ভাইভা : সঠিক উত্তর কোনটি?

ড. মোহাম্মদ আমীন
এক ভাইভার কথা।আমি বোর্ডের সদস্য। ভাইভা দিচ্ছি না, নিচ্ছি। আমি ভাইভা দিয়ে এসেছি, এখন আর দিতে হয় না, নিতে হয়। এক প্রার্থী ঢুকে সালাম দিলেন।চৌকশ প্রার্থীর চেহারায় বুদ্ধিমত্তা আর আত্মবিশ্বাস, তিনি বুয়েটের ইঞ্জিনিয়ার। প্রথমে বোর্ডের চেয়ারম্যান সাহেব শুরু করলেন প্রশ্ন। ভালোই করলেন প্রার্থী, চমৎকার উত্তর দিলেন প্রতিটি প্রশ্নের। আমিও কয়েকটি প্রশ্ন করলাম। উত্তর শুনে সন্তুষ্ট হলাম। আমার প্রশ্ন শেষ হওয়ার পর অন্য এক সদস্য (মনে করুন তার নাম রাশেদ) বললেন, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নাম কী বলুন তো?
প্রার্থী বললেন, শেখ হাসিনা।
রাশেদ সাহেব বললেন, তুমি ভদ্রতা জানো না। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নাম ‘মাননীয় শেখ হাসিনা’। শ্রদ্ধাভাজনের নাম বলার সময় নামের পূর্বে শ্রদ্ধাজ্ঞাপক পদ বলতে হয়। তুমি এটাও জানো না? ইঞ্জিনিয়ার হলে হবে না, ভদ্রতাও জানতে হবে।
প্রার্থী চলে যাবার পর আমি রাশেদ সাহেবকে বললাম, আপনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নাম জানতে চেয়েছেন। প্রার্থী ঠিকই বলেছেন। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নাম, ‘‘শেখ হাসিনা’’, আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নাম ‘‘মাননীয় শেখা হাসিনা’’ নয়। গেজেটেও তাঁর নাম, ‘‘শেখ হাসিনা’’, নামের আগে ‘মাননীয় নেই।
সদস্য বললেন, না-থাকলেও বলতে হয়। আমিও বলি।
বিনয়ের সঙ্গে বললাম, আমিও বলি। এটি প্রধানমন্ত্রীকে কোনো বিষয়ে উপস্থাপনের সময় বলা হয়। নাম জানার ক্ষেত্রে নয়।তাহলে তো তাঁর নাম শুদ্ধ বলা হবে না। এক একজন একেকভাবে বলতে পারেন। 
যেমন?
কেউ বলতে পারেন, শ্রদ্ধাভাজন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, শ্রদ্ধাভাজনাসু শেখ হাসিনা, মাননীয়া শেখ হাসিনা প্রভৃতি।
০০০
এই ঘটনার কিছুদিন পর আর এক ভাইভা বোর্ড। রাশেদ সাহেবও আছেন। তবে চেয়ারম্যান অন্য একজন। জামাল (ছদ্মনাম) নামের অন্য এক সদস্য আগত প্রার্থীকে প্রশ্ন করলেন, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম কী?
প্রার্থী বললেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।
হয়নি। আপনি বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নামটা পর্যন্ত জানেন না।
হতভম্ব প্রার্থী চঞ্চল চোখে প্রশ্নকারী সদস্যের দিকে জিজ্ঞাসুদৃষ্টিতে চেয়ে রইলেন।
কয়েক সেকেন্ড পর জামাল সাহেব বললেন, বাংলাদেশের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নাম ‘শেখ হাসিনা’।
প্রার্থী চলে যাওয়ার পর আমি ওই প্রশ্নকারী সদস্যকে বিনয়ের সঙ্গে বললাম, জনাব শেখ হাসিনা, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী নন।
তাহলে?
তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী।
সদস্য মুচকি হেসে বললেন, বাংলাদেশ সরকার আর বাংলাদেশ একই কথা।
আমি আর কিছু বললাম না।
আর এক প্রার্থী এল। সবার প্রশ্ন করা শেষ হবার পর আমি বললাম, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাংবিধানিক নাম কী?
প্রার্থী বলল, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়
হয়নি। আচ্ছা বলুন তো- মহামান্য রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সাংবিধানিক নাম কী?
প্রার্থী বললেন, মহামান্য রাষ্ট্রপতির কার্যালয়
“হয়নি”, রাশেদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে কটাক্ষ স্বরে বললাম,  “আপনি এই সহজ প্রশ্নের উত্তরটা দিতে পারলেন না। রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের সাংবিধানিক নাম ‘‘রাষ্ট্রপতির কার্যালয়’’ এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সাংবিধানিক নাম “প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়”। কার্যালয়ের নামের আগে কখনো মাননীয় বা শ্রদ্ধাজ্ঞাপক পদ বসানো হয় না।
আমার কথা শেষ হওয়ার পর প্রার্থী অতি বিনয়ের সঙ্গে কয়েকটা নজির দিয়ে বললেন, স্যার, সরকারি বিভিন্ন বিজ্ঞাপনে লেখা হয় “মহামান্য রাষ্ট্রপতির কার্যালয়”, ‘‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়”। অধিকন্তু, অনেক মন্ত্রী এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকেও নানা বক্তব্যে ‘‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়’’ বলতে শুনেছি। কিন্তু এখানে এসে আমি দোটানায় পড়ে গেছি। কোনটা শুদ্ধ হবে?
প্রার্থী চলে যাবার পর চেয়ারম্যান সাহেবকে বললাম, প্রার্থীদের উপর এমন স্বেচ্ছাচার কতদিন চলবে?
যারা ভাইভা নেন তারা যতদিন সংশ্লিষ্ট বিষয়ে প্রাজ্ঞ না হন ততদিন।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!