//

//

সোনাখাড়া শব্দের অর্থ

ড. মোহাম্মদ আমীন
সোনাখাড়া রাজশাহী বিভাগের সিরাজগঞ্জ জেলার রায়গঞ্জ উপজেলার একটি ইউনিয়ন (২নম্বর ইউনিয়ন)। এর উত্তরে ধামাইনগর ইউনিয়ন, দক্ষিণে ধুবিল ইউনিয়ন, পূর্বে চান্দাইকোনা ও ঘুড়কা ইউনিয়ন এবং পশ্চিমে তাড়াশ উপজেলার দেশীগ্রাম ইউনিয়ন অবস্থিত। আদিবাসী প্রধান সোনাখাড়া ইউনিয়নের আয়তন ১৫ বর্গ কিলোমিটার বা ৬৩৮২ একর। ১৯৯১ খ্রিষ্টাব্দের আদমশুমারি অনুযায়ী লোকসংখ্যা ১৭,৭৪১; তন্মধ্যে পুরুষ ৮৬৯৪ এবং নারী ৯১০৬ জন। ৫৮ একর আয়তনের জয়সাগর দিঘি সোনাখাড়া ইউনিয়নের দর্শনীয় স্থান।
সংস্কৃত ‘স্বর্ণ’ থেকে ‘সোনা’ শব্দের উদ্ভব। বিশেষ্যে সোনা শব্দের অর্থ স্বর্ণ, আদরের ধন, স্বর্গের ধন, প্রিয় সম্ভাষণ এবং বিশেষণে সোনালি রঙের। প্রিয়জনদের আদর করে ‘সোনা’ ডাকা হয়। সোনা শব্দের আর একটি অর্থ সমৃদ্ধি, ধনদৌলত, ধনের উৎস প্রভৃতি।
সংস্কৃত ‘অখণ্ড’ থেকে উদ্ভূত এবং বাক্যে বিশেষ্য রূপে ব্যবহৃত ‘খাঁড়া’ শব্দের অর্থ অসি, খড়গ, তরবারি, তরোয়াল প্রভৃতি। সংস্কৃত ‘স্থির’ থেকে উদ্ভূত ‘খাড়া’ শব্দের অর্থ বিশেষণে দণ্ডায়মান, পুরোপুরি বা একটানা, লম্ভভাবে অবস্থিত (খাড়া পাহাড়), অবশ্য প্রতিপাল্য (খাড়া হুকুম) এবং সর্বদা প্রস্তুত (সদা প্রস্তুত) প্রভৃতি। আবার, সোনাখাড়া একটি উন্নত মানের প্রাচীন ধান্যবিশেষ বলেও কথিত হয়। ধানের এ জাতটি ঝড়বৃষ্টিতেও মাথায় সোনা রঙের ধান নিয়ে দণ্ডায়মান থাকত। অতএব, সোনাখাড়া শব্দের অর্থ সোনার অসি, সোনার তরোয়াল, সোনা রঙের ধান, সমৃদ্ধ এলাকা, স্থিতিশীল সমৃদ্ধ জনপদ প্রভৃতি।
সোনাখাড়া নামের উদ্ভব নিয়ে একাধিক প্রবাদ প্রচলিত আছে। অনেকের অভিমত সোনাখাড়া হচ্ছে সোনাখাঁড়া নামের বিকৃত রূপ বা অপভ্রংশ। প্রসঙ্গত, সোনাখাঁড়া শব্দের অর্থ স্বর্ণের অসি, সোনার তৈরি তরবারি, সোনার তরোয়াল প্রভৃতি। সম্রাট ধর্মপাল (৭৭৪-৮০৬ খ্রিষ্টাব্দে)-এর সন্তান সম্রাট দেবপাল (৮০৬-৮৪৫)-এর ভ্রাতা মতান্তরে বাকপালের পুত্র জয়পাল (দশম শতক)-এর আমলে আঞ্চলিক শাসক বিরাট রাজা দিঘিটি খনন করে জয়পালের নামে ‘জয়সাগর’ দিঘি নাম দেন।জয়পাল সন্তুষ্ট হয়ে বিরাট রাজাকে সোনাখাঁড়া বা সোনার অসি উপহার দেন। ফলে এলাকাটির নাম হয় সোনাখাাঁড়া, যার ঔচ্চারণিক অপভ্রংশ সোনাখাড়াসোনাখাড়া ইউনিয়নের নিমগাছি ও গোতিথা মৌজায় জয়সাগর দীঘি অবস্থিত।
সোনাখাড়া নামকরণের দ্বিতীয় প্রবাদ ‘ধান্য’ প্রবাদ নামে খ্যাত। পূর্বে বর্ণিত সোনাখাড়া নামের উন্নত ধানজাত থেকে ‘সোনাখাড়া’ নামের উদ্ভব। এলাকায় এ জাতের ধানটির বহুল চাষ ছিল। তাই নাম হয় সোনাখাড়া। আবার অনেকের মতো, এলাকাটি ছিল স্থিতিশীল সমৃদ্ধির অধিকারী। অন্য এলাকায় যখন দুর্ভিক্ষ হতো তখনও এ এলাকার সমৃদ্ধি বরাবরের মতো স্থিতিশীল বা অক্ষুণ্ন (দণ্ডায়মান) থাকত। তাই এলাকাটি সোনাখাড়া নামে খ্যাত হয়।
প্রবাদ যেটিই সত্য হোক না কেন, সোনাখাড়া নাম যে স্থানটির সমৃদ্ধি ও প্রভাব থেকে উদ্ভূত, তা ওই এলাকা ভ্রমণে গেলে এখনো অনুধাবন করা যায়। সোনাখাড়া ইউনিয়নের জয়সাগর দিঘি দেখলে মনটা আসলেই সোনার মতো সোনালি প্রভায় স্নিগ্ধ হয়ে উঠে।
Share This

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language