ভুটান : বাংলাদেশকে স্বীকৃতিপ্রদানকারী প্রথম দেশ

দক্ষিণ এশিয়ার দুটি প্রতিবেশি দেশ ভুটান ও ভারত ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বাধীন এবং সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করে। দুটো দেশ একই দিন বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ায় একটি বিষয় প্রায়শ বিতর্কে এসে যায়, কোন দেশটি বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে- ভুটান না ভারত? পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশকে ভুটানের স্বীকৃতি প্রদানের আনুষ্ঠানিক খবর তারবার্তার মাধ্যমে মুজিবনগর সরকারের কাছে পৌঁছার কয়েক ঘণ্টা পর আর একটি তারবার্তার মাধ্যমে ভারত, বাংলাদেশকে দ্বিতীয় রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি প্রদান করে। বিভিন্ন তথ্য ও দাপ্তরিক প্রমাণক হতে জানা যায়, ভুটান ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর অনুমান সকাল দশ ঘটিকায় এবং ভারত ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর সকাল অনুমান ১১.০০-১১.৩০ ঘটিকায় বাংলাদেশকে তারবার্তার মাধ্যমে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবগত করায়।

কুটনীতিক ও মন্ত্রী মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদের সঙ্গে।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বরে ভারত সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয় বাংলাদেশ সম্পর্কে কূটনৈতিক স্বীকৃতি। “বেলা এগারোটার সময় ‘অল ইন্ডিয়া রেডিও’ মারফত ঘোষণা করা হয় যে, ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ভারতের পার্লামেন্টের বিশেষ অধিবেশনে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের প্রস্তাব উত্থাপন করে ইন্দিরা গান্ধী বলেন, “বাংলাদেশের সব মানুষের ঐক্যবদ্ধ বিদ্রোহ এবং সেই সংগ্রামের সাফল্য এটা ক্রমান্বয়ে স্পষ্ট করে তুলেছে যে তথাকথিত মাতৃরাষ্ট্র পাকিস্তান বাংলাদেশের মানুষকে স্বীয় নিয়ন্ত্রণে ফিরিয়ে আনতে সম্পূর্ণ অসমর্থ। বাংলাদেশ সরকারের বৈধতা সম্পর্কে বলা যায়, গোটা বিশ্ব এখন সচেতন যে তারা জনগণের বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায়, জনগণকে প্রতিনিধিত্বকারী অনেক সরকারই যেমনটা দাবি করতে পারবে না। গভর্নর মরিসের প্রতি জেফারসনের বহু খ্যাত উক্তি অনুসারে বাংলাদেশের সরকার সমর্থিত হচ্ছে ‘পরিপূর্ণভাবে প্রকাশিত জাতির আকাঙ্ক্ষা বা উইল অব দ্য নেশন’ দ্বারা। এই বিচারে পাকিস্তানের সামরিক সরকার, যাদের তোষণ করতে অনেক দেশই বিশেষ উদগ্রীব, তারা এমনকি পশ্চিম পাকিস্তানের জনগণেরও প্রতিনিধিত্ব করে না।” লোকসভায় ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আরও বলেছিলেন, ‘‘স্বাধীনতা আন্দোলনের ইতিহাসে বিশাল বাধার বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণের সংগ্রাম এক নতুন অধ্যায় রচনা করেছে। সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করার পর ভারত সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং তা আজই বাংলাদেশের প্রবাসী সরকারকে জ্ঞাত করা হবে।” কিন্তু, এই ঘোষণার এক ঘণ্টা আগে ভুটানের স্বীকৃতি মুজিবনগর সরকারের কাছে পৌঁছে যায়।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৪ঠা ডিসেম্বর বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি প্রদানের জন্য বাংলাদেশের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ যুগ্মভাবে ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীকে অনুরোধ জানিয়ে একটি পত্র প্রেরণ করেন। বাংলাদেশ সরকারের ৪ঠা ডিসেম্বরের পত্রের জবাবে ইন্দিরা গান্ধী বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদকে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়ে যে পত্র প্রেরণ করেন তার আংশিক বঙ্গানুবাদ নিম্নরূপ :

সত্যের জয় হোক।  প্রধানমন্ত্রী নয়াদিল্লি ডিসেম্বর ৬, ১৯৭১

প্রিয় প্রধানমন্ত্রী,

মহামান্য অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম ও আপনি ৪ঠা ডিসেম্বর আমাকে যে পত্র প্রেরণ করেছেন তাতে আমি ও ভারত সরকারের আমার সহকর্মীবৃন্দ গভীরভাবে অভিভূত হয়েছি। এই পত্র পাবার পর আপনার বিচক্ষণ নেতৃত্বে পরিচালিত গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রতি স্বীকৃতি প্রদানের অনুরোধ ভারত সরকার পুনরায় বিবেচনা করেছে। আমি সানন্দে জানাই যে, বর্তমানে বিরাজিত পরিস্থিতির আলোকে ভারত সরকার স্বীকৃতি অনুমোদনের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। আমি একটি অনুলিপি সংযুক্ত করছি।

আপনার বিশ্বস্ত

ইন্দিরা গান্ধী।”

১৯৭২ সালের ৬ ডিসেম্বর দৈনিক বাংলা পত্রিকায় তাজউদ্দিন আহমদের একটি সাক্ষাৎকার প্রকাশিত হয়। সেখানে তিনি বলেছেন: ‘‘বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের অনুরোধ জানিয়ে ১৯৭১ সালের ১৫ অক্টোবর প্রথম শ্রীমতি ইন্দিরা গান্ধীকে চিঠি লিখি। এরপর ২৩ নভেম্বর আর একখানা চিঠি দিই। ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের ঘোষিত যুদ্ধের আগের দিন ২ ডিসেম্বর এবং পরের দিন ৪ ডিসেম্বর ভারতীয় প্রধানমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছি। ৬ ডিসেম্বর বেলা ১১টায় ভারতীয় পার্লামেন্ট বাংলাদেশকে স্বীকৃতিদানের কথা ঘোষণা করার পর শ্রীমতি ইন্দিরা আমাকে একখানা আনুষ্ঠানিক চিঠি দেন। ৭ ডিসেম্বর মঙ্গলবার বিকেল সোয়া তিনটায় মুজিবনগরে সেই চিঠি আমার হাতে এসে পৌঁছেছে।’’ অর্থাৎ চারটি পত্র লেখার পর ভারত সরকার বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি প্রকাশিত “বাংলাদেশ-ভারত মৈত্রী : কালের কষ্টিপাথরে উত্তীর্ণ” শীর্ষক একটি প্রবন্ধে  মুনতাসীর মামুনের লেখা একটি প্রতিবেদনে বলা হয়, “৬ ডিসেম্বর আকাশবাণীর খবরে জানা গেল ভুটান আগে (বাংলাদেশ) স্বীকৃতি দিয়েছে, তার পরপরই ভারত। পরে অবশ্য জানা গেল ভারত আগে স্বীকৃতি দিয়েছে, তারপর ভুটান। ৭ ডিসেম্বর ভারত থেকে প্রকাশিত সব খবরের কাগজে তাই বলা আছে।” ভারতীয় পত্রপত্রিকা ছাড়াও মুজিবনগর সরকারের কিছু দলিলও বিতর্কে ইন্ধন সৃষ্টি করেছে। মুজিবনগর সরকারের দলিলপত্র, স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র এবং বাংলাদেশ ডকুমেন্টস- এ তিন স্থানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশকে ভারত প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে। এতে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের দেওয়া বেতার ভাষণকে উদ্ধৃত করা হয়। এই ভাষণে তাজউদ্দীন আহমদ বলেছেন, “ভারতের জনসাধারণ অনেক আগেই আমাদের স্বীকৃতি দিয়েছেন তাদের অন্তরে। এখন তাদের সরকার গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশকে আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি জানিয়েছেন। … ভারতের পর ভুটান স্বীকৃতি দিয়েছে বাংলাদেশকে। এর জন্য ভুটানের রাজা ও জনসাধারণের নিকট কৃতজ্ঞ।” ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৮ই ডিসেম্বর মুজিবনগর সরকারের আন্তর্জাতিক প্রকাশনা ‘বাংলাদেশ’-এর প্রথম বর্ষ ২৪তম সংখ্যায়ও মুখ্য সংবাদ ছিল- “ভারত বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে।” এই সংবাদের বক্স আইটেমে লেখা হয়েছিল, “ভারতের পর ভুটান দ্বিতীয় দেশ হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে।” ‘লন্ডন টাইমস’ পত্রিকায় প্রকাশিত একটি খবরে বলা হয়েছে, “ভুটান ৭ই ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে।” এ সংবাদটি প্রমাণ করে, স্বীকৃতির এ বিষয় নিয়ে পত্রিকার খবর কত বিভ্রান্তমূলক ছিল। মুজিবনগর সরকারের এক তথ্যে বলা হয়, “১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৫ই ডিসেম্বর ভারত, বাংলাদেশ সরকারকে জানায়- পরদিন স্বীকৃতি আসছে।” ভারতীয় পার্লামেন্টের এ ঘোষণার পরপরই সেখানে উপস্থিত বিশেষ প্রতিনিধি হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী বাংলাদেশ সরকার এবং বাংলাদেশের জনগণের পক্ষে ইন্দিরা গান্ধীকে ফুলের মালা পরিয়ে দিয়ে ও কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। অনেকে মনে করেন, এই ঘোষণাটিই ভারতকে প্রথম স্বীকৃতিদানকারী দেশ হিসেবে চিহ্নিত করার একটি কারণ। প্রকৃতপক্ষে, স্বীকৃতি মৌখিক বিষয় নয়, সম্পূর্ণ আনুষ্ঠানিক। মূলত এ কয়েকটি প্রতিবেদন ও ভাষ্যই বাংলাদেশের প্রথম স্বীকৃতিদাতা দেশ নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টির অন্যতম কারণ। কিন্তু, কেন এমন বিতর্ক?

স্বীকৃতি বিষয়ে ভুটানের মন্ত্রীর সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলাপ।

আসলে, ভারতের স্বীকৃতি ছিল বাংলাদেশের জন্য অত্যধিক গুরুত্বপুর্ণ ছিল। এই গুরুত্ব বাংলাদেশের জন্য এত উচ্ছ্বাস ও আবেগময় ছিল যে, ভুটানের স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টি তৎকালীন প্রবাসী সরকারের কাছেও ভারতের গুরুত্বপূর্ণ স্বীকৃতির নিচে চাপা পড়ে নেহাত গুরুত্বহীন হয়ে যায়। অন্যদিকে, ভারত বৃহৎ রাষ্ট্র বলে ভারতের স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টি ভারত-সহ বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় যে গুরুত্ব পেয়েছে ভুটানের স্বীকৃতি তেমন পায়নি। অধিকন্তু, একই দিন ভুটানের স্বীকৃতি প্রদানের খবরটি কেবল ভুটান আর প্রবাসী সরকারের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল, পরদিন ভুটানিজ পত্রিকায় খবরটি ছাপা হলেও তা ভারতে বহুল প্রচারের কোনো সুযোগ ছিল না। তাই ভুটানের স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টি অতি সংশ্লিষ্ট ছাড়া সবার কাছে অজ্ঞাত থেকে যায়। ভারতের সিংহভাগ লোকই এটি জানতে পারেনি। তদুপরি, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় ভারতকে প্রথম স্বীকৃতি দানকারী দেশ হিসেবে প্রচার করায়, মুজিবনগর সরকারও সেভাবে বিবৃতি দিতে অনুপ্রাণিত হওয়ার ছাড়া পরিস্থিতিগত কারণে অন্য কোনো উপায় ছিল না। মুজিবনগর সরকারও বিষয়টিকে তেমন গুরুত্ব দিয়ে দেখার সুযোগ পায়নি। অন্যদিকে  ভারতের স্বীকৃতি প্রদানের খবর দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এজন্য অনেক পত্রিকা উল্লেখ করে বসে যে, ভারতই বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে, আসলে তারা জানত না যে, ভুটান একই দিন ভারতের আগেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়ে বসেছে। এবার দেখা যাক, আসলে কোন দেশটি বাংলাদেশকে প্রথম আনুষ্ঠানিকভাবে স্বীকৃতি প্রদান করেছে। এবার তথ্য প্রমাণ দিয়ে বিশ্লেষণ করা যাক, কোন দেশ বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে।

ভুটান-ভারতের স্বীকৃতি প্রসঙ্গে প্রবাসে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টির সংগঠক সাবেক প্রধান বিচারপতি এবিএম খায়রুল হক বলেন, “লন্ডনে থাকলেও আমরা প্রতিদিনই যুদ্ধের প্রতিমুহূর্তের খবর জানতে উদগ্রীব ছিলাম। তখন নিয়মিত রাশিয়ার ট্রানজিস্টার অ্যাস্টার্ড অ্যারিগ্যায় বিবিসি-১ ও ২-এর খবর শুনতাম। পাশাপাশি আইটিভি এবং আইটিএন চ্যানেলেও খবর দেখতাম। নির্দিষ্ট এ চ্যানেল ও স্টেশনগুলো মুক্তিযুদ্ধের খবর গুরুত্বের সঙ্গে প্রচার করত। তেমনি একদিন শুনলাম, ভুটান বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে স্বীকৃতি দিয়েছে। তখন সবাই উল্লসিত হয়ে উঠি। কিছু পরে ভারতও স্বীকৃতি দিয়েছে- এমন খবর পাওয়ার পর বুঝতে পারি; বিজয় সন্নিকটে।” আবদুল গাফফার চৌধুরী এক অডিও বক্তব্যে বলেছেন, “ভুটান ভারতের আগে স্বীকৃতি দিয়েছে।” প্রাক্তন –কুটনীতিক ও আইসিটি মন্ত্রী মোস্তফা ফারুক মোহাম্মদ বলেছেন, “তারবার্তার তারিখ ও সময় অনুযায়ী বলতে হয়, ভুটানই বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে, ভারত দ্বিতীয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কাছে যেসব দলিল সংরক্ষিত আছে, তাতেও দেখা যায়, ভুটানেই বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে।”

দীর্ঘদিন বাংলাদেশের স্বীকৃতিদাতা প্রথম দেশ হিসেবে ভারতের নামই ছিল অধিকাংশের কাছে গ্রহণযোগ্য। এ প্রসঙ্গে ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের ২০ শে এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভুটান সফরে প্রকাশিত বাংলাদেশ-ভুটান যৌথ বিবৃতি প্রণিধানযোগ্য। বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, “বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর ভুটান বাংলাদেশকে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছেন বলে স্মরণ করেন।”

২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর ভুটানের তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে বাংলাদেশ সফরে এলে এ বিষয়ে সরকারের কাছে নতুন তথ্য উঠে আসে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে এক বৈঠকে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগে বাংলাদেশকে স্বীকৃতির প্রশ্নে দেশটির দালিলিক তথ্য-প্রমাণ ও স্বীকৃতি প্রদানের তারবার্তা প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন। এতে দেখা যায়, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর ভুটানের তৎকালীন রাজা জিগমে দর্জি ওয়াংচুক এক তারবার্তায় স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশকে স্বীকৃতি জানিয়ে বলেছিলেন, “বিদেশি দখলদার বাহিনীর বিরুদ্ধে স্বাধীনতা অর্জনের জন্য বাংলাদেশের জনগণের মহান এবং বীরত্বপূর্ণ সংগ্রাম অদূর ভবিষ্যতে সাফল্য লাভ করবে। ভুটানের জনগণ এবং তাঁর প্রত্যাশা, সৃষ্টিকর্তা বর্তমান বিপদ থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করবেন, যাতে তিনি দেশের পুনর্গঠন এবং উন্নয়নের মহান কর্তব্যে দেশ ও দেশের মানুষকে নেতৃত্ব দিতে পারেন।` এর পর  ৯ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভুটানকে প্রথম স্বীকৃতিদাতা দেশ হিসেবে ঘোষণা দেয় । একান্ত আলাপ শেষে দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের শুরুতে শেখ হাসিনা বলেন, “ভুটান সব সময় আমাদের হৃদয়ে বিশেষ স্থান অধিকার করে আছে। কেননা, প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর  ভুটান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেয়।’ মূলত ওই দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখার জন্যই শেখ হাসিনা ৬ই ডিসেম্বরকে বাংলাদেশে ভুটানের প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতির জন্য বেছে নেন।

বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দেওয়ায় ভুটানকে হাসিনার ধন্যবাদ।

১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর সকাল ১০টার দিকে ভুটান সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিকভাবে বাংলাদেশ সম্পর্কে ভুটানের কূটনৈতিক এই স্বীকৃতির কথা জানানো হয়। একই দিন সকাল ১১-১১.৩০ টায় ভারত বাংলাদেশকে তার স্বীকৃতির কথা জানায়। অনেকে মনে করেন, ভারতই বাংলাদেশকে প্রথমে স্বীকৃতি দিয়েছে। তা আদৌ ঠিক নয়। ভারত সরকার কখনও বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি প্রদানের বিষয়টি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ কোনোভাবে দাবি করেনি।  টাইমস অফ ইন্ডিয়ার ভাষ্য, “Bhutan, not India, was first to recognize Bangladesh – Times of India.”, অর্থাৎ, ভারত নয়, ভুটানই বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের ২০ শে এপ্রিল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভুটান সফরে প্রকাশিত বাংলাদেশ-ভুটান যৌথ বিবৃতিতে শেখ হাসিনা স্বীকার করেন যে, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর ভুটান বাংলাদেশকে সর্বপ্রথম আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দর ৬ই ডিসেম্বর প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় গণভবনে বাংলাদেশ ও ভুটানের দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকের আগে ভুটানের প্রধানমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রী শেরিং তোবগেশেখ শেখ হাসিনার হাতে বাংলাদেশকে দেওয়া ভুটানের স্বীকৃতির তারবার্তাটি তুলে দেন । তাতে দেখা যায়, ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর ভুটান ভারতের আগেই বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশের পররাষ্ট্রসচিব মো. শহীদুল হক বলেছেন, ভুটানই বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়রি মাসে জাতীয় সংসদে জানান, বাংলাদেশকে স্বাধীন রাষ্ট্র হিসাবে সর্বপ্রথম ভুটান স্বীকৃতি দেয়। তবে, ভুটান এবং ভারত উভয় দেশই বাংলাদেশকে ৬ ডিসেম্বর ১৯৭১ সালে স্বীকৃতি দিয়েছে। ইত্যাদি বিবেচনা এটি দালিলিকভাবে সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত যে, `ভুটান প্রথম রাষ্ট্র হিসেবে ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ৬ই ডিসেম্বর বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দিয়েছে। এ নিয়ে এখন আর কোনো বিভ্রান্তি নেই।` এখন ভুটান যে বাংলাদেশকে প্রথম স্বীকৃতি দিয়েছে, তা সরকারিভাবে গৃহিত। ২০১৪ খ্রিষ্টাব্দের  ৯ই ডিসেম্বর বাংলাদেশ সরকার আনুষ্ঠানিকভাবে ভুটানকে প্রথম স্বীকৃতিদাতা দেশ হিসেবে ঘোষণা দেয় ।

(অক্সফোর্ড থেকে)

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!