বাজেট : লাল ব্রিফ কালো হলো যেভাবে

ড. মোহাম্মদ আমীন
: আপনার নিষ্ঠা আর দেশপ্রেমে আমি মুগ্ধ। উত্তরণে আনন্দিত।
: এক্সিলেন্সি, আমি কৃতজ্ঞ, শ্রদ্ধায় আনত।আপনার সমর্থন আমার পাথেয়। : : : : আপনার আচরণ আর সততা অতি উত্তম। সিদ্ধান্ত গ্রহণে প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব মুগ্ধকর। আপনি, আজ আমার সাম্রাজ্যের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ “চ্যান্সেলর অব এক্সচেকার’ পদে অধিষ্ঠিত হলেন। স্বাগত এবং অভিনন্দন।

মহারানি ভিক্টোরিয়ার কথায় সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত “চ্যান্সেলর অব এক্সচেকার” উইলিয়াম ইওয়ার্ট গ্ল্যাডস্টোন অভিভূত। আনত চোখে কৃতজ্ঞতা ঢেলে বিনীত গলায় বললেন, মহানুভব মহারানি, আমার প্রতি আপনার আস্থাকে আমি জীবনের মতো যত্নে লালন করব। গড়ে তুলব সন্তানের মতো পরম মমতায়; শ্রদ্ধা করব মহীয়ান পূর্বপুরুষদের প্রদত্ত নৈবদ্যের মতো পরম আভিজাত্যে– আমার জাতীয় সংগীতের মতো নিবিড় ভালোবাসায় :

“God save our gracious Queen!
Long live our noble Queen!
God save the Queen! ”
মহারানি ভিক্টোরিয়া একটা লাল ব্রিফকেস গ্ল্যাডস্টোনের হাতে দিয়ে বললেন, এটি আপনাকে নয়, “চ্যান্সেলর অব এক্সচেকার”কে দিলাম।
হালকা লাল রঙের ব্রিফকেসটির উপর মহারানির সোনালি রঙের রাজকীয় প্রতীক ঝকঝক করছে মহিমান্বিত ঔজ্জ্বল্যে।
প্রমিতা বলল, এটা কয় তারিখের ঘটনা?
: ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ শে এপ্রিল, রাত ৮.০০ টা।
অনুসিন্থিয়া বললেন, গ্ল্যাডস্টোন কোথায় এবং কখন জন্মগ্রহণ করেছেন?
: ১৮০৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ শে ডিসেম্বর লিভারপুলের ৬২ রডনি স্ট্রিটে। মারা যান ১৮৯৮ খ্রিষ্টাব্দের ১৯ শে মে ওয়েলসে।
মহারানি ভিক্টোরিয়ার আসল নাম কী? প্রমিতা জানতে চাইল।
: আলেকজান্দ্রিনা ভিক্টোরিয়া। তিনি ১৮১৯ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ শে মে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৮৩৭ খ্রিষ্টাব্দের ২০ শে জুন থেকে ১৯০১ খ্রিষ্টাব্দের ২২ শে জানুয়ারি মৃত্যুর দিন পর্যন্ত মোট ৬৩ বছর ২১৭ দিন ব্রিটেনের রানি ছিলেন।
চ্যান্সেলর অব এক্সচেকার কী? অনুসিন্থিয়া বলল।
: আমরা যাকে অর্থমন্ত্রী বলি, তিনিই “চ্যান্সেলর অব এক্সচেকার”।
আর একটা কথা, গ্ল্যাডস্টোন ১৮৮০ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ শে এপ্রিল থেকে ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর পর্যন্ত তিন বছর অর্থমন্ত্রী ছিলেন। প্রতিবারই তিনি মহারানির দেওয়া লাল ব্রিফকেসে বাজেটের কাগজপত্র ভরে সংসদে গেছেন।
তাঁর পর কে অর্থমন্ত্রী হলেন? প্রমিতা বলল।
: হাগ চাইল্ডার্স। তিনি ১৮৮২ খ্রিষ্টাব্দের ১৬ই ডিসেম্বর থেকে ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ৯ই জুন পর্য়ন্ত তিন বছর অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনিও গ্ল্যাডস্টোনের লাল বিফ্রকেস নিয়ে সংসদে গেছেন বাজেট বক্তৃতা দিতে। এরপর অর্থমন্ত্রী হলেন মিখাইল হিক্স বিচ। হিক্স, ১৮৮৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৪ শে জুন থেকে ১৮৮৬ খ্রিষ্টাব্দের ২৮ শে জানুয়ারি পর্যন্ত অর্থমন্ত্রী ছিলেন। তিনিও বাজেট বক্তৃতায় যাওয়ার সময় গ্ল্যাডস্টোনের লাল ব্রিফকেস নিয়ে গেছেন। তারপর অর্থমন্ত্রী হলেন স্যার উইলিয়াম হ্যারকোর্ট । তিনি ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দের ১৮ই অগাস্ট থেকে ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ২১ শে জুন পর্যন্ত একই ব্রিফকেস নিয়ে বাজেট বক্তৃতা দিতে গিয়েছেন। হ্যারকোর্ট এর পর ১৮৯৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৯ জুন থেকে ১৯০২ খ্রিষ্টাব্দের ১১ই অগাস্ট পর্যন্ত হিক্স বিচ আবার অর্থমন্ত্রীর দায়িত্ব পান। তিনি আট বারই গ্ল্যাডস্টোনের লাল ব্রিফকেস নিয়ে বাজেট বক্তৃত দিতে গেছেন।এরপরের অর্থমন্ত্রীরাও একই ব্রিফকেস নিয়ে বাজেট বক্তৃতায় গেছেন। এভাবে এই ব্রিফকেসটি নিয়ে বাজেট বক্তৃতা-প্রদান ঐতিহ্য ও আচরণ প্রিয় ব্রিটেনবাসীর অনিবার্য ঐতিহ্য হয়ে গেল।
গ্ল্যাডস্টোনের কী হলো? অনুসিন্থিয়া প্রশ্ন করলেন।
গ্ল্যাডস্টোন ১৮৯২ খ্রিষ্টাব্দের ১৫ই অগাস্ট থেকে ১৮৯৪ খ্রিষ্টাব্দের ২রা মার্চ পর্যন্ত বারো বছর ব্রিটেনের প্রধানমন্ত্রী ছিলেন। বলা হয়, লাল ব্রিফকেসের ভাগ্যে তাঁর এত বছর প্রধানমন্ত্রী থাকার সৌভাগ্য হয়েছে।
কিন্তু এটা তো লাল ব্রিফকেস; এখন কালো ব্রিফকেস নিয়ে যায় কেন?
: কয়েক যুগ ব্যবহারের কারণে লাল রঙ উঠে কালো হয়ে গেল।
রানির দেওয়া লাল ব্যাগও কালো হয়ে গেল? প্রমিতা বিস্ময় দিয়ে প্রশ্ন করলেন।
: রানিও তত দিনে বুড়ি হয়ে গেছেন। শরীরের জৌলুশ লাল ব্রিফেকেসের আবরণের মতো ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
অনুসিন্থিয়া বলল, এখন ওই ব্রিফকেসটি কোথায়?
: মনে হয়, ব্রিটেনের বর্তমান অর্থমন্ত্রীরাও ওই একই ব্রিফকেস নিয়ে বাজেট বক্তৃতা দিতে যান। ব্রিফকেসটি যত পুরানো হচ্ছিল, তত কালো হচ্ছিল, যত কালো হচ্ছিল, তত চকচক করছিল। এজন্যই বলা হয়, ওল্ড ইজ গোল্ড। আসলে, নতুন একটা ব্যাগ কিনে অযথা অর্থ খরচ করতে চাইনি তারা।
অনুসিন্থিয়া : আমরা কেন কালো ব্রিফকেস ব্যবহার করি? পৃথিবীর অনেক দেশে তো নানা রঙের ব্রিফকেস ব্যবহার করা হয়?
বিট্রেনের অর্থমন্ত্রী বাজেট বক্তৃতা দিতে যাচ্ছেন, ২০১৮।

আমি বললাম, প্রভুদের অনুকরণ। ব্রিটেনেও এখন বাজেট বক্তৃতায় কালো ব্যাগের পরিবর্তে নান রঙের ব্যাগ নিয়ে যাওয়া হয়।

প্রমিতা বলল, আপনি অর্থমন্ত্রী হলে কী রঙের ব্রিফকেস নিয়ে বাজেট বক্তৃতা দিতে যাবেন?
: কোনো ব্যাগই নেব না। কয়েকশ মাত্র পৃষ্ঠা, ওগুলো নিতে কি ব্রিফকেস লাগে? তাহলে তো আমাদের শিক্ষার্থীদের স্কুলে বই ভয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য মিনিট্রাক লাগবে, কী বলো?

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!