বোদা শব্দের অর্থ

ড. মোহাম্মদ আমীন
বোদা দেশি শব্দ।বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত বোদা শব্দের অর্থ স্বাদহীন, বিস্বাদ প্রভৃতি। এবং স্থান-নাম বিশ্লেষণে অর্থ পাওয়া যায় : জ্ঞানী, বোদ্ধা, পণ্ডিত, ঈশ্বর বোয়াল মাছ প্রভৃতি। এবার বোদা শব্দের স্থানিক নাম বিশ্লেষণ করা যাক।
বাংলাদেশের পঞ্চগড় জেলায় ‘বোদা’ নামের একটি উপজেলা রায়েছে। এর উত্তরে পঞ্চগড় সদর উপজেলা, দক্ষিণে ঠাকুরগাঁও সদর ও দেবীগঞ্জ উপজেলা, পূর্বে দেবীগঞ্জ উপজেলা, পশ্চিমে আটোয়ারী এবং পঞ্চগড় সদর উপজেলা। নাজিরগ, শালবাড়ি, মেয়েলিয়া, দৈখাতা ও ময়দানদিঘী ছিটমহলগুলো বোদায় ছিল। ভৌগোলিক অবস্থানই বলে দিচ্ছে বোদার গুরুত্ব।১৮৮৩ খ্রিষ্টাব্দে বোদা নামের গ্রামে বোদা থানা গঠিত হয়। ১৯৪৭ খ্রিষ্টাব্দে ভারত বিভাজনের পর বোদা থানাকে দিনাজপুর জেলার ঠাকুরগাঁও মহকুমার অন্তর্ভুক্ত করা হয়। ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দের ১লা ডিসেম্বর বোদা হানাদার বাহিনী মুক্ত হয়।প্রতিবছর এ দিন বোদা মুক্ত দিবস পালন করা হয়। ১৯৮৪ খ্রিষ্টাব্দে বোদা থানাকে পঞ্চগড় জেলার আওতাভুক্ত করে উপজেলায় উন্নীত করা হয়।
 
বোদা বেশ প্রাচীন জনপদ। করতোয়া, টাংগন, পাথরাজ নদী বিধৌত বোদা মৌর্য্য যুগেই (খ্রিষ্টপূর্ব ৩২০- খ্রিষ্টপূর্ব ১৮৫) সমৃদ্ধ জনপদ হিসেবে গড়ে উঠে। সম্রাট অশোকের (২৭৩ খ্রিষ্টপূর্ব – খ্রিষ্টপূর্ব ২৩২) আমলেই এটি বৌদ্ধপ্রধান এলাকায় পরিণত হয়। সেসময় এখানে বৌদ্ধদের একটি ছোটো প্যাগোডা বা বৌদ্ধবিহার প্রতিষ্ঠিত হয়। এই বিহারকে ঘিরে বৌদ্ধ ভিক্ষু ও সাধু-সন্ন্যাসীদের মিলনমেলা গড়ে উঠেছিল। বৌদ্ধ ভিক্ষুদের স্থানীয়ভাবে বোদ্ধা (জ্ঞানী) বলা হতো। তাই বৌদ্ধবিহারটি বোদ্ধা-বিহার; সংক্ষেপে বোদ্ধা নামে পরিচিতি লাভ করে। কথিত হয়, বোদ্ধা (জ্ঞানী) শব্দ থেকে স্থানটির নাম হয় বোদ্ধা, যা 

ক্রম পরিবর্তন ও বিকৃতির মাধ্যমে বোদা নামে স্থিতি পায়। এ বিবেচনায়, বোদা শব্দের স্থানিক ও আভিধানিক অর্থ বোদ্ধা, জ্ঞানী, পণ্ডিত প্রভৃতি। প্রসঙ্গত, এ উপজেলায় এখনো প্রায় ৫০০ শতের অধিক বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী রয়েছে।
 
অন্য একটি প্রবাদমতে, বর্তমানে বোদা নামে পরিচিত উপজেলার প্রাচীন নাম ছিল নগরকুমারী। বোদেশ্বরীর মন্দির প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর এর নাম হয় বোদেশ্বরী। যা থেকে বর্তমান বোদা নামের উদ্ভব। আবার অনেকে মনে করেন, বোদাল শব্দ থেকে বোদা শব্দের উদ্ভব। বোদাল অর্থ বোয়াল মাছ। একসময় এখানকার নদীতে প্রচুর বোয়াল মাছ পাওয়া যেত। তাই এলাকাটির নাম হয়, বোদাল, যার বিকৃত ও স্থানিক রূপ বোদা। সে হিসেবে বোদা শব্দের অর্থ- জ্ঞানী, বোদ্ধা, পণ্ডিত, ঈশ্বর বোয়াল মাছ, স্বাদহীন, বিস্বাদ প্রভৃতি। তবে, ইতিহাসবেত্তাদের কাছে শেষের প্রবাদ দুটির চেয়ে প্রথমটি অধিকতর গ্রাহ্য।
 
বোদা নাম শুনে অনেকে হাসাহাসি করে। তারা মনে করে, শব্দটি অশালীন। আমি জানি না, এমন তথ্য তারা কোথায় পেয়েছে। শব্দ কখনো অশালীন হতে পারে না। প্রত্যেক শব্দই আবশ্যক। যারা অর্থ না-জেনে বোদা বা অন্য কোনো শব্দকে অশালীন মনে করে হাসাহাসি করে, উপহাস করে- তারা আসলেই কুলাঙ্গার।
ধিক তাদের!
অর্থ না জেনে অন্য যেসব সব স্থানিক নাম নিয়ে উপহাস করা হয় তার কয়েকটি নিচে দেওয়া হলো :
১. চুমাচুমি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, রাঙ্গামাটি
২. সোনাপোতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, খুলনা
৩. মানুষমারা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, নীলফামারি
৪. সোনাকাটা ইউনিয়ন, তালতলী, বরগুনা
৫. বড়বালা ইউনিয়ন, মিঠাপুকুর, রংপুর
৬. সোনাখাড়া ইউনিয়ন, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ
৭. ধনকামড়া গ্রাম, ভোদামারা, দিনাজপুর
৮ .গোয়াকাটা, দোহার, ঢাকা
৯. গোয়াতলা, ময়মনসিংহ
১০.লেংটার হাট, মতলব, চাঁদপুর
১১. জাহাজমারা, নোয়াখালী, হাতিয়া
১২. মদন, নেত্রকোণা
১৩.  সোনাখাড়া, সিরাজগঞ্জ।
১৪. চুলকানি বাজার, হরিণাকুণ্ডু, ঝিনাইদহ।
১৫, শাওয়া পাড়া সিলেট।
১৬. গোয়াতলা, ময়মনসিংহ এবং আরো কয়েকটি জেলায় এ নামের জনপদ আছে।
নোয়াখালীর বেগমগঞ্জে আছে কানকির হাট, যা খানকির হাট নামে পরিচিত। গোয়াকাটা, চক আড়িয়াল বিলের একটা অংশের নাম যা ঢাকা জেলার দোহার উপজেলায় অবস্থিত।
——————-
সূত্র : ড. মোহাম্মদ আমীন;
বাংলাদেশের জেলা উপজেলা ও নদনদীর নামকরণের ইতিহাস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!