওঠা আসলেই কষ্টকর।
আপনার ভাতিজা, যে আপনার সঙ্গে থাকত সে কোথায়? 
চাকরি পাওয়া পর্যন্ত কাছে ছিল। এখন চাকরি পেয়েছে। চাকরির পর পেয়েছে বউ; তারপর? তারপর আর কি, দুটো নিয়ে এখন শনির আখড়ায় একটা বাসা নিয়ে থাকে। বউটাও চাকরি করে একটা স্কুলে। চাকর হতে চাকরি, কত বাধ্যবাধকতা, আসবেই বা কী করে! এজন্যই তো আমি চাকরিই নিইনি।থাক ওসব। 
ইদ্রিস? 
সে-ই কেবল ভরসা ছিল, ভালো ডাল রাঁধত, ভালো বাজার করত। তুমি তো আমার বাসায় ইদ্রিসের রান্না অনেকবার খেয়েছ। দারুণ রাঁধত। মাথাটাও টিপে দিত মাঝে,মাঝে পাগুলোও। তাকে অনেকদিন বেতনটাও দিতে পারছিলাম না। কয়জনকে বলব, কতবার বলব? যারা টাকা দেওয়ার কথা, তারা দেয় না। লেখা ছাড়া তো আমার আর কোনো পেশা এখন নেই। যখন ছিল তখন তো কিছু সঞ্চয় করিনি। হেমচন্দ্রের মতো সবাইকে বিলিয়ে দিয়েছি। 
ইদ্রিস কী চলে গেছে? 
ইদ্রিসকে আমিই চলে যেতে বলেছি। বলা যায়, বাধ্য করেছি। সে যেতে চায়নি। বললাম, চলে যাও। অন্য কোথাও কাজ দেখ, তুমি তো আর আমার মতো চিরকুমার নও।তোমার ছেলেপেলে আছে, সংসার আছে।
প্রকাশকগণ? যারা আপনার বই বিক্রি করে লাখ লাখ টাকা আয় করেছেন?ওরা টাকা দেন না, আসেন না?
ওয়াল্লা, ফোন করলেও ধরে না অনেকে।ধরলেও এমনভাবে কথা বলে, যেন আমি একটা বোঝা, আমাকে ফেলে দিতে পারলে বাঁচে। আসলে প্রকাশকগণ ইচ্ছে করেই, লেখকের জীবদ্দশায় বইয়ের বহুল প্রচার করে না। তাহলে যে, কিছু রয়্যালটি বেশি দিতে হয়। অনেক বার বলার পর কয়েকজন প্রকাশক, পিয়ন দিয়ে সামান্য কিছু পাঠায়, এমনভাবে পাঠায় যেন, আমি তাদের অনুগৃহিত। অসহায়ের প্রতি বাধ্যগত অনুগ্রহের মতো নিষ্প্রাণ ও নিষ্ঠুর টাকাগুলো তবু নিতে হয়। হাজার হোক টাকা, সিগারেট কেনা যায়, ঔষধ না-ই বা কিনলাম। 
ঔষধ তো খেতেই হবে। 
ডাক্তারের কাছে যাওয়া বড় প্রয়োজন, তবে শরীরের জন্য পারছি না। নেওয়ার কেউ নেই, গাড়ি দূরে থাক, একটা রিক্সা পর্যন্ত আমার নেই। একজন ডাক্তারকে বাসায় আসার জন্য অনুরোধ করেছিলাম।ডাক্তার আসে না।তার কাছেই যেতে হবে আমাকে। অবশ্য রুই-কাতলা হলে আলাদা কথা ছিল, আমি তো চুনোপুটি। ফি দিতে পারব না, ডাক্তারও পারবে না নিতে। কেন আসবে ডাক্তার? 
কী বলেছেন ডাক্তার? 
আগের ঔষধগুলো নিয়মিত সেবন করার উপদেশ দিয়েছেন। অপারশেনটা করাতে পারলে নাকি পুরো ভালো হয়ে যাব, একদম যুবকের মতো আবার সিড়ি বেয়ে তর তর করে উঠতে পারব। তবে তাড়াতাড়ি করাতে হবে।অনেক টাকা লাগবে, তুমি জানো অপারেশন করতে কত টাকা লাগে? আমি শুনেছি, এমন অপারেশনে নাকি কয়েক লাখ টাকা লাগে? ওয়াল্লা, এত টাকা আমাকে দেবে কে? থাক, অপারেশনে আমার বড় ভয়। বরং এভাবেই যাক, ঔষধ খেলেও নাকি ভালো হয়ে যাব। 
নিয়মিত ঔষধ খাচ্ছেন তো?
ঔষধ কিনতেও তো টাকা লাগে। ফার্মাসিস্ট আমাকে চেনে না।তার কাছে ছফার চেয়ে একটা কয়েন অনেক মূল্যবান। কয়েন ঝনাৎ করে লাফিয়ে ওঠে পাথরের মেঝে পড়লে। আমি পড়লে ধপাস শব্দ ছাড়া আর কিছু হবে না, লাফিয়ে ওঠতে পারব না কয়েনের মতো। আগের মতো গর্জে ওঠতে পারি না।কলম দূরে থাক সিগারেটটাও মুখে আনতে কষ্ট হয়। পারলে একবার দেখতে এস বাবা। 
আসব, খুব তাড়াতাড়ি আসব। 
আমি খুব অসুস্থ, শুধু আমি নই, পুরো বাসাটা অসুস্থ। 
‘টাকা প্রয়োজন’ ফোন করে এটাই বলতে চেয়েছিলেন ছফা।মারা যাওয়ার কিছুদিন আগে।আমি তখন চকরিয়া, উপজেলা ম্যাজিস্ট্রেট। গুরুত্ব দিয়েও কাজের চাপে গুরুত্বহীন হয়ে যায় ছফা; ছফার কথা। পরদিন ঢাকায় আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। আসা হয়নি জরুরি কাজে, সরকারের পালাবদলের রিহার্সেল, সার্কিট হাউসে গুরুত্বপূর্ণ সভার আয়োজন করা হয়। তারপর দিন আর একটা, পরদিন আর একটা। এভাবে কাজে কাজে ভুলেই যায় ছফার কথা। সাত-আট দিন পর ফোন পাই, ছফা নেই। কাজের ছুটা-বুয়া খবর দেয়, সে-ই সবাইকে ডেকে আনে।
কী বলো! ছফা নেই? 
তেল ছিটছিটে পুরানো কাথার ওপর নিথর হয়ে পড়ে আছে ছফার দেহ।হাতের অর্ধদগ্ধ সিগারেট আঙুল পর্যন্ত পুড়িয়ে দিয়েছে, তবু ঘুম ভাঙেনি ছফার। চারিদিকে ময়লা কাপড়ের স্তুূপ, বিছানায় স্ট্রে, বাদামের খোসা, সিগারেটের ছাই, চানাচুরের গুড়ো, সিগারেটের প্যাকেট, পোকা-কিলবিল স্যুপের দুটো বাটি, চারিদিকে চষে বেড়াচ্ছে তেলেপোকার দল। বালিশের পাশে আমের আধচোষা দুটি আঁটিও ছিল।পুরো মেঝে সিগারেটের টুকরো।ঝাঁকঝাঁক মাছি আর সারি সারি পিঁপড়া অভিবাদন দিচ্ছে ছফার নিথর দেহে। তারা নাক দিয়ে ঢুকছে, কান দিয়ে বের হচ্ছে। 
ছফা নেই। 
ছফা মারা গেছেন। টাকার অভাবে ঔষধ কিনতে পারেননি ছফা, অপারেশন করাতে পারেননি, বিনা চিকিৎসায় হেমচন্দ্র বন্দোপাধ্যায়ের মতো ধুকে ধুকে মরে গেছেন। যে ছফা শরীরকালে হাজার হাজার লোকের উপকার করেছেন, হুমায়ুন আহমদসহ আরও অনেক লেখকের বই প্রকাশে সহায়তা করেছেন, সে ছফাকে ঢাকার বুকে, তার অর্থে বিখ্যাত ও কোটিপতি হওয়া লেখকদের সামনে বিনা চিকিৎসায় একা একা অসহায় অবস্থায় মরে যেতে হয়েছে। কেউ ছিল না অসুস্থ ছফার পাশে। 
ছফার মৃত্যুর চৌদ্দ বছর পরের ঘটনা। 
বাংলা বাজারে ছফার এক প্রকাশকের সঙ্গে আলাপ হচ্ছিল। নামীদামি প্রকাশক তিনি, ছফার অনেক বই ছাপিয়েছেন। এখনও ছাপিয়ে যাচ্ছেন। তার সঙ্গে ছফার খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল। মাঝে মাঝে ছফার বাংলা মটরের বাসায় দেখা যেত তাকে।এখন শুধু তিনি নন, অনেক প্রকাশক ছফার বই ছাপান।তবে গোল বাঁধে ছফার ভাতিজাদের মধ্যে রয়্যালটি ভোগের ঝগড়া। এতদিন ছফার ছোট ভাতিজা আনোয়ার একাই সব রয়্যালটি নিতেন, এবার বড় ভাতিজা সিরাজও রয়্যালটির ভাগ চাইছেন। এ নিয়ে আলোচনা; মীমাংসায় সহায়তা করার জন্য প্রকাশক সাহেব আমাকে ডেকেছেন।ওই প্রকাশনা থেকে অবশ্য আমারও বই প্রকাশিত হয়েছে। 
কথাপ্রসঙ্গে বিখ্যাত ওই প্রকাশক বললেন : ছফা ভাই আজ বেঁচে থাকলে জানেন, আমি কী করতাম? 
কী করতেন?
ছফা ভাইকে ছয়তলা একটা বিল্ডিং বানিয়ে দিয়ে রাজার হালে রাখতাম।

লেখক পরিচিতি : ‘আহমদ ছফার চোখে বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবী’ ও ‘ আহমদ ছফা বনাম হুমায়ুন হুমায়ূন’ গ্রন্থের রচয়িতা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!