সোনার কোনো শেষ নেই

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, সংস্কৃত ‘স্বর্ণ’ শব্দ থেকে উদ্ভূত তদ্ভব ‘সোনা’ শব্দের অর্থ-

১. বাতাস জল বা অ্যাসিডের সংস্পর্শে অক্রিয় থাকে এবং উত্তম বিদ্যুৎ পরিবাহী উজ্জ্বল হলুদাভ ঘাতসহ মৌলিক ধাতুবিশেষ যার পারমাণবিক সংখ্যা ৭৯, স্বর্ণ। এটি অত্যন্ত দামি একটি ধাতু। কিন্তু কবির ভাষায় দামি ধাতু না হয়েও অনেক কিছু সোনা হয়ে যায়, যেমন : দেশ। দেশকে সোনা করে কবি গেয়েছেন : 

সোনা সোনা সোনা লোকে বলে সোনা
সোনা নয় ততো খাঁটি
বলো যতো খাঁটি তার চেয়ে খাঁটি
বাংলাদেশের মাটি রে
আমার বাংলাদেশের মাটি
আমার জন্মভূমির মাটি।”

২. স্বর্ণের অলংকারকেও বলা হয় সোনা। 

৩. বিশেষণে সোনা শব্দের অর্থ সোনালি রঙ; হলুদিয়া পাখি সোনারই বরন পাখিটা ছাড়িল কে?

৪. এছাড়া অভিধানে স্বর্ণের একটি আলংকরিক অর্থ আছে। সেটি হচ্ছে : আদরের ধন। অতি প্রিয় কাউকে, বিশেষ করে সন্তান-সন্ততিদের আদর করে সোনামনি ডাকা হয়। যেমন :  সোনামনি যাদুমনি আয়রে আয়–  –  -।

এই গেল কয়েকটি সোনার কয়েকটি কথা। এখানেই কিন্তু শেষ নয়, আরও আছে সোনা। কোনো জিনিস যখন সোনার মতো মূল্যবান মনে করা হয় কিংবা অলংকার হিসেবে ব্যবহৃত হয়, তখন তা সোনা না হলেও সোনার খ্যাতি পেয়ে যায়। যেমন : 

সোনাদানা; চাইনা আমি সোনাদানা বন্ধুরে—। সোনার দেশের পাখিও হয়ে যেতে পারে সোনা। যেমন :

সোনার ময়না। আমার সোনার ময়না পাখি, কোন দোষেতে – – -। শুধু ময়না পাখি নয়, প্রেমিকের কাছে প্রেমিকাও এবং প্রেমিকার কাছে প্রেমিকও সোনা হয়ে যায়। কবি উজাড় করে গান, গান : একটা ছিল সোনার কন্যা মেঘ বরণ কেশ

শীতকালে বাংলাদেশে চাষ করা হয় এবং বসন্তকালে ফোটে এমন হলুদাভ ফুল ও সোনালি বহুবীজযুক্ত ভেষজগুণসম্পন্ন শুঁটি বা তার বীরুৎশ্রেণির বর্ষজীবী একটি বর্ষজীবী উদ্ভিদ আছে, যার নাম সোনামুগ। লতাও সোনা হয়। নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে জাত এবং শীতকালে ফোটে এমন গুচ্ছবদ্ধ সাদা সুগন্ধ ছোটো ফুল বা তার পত্রহীনশাখাপ্রশাখাবিষ্টি ভেষজগুণসম্পন্ন উজ্জ্বল সোনালি রঙের পরজীবী লতানো এক প্রকার উদ্ভিদের নাম সোনালতা। আর একটি  উদ্ভিদের নাম সোনালু। সোনা হোক বা না হোক, সোনার মতো রং যার তাকে বলা হয় সোনালি। যেমন : সোনালি ধান। আবার সোনার মতো রঙ না হয়েও কোনো বস্তু সোনালি হয়ে যেতে পারে। যেমন : সোনালি আাঁশ।

সোনা শুধু সোনা, অলংকার, সোনাদানা বা উদ্ভিদ নয়, দেশের নামও হয় সোনা, যেমন : সোনার বাংলা। ধনধান্যপুস্পভরা আমার দেশ  সোনার বাংলা নামে পরিচিত। সৃষ্টির অপার সম্ভারের চিরন্তন ক্ষেত্র হচ্ছে দেশ। এর দ্বারা দেশের দাম, মূল্য, সমৃদ্ধি ও দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা হয়। এছাড়া আর একটি সোনা আছে। এর অর্থ অভিধানে পাওয়া না-গেলেও আঞ্চলিক শব্দ হিসেবে ব্যবহৃত। পুরুষাঙ্গ বিশেষ করে শিশুদের শিশ্নও সোনা নামে পরিচিত।এটিও সৃষ্টির চিরন্তন অনবদ্যতা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!