প্রতিভা ও মেধার পার্থক্য

Dr. Mohammed Amin
বাক্যে সাধারণত বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘প্রতিভা’ শব্দের অর্থ হলো : প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, প্রজ্ঞা, উদ্ভাবনী জ্ঞান, উদ্ভাবনী বুদ্ধি, তীক্ষ্ণবুদ্ধি প্রভৃতি। ক্ষেত্র বিশেষে প্রভা বা ঔজ্জ্বল্য প্রকাশেও `প্রতিভা’ শব্দটি ব্যবহার করা হয়।  প্রতিভা আছেন এমন কাউকে প্রতিভাধর বা প্রতিভাবান বলা হয়। অর্থ হতে দেখা যাচ্ছে, প্রতিভাবানগণ একই সঙ্গে সৃজনশীল ও বুদ্ধিমান। শব্দটির কয়েকটি পদার্থ দেখুন :
(১) ভাষা মানুষের প্রতিভার উজ্জ্বল দৃ্ষ্টান্ত।
(২) চাকা প্রতিভাবান মানুষের শ্রেষ্ঠ আবিষ্কার।
(৩) জামাল নজরুল ইসলাম বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম প্রতিভার অধিকারী একজন বাংলাদেশি।
‘প্রতিভা’ শব্দে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব, প্রজ্ঞা এবং উদ্ভাবনী জ্ঞান বা উদ্ভাবনী বুদ্ধির অনিবার্যতা রয়েছে। একজন লোক বা বস্তুকে প্রতিভাবান হতে হলে তার সৃজনশীলতা থাকতে হবে। এখানে স্মৃতিশক্তি বা স্মরণশক্তি কিংবা মুখস্থশক্তির প্রয়োজন নেই। কেউ কোনো কিছু আবিষ্কার করে মুহূর্তের মধ্যে ভুলে যেতে পারে, কারো কোনো কিছু মনে না-ও থাকতে পারে এজন্য তাকে মেধাবী বলা না-গেলেও প্রতিভাবান বা প্রতিভাধর বলা যায়। আবার কেউ যদি কোনো কিছু স্মরণশক্তিতে ধরে রাখতে পারে, কিন্তু সামান্য সৃজনশীলতাও না থাকে, তো তাকে মেধাবী বলা যায়; কিন্তু প্রতিভাধর বলা যাবে না। সে হিসাবে প্রশিক্ষিত পশু, তোতপাখি, ডলফিন, কম্পিউটার, ক্যালকুলেটের প্রভৃতিকেও মেধাবী বলা যায়। বর্ডার কলি (Border collie) জাতের কুকুর তো রীতিমতো মেধা নিয়েই জন্মগ্রহণ করে।
 
বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘মেধা’ শব্দের অর্থ স্মরণশক্তি, স্মৃতিশক্তি, ধীশক্তি, বোধশক্তি; সহজ কথায় মুখস্থশক্তি । সংস্কৃত ‘ধীশক্তি’ শব্দের অর্থ বুদ্ধিশক্তি। বুদ্ধি শব্দের অর্থ বোধ, জ্ঞান, বিচারশক্তি প্রভৃতি। সবগুলো অর্থ বিশ্লেষণ করে একিভূত করা হলে মেধা শব্দের অর্থ হয় : স্মরণশক্তি, স্মৃতিশক্তি, মুখস্থশক্তি, বুদ্ধিশক্তি, বোধশক্তি, জ্ঞানশক্তি, বিচারশক্তি প্রভৃতি। অর্থাৎ যার স্মরণশক্তি বা বুদ্ধি আছে, তাদের মেধাবী বলা হয়। এদের মধ্যে যারা বুদ্ধি বিক্রি করে খায়, তাদের বলা হয় বুদ্ধিজীবী (Intellectuals)। এবার মেধা ও প্রতিভার পদার্থ কী জানা যাক :
(৫) মেধাশক্তির (স্মরণশক্তি) উপর গুরুত্ব দিতে গিয়ে বাংলাদেশি শিশুরা প্রতিভাচ্যুত হয়ে পড়ছে।
(৬) মেধাবী ছেলেটি প্রতিবছর প্রথম হয়ে পাস করে, তবে প্রতিভার অভাবে পাঠ্যপুস্তুকের বাইরের কিছুই জানে না।
(৭) মেধা দিয়ে ভালো নম্বর পাওয়া যায়, কিন্তু ভালো কিছু সৃষ্টি করার জন্য শুধু নাম্বার যথেষ্ট নয়, প্রতিভা আবশ্যক।
 
মেধা শব্দের সঙ্গে বুদ্ধিমত্তার যোগসূত্র থাকলেও ‘মেধা’র জন্য সৃজনশীলতা অনিবার্য নয়, কেউ সৃজনশীল না-হলেও কেবল স্মরণশক্তি বা বুদ্ধি থাকলে মেধাবী হয়ে যেতে পারে। যেমন : বাংলাদেশের অধিকাংশ শিশু, যারা প্রতিবছর জিপিএ-ফাইভ নিয়ে পাস করে তাদের সিংহভাগেরই প্রতিভা নেই, তবে মেধা আছে; কারো কারো বুদ্ধিও আছে। তারা মেধার জোরে ভালো সনদ অর্জন করে, কিন্তু প্রতিভাতে অনেকেই শূন্য। মেধাবীরা স্মরণশক্তির জোরে অর্জিত সনদ নিয়ে ভালো চাকুরি পায়, তবে তাদের মধ্যে সৃজনশীল হওয়ার নজির সংখ্যা, পরিমাণ এবং গুরুত্বের দিক থেকে তেমন উল্লেখযোগ্য নয়। বর্ডার কলি (Border collie) জাতের কুকুর মেধা নিয়েই জন্মগ্রহণ করে, শিক্ষা তাকে আরও মেধাবী করে তোলে, কিন্তু প্রতিভাধর করতে পারে না।কারণ তাকে যা শেখানো হয় কেবল সেটাই পারে, ওই শেখানো দিয়ে নতুন কিছু করতে পারে না। 
 
যেসব মেধাবীরা সৃজনশীল তারা একই সঙ্গে প্রতিভাধরও, কারণ সৃজনশীলতাই হচ্ছে আসল মেধাত্ব। সারা পৃথিবীর প্রসিদ্ধ জ্ঞানী-বিজ্ঞানী আর কবিসাহিত্যিকদের দিকে তাকালে বোঝা যায়, মেধাবীরা অর্থাৎ ভালো নাম্বরদারীরা নয়, বরং প্রতিভাধরেরাই পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ আবিষ্কারসমূহ করেছেন। নিউটন-আইনস্টাইন, এডিসন, জগদীশচন্দ্র প্রমুখ বিজ্ঞানীগণ স্মরণশক্তিতে এতই দুর্বল ছিলেন যে, নিজের বাড়ির ঠিকানা, স্ত্রীর নাম, সন্তানের চেহারা, মেয়ের বিয়ের তারিখ পর্যন্ত মনে রাখতে পারতেন না। নিউটন তো ‘নয় পাঁচে’ কত তার হিসাব কষতেই ঘেমে যেতেন; বলতেন- এত কঠিন হিসাব আমি কীভাবে করব?  তারা মেধাবী নন, প্রতিভাধর। বিশ্বখ্যাত সৃজনশীলদের ৮৯.৭ ভাগই ছাত্র হিসেবে ভালো ছিলেন না, তাঁদের স্মরণশক্তি ছিল দুর্বল। এই প্রসঙ্গে, নিউটন, আইনস্টাইন, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, আবদুল করিম সাহিত্য বিশারদ, আরজ আলী মাতুব্বর, এডিসন, মোহিতলাল মজুমদার এবং তেসলা-সহ আরো অনেকের কথা উল্লেখ করা যায়। বিশ্বখ্যাত বিজ্ঞানী গ্রেগর মেন্ডেল (Gregor Mendel), ডোনাল্ড জি হার্ডেন (Donald G. Harden), শ্রীনিভাস রামানুজান (Srinivasa Ramanujan) ও মাইকেল ফ্যারাডে (Michael Faraday) অশিক্ষিত ছিলেন। স্বশিক্ষায় ছিল তাদের বিশ্বপাল্টানো আবিষ্কারের মুল।
অর্থ বিশ্লেষণে দেখা যায়, প্রতিভামেধা সমার্থক শব্দ নয়। যদি (১) নম্বর বাক্য পরিবর্তন করে লেখা হয় : ভাষা মানুষের মেধার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। তা ঠিক হবে না। পশু-পাখিরও মেধা থাকতে পারে, কিন্তু প্রতিভা থাকা অবিশ্বাস্য। যেমন : পশুপাখির চিৎকার ইঙ্গিতবাহী বা অনুধাবনযোগ্য হলেও ভাষা নয়। কারণ তাদের ইঙ্গিতে সৃজনশীল কিছু নেই, কেবল স্মরণশক্তিই কাজ করে। এর বাইরে সে যেতে পারে না। উপরের আলোচনা হতে বলতে পারি, সংকীর্ণ বিবেচনায় বুদ্ধিমান, প্রতিভাধর আর মেধাবী সমার্থক, কিন্তু কার্যকরণগত তফাত যোজন যোজন। অনেকে আটপৌরে কথায় প্রতিভা আর মেধাকে সমার্থক বলললে তা আদৌ ঠিক নয়।
তাহলে প্রতিভা ও মেধার কার্যকরণগত পার্থক্য কী?
এককথায়, “মেধাবীরা সমস্যার সমাধান করে, প্রতিভাবানেরা ওই সমস্যাকে প্রতিহত করে।” আমার মতে এটাই উভয় শব্দের কার্যকরণগত পার্থক্য। ভবনে অগ্নিকাণ্ডের আগমন বন্ধ করা মেধাবীর কাজ, কিন্তু অগ্নিকাণ্ড যাতে আঘাত না করে তা ভবন নির্মাণের সময় থেকে প্রতিহত করার কৌশল দিয়ে অগ্রসর হওয়া মেধাবীর কাজ। অতএব, মেধাবী উত্তম না কি প্রতিভাধর – এই প্রশ্নে না গিয়ে ভাবুন, দুটোই আমাদের প্রয়োজন। তবে প্রতিভার শক্তি মেধাবীদের প্রয়াসকে আরো কার্যকর এবং শানিত করে তোলে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!