অভিবাসী প্রবাসী নাগরিক শরণার্থী আশ্রয়প্রার্থী এবং পর্যটক

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত ‘অভিবাসী’ শব্দের অর্থ স্বদেশ ত্যাগ করে অন্য দেশে বসবাসকারী পরদেশবাসী। অর্থ থেকে বোঝা যায়, ‘অভিবাসী’ হতে হলে কাউকে স্বদেশ ছেড়ে অন্য দেশে বসবাস করতে হবে। কতদিন বসবাস করতে হবে, তার কোনো নির্দিষ্টতা নেই, তবে তা স্বল্প সময়ের হবে না। কারণ, স্বল্প সময়ের জন্য কেউ বিদেশে বসবাস করার জন্য নিজ দেশ ত্যাগ করেন না। যেমন, পর্যটকদের অভিবাসী বলা যাবে না, কারণ তারা ভ্রমণ করতে যান, বসবাস করতে নন। প্রসঙ্গত, ‘পর্যটক’ শব্দের অর্থ ভ্রমণকারী, পরিব্রাজক, যে ব্যক্তি ভ্রমণ করে প্রভৃতি।

‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ মতে বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘প্রবাসী’ শব্দের অর্থ নিজ দেশে ভিন্ন অন্য দেশে বসবাস করে এমন। অর্থ থেকে বোঝা যায়, এখানে মুখ্য বিষয় হচ্ছে নিজ দেশ ছাড়া অন্য দেশে বসবাস। যে কারণেই হোক না, কোনো ব্যক্তি নিজ দেশ ছেড়ে অন্য দেশে বসবাস করলে তাকে নিজ দেশের হিসেবে প্রবাসী বলা যাবে। যেমন : “লন্ডনে অভিবাসী সজীব দীর্ঘ পাঁচ বছর প্রবাসী জীবন কাটিয়ে স্বদেশে ফিরলেন।” আমার দেশে যারা অভিবাসী তারা প্রবাসী নন,যারা প্রবাসী তারা অভিবাসী নন। প্রবাসী হলো- বিদেশে বা পরদেশে অবস্থানকারী আমাদের দেশি মানুষ তথা বাংলাদেশি নাগরিক। অন্যদিকে, অভিবাসী মানে হলো- আমাদের দেশে অবস্থানকারী বিদেশি নাগরিক। আমাদের দেশের যেসব লোক বিদেশে বসবাস করেন, তাদের ব্যবস্থাপনার জন্য সরকার ‘প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রণালয়’ প্রতিষ্ঠা করেছে।  

তবে আটপৌরে কথাবার্তায় অনেকে অভিবাসী ও প্রবাসী শব্দদুটোর অর্থ গুলিয়ে ফেলেন। এ বিষয়ে শুবাচের একটি স্ট্যাটাসে শুবাচি খুরশেদ আহমেদ সাহেবের মন্তব্য প্রণিধানযোগ্য, “২০০০ সালে (খ্রিষ্টাব্দে) আমি কানাডায় প্রথমবারের মতো বেড়াতে যাই। আমার ভিসা ছিল ভিজিটার ভিসা। তখন ওদেশে আমি ছিলাম প্রবাসী। ২০১৪ সালে(খ্রিষ্টাব্দে) আমি আবার কানাডায় যাই। তবে, তখন আমার ভিসা ছিল ইমিগ্র্যান্ট ভিসা এবং তখন ওদেশে পৌঁছামাত্র আমি হই ‘ল্যান্ডেড ইমিগ্র্যান্ট’ [(ওদেশে) পৌঁছে-যাওয়া অভিবাসী]; পরে একসময়ে ‘পারমানেন্ট রেসিডেন্ট’ বা ‘স্থায়ী বাসিন্দা’। তার পর থেকে আমি, কানাডা ও বাংলাদেশ উভয় দেশ জুড়েই বাস করছি – কখনো কানাডায়, কখনো বাংলাদেশে। আমি এখনও কানাডার নাগরিক নই; তবে, ‘পারমানেন্ট রেসিডেন্ট’ হওয়ার সুবাদে ওদেশে এখন আমার অধিকার, দায়িত্ব ও কর্তব্য একজন ভিজিটার বা পর্যটকের চেয়ে বেশি। আইনের পরিভাষায় আমি এখন কানাডায় অভিবাসী। কিন্তু আটপৌরে কথাবার্তায় এখনও তো বলি, আমি কানাডায় প্রবাসী!

এবার দেখা যাক, শরণার্থী বা আশ্রয়প্রার্থীকে অভিবাসী বা প্রবাসী বলা যাবে কি না? ‘বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান’ মতে, বাক্যে বিশেষণ পদ হিসেবে বাক্যে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘শরণার্থী’ শব্দের অর্থ হচ্ছে, আশ্রয়প্রার্থী। অন্যদিকে, আশ্রয়প্রার্থী’ শব্দের অর্থ, আশ্রয় চান এমন। উদাহরণস্বরপ বলা যায়, বাংলাদেশে বসবাসকারী রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয়প্রার্থী বা শরণার্থী। এখানে তারা দীর্ঘ সময় বসবাস করছেন। সে হিসেবে এবং অভিবাসী শব্দের অর্থ বিবেচনায় তারা বাংলাদেশে অভিবাসী, কিন্তু মায়ানমার বলবে, রোহিঙ্গারা প্রবাসী। একজন শরণার্থী বা আশ্রয়প্রার্থী একই সঙ্গে প্রবাসী বা অভিবাসী  হিসেবেও কথিত হতে পারেন, কিন্তু একজন প্রবাসী বা অভিবাসী  শরণার্থী বা আশ্রয়প্রার্থী না-ও হতে পারেন। অর্থাৎ সব  শরণার্থী বা আশ্রয়প্রার্থী উৎস বিবেচনায় অভিবাসী বা প্রবাসী, কিন্তু সব অভিবাসী বা প্রবাসী শরণার্থী নন। নিজ দেশে ছেড়ে চাকুরি, শিক্ষা বা অন্য কারণে বসবাসের উদ্দেশ্যে লম্বা সময়ের জন্য কোনো দেশে স্থানান্তরিত হলে ওই ব্যক্তি সে দেশের জন্য অভিবাসী, কিন্তু নিজ দেশের পরিপ্রেক্ষিতে প্রবাসী।

এবার দেখা যাক, ‘নাগরিক’ শব্দের অর্থ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধান মতে, জন্মগতাসূত্র বা আইনগতভাবে বিশেষ কোনো দেশ বা রাষ্ট্রের অধিবাসীকে ‘নাগরিক’ বলা হয়। প্রসঙ্গত, অধিবাসী শব্দের অর্থ হচ্ছে- স্থায়ীভাবে বসবাসকারী, নিবাসী প্রভৃতি।

আমার ছোটো বোন ফারজানা চাকুরিগত কারণে ২০০৫ খ্রিষ্টাব্দ থেকে ২০১০ খ্রিষ্টাব্দ পর্যন্ত দীর্ঘ পাঁচ বছর যাবৎ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করছে।  সে তখন ছিল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী এবং বাংলাদেশের জন্য প্রবাসী। গত ২০১২ খ্রিষ্টাব্দে ফারজানা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকত্ব পেয়েছে। এখন সে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসী নয়, নাগরিক। আমার মেয়ে রচনা, বাংলাদেশের অধিবাসী ছিল, দীর্ঘদিন লন্ডনে প্রবাসী জীবন কাটিয়েছে। এখন সে লন্ডনের নাগরিক। তবে, বাংলাদেশের জন্য দুজনই প্রবাসী, কারণ উভয়ে এখনও একইসঙ্গে বাংলাদেশের নাগরিকও।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!