//

//

মা-জননীর সব দোষ, বাবা-শালা নন্দঘোষ

যদিও পৃথক হয় মায়ের কারণ :
 
ছোটোবেলার কথা। গ্রামে অনেকের বাড়ির ভিতর দেওয়ালে লটকানো দেখতাম কাপড়ের উপর কাচের আবরণ দিয়ে লেখা দুটো লাইন :
“ ভাই বড়ো ধন, রক্তের বাঁধন
যদিও পৃথক হয় নারীর কারণ।”
কবি এমন কেন লিখেছেন? নারী আবার ভাইয়ে এসে কী করল?
দাদা আহমদ হোসেন বীরপ্রতীক বলেছিলেন, বিয়ের পর বউয়ের প্ররোচনা, মানে নারীর কারণে ভাইয়ে-ভাইয়ে ঝগড়া-বিবাদ শুরু হয়। এই বিবাদ থেকে ভাইগণ পৃথক হয়ে যায়। তাই কবি, এমন লিখেছেন।
এটি কে লিখেছেন?
খনা।
তিনি তো মনে হয় নারী?
হ্যাঁ।
নারী হয়ে নারীর প্রতি তার এত ক্ষোভ ছিল? কিন্তু কেন? তিনি নিশ্চয়, তার স্বামীকে প্ররোচনা দিয়ে অন্য ভাইদের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দিয়েছিলেন।
নুরানী আপু বললেন, খনা মিথ্যাবাদী ছিলেন। নারী হয়ে নারীর প্রতি কৌশলে মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার অপরাধে তার জিহ্বা কেটে নেওয়া হয়েছিল। তারপর রক্তপাতে বেচারির মৃত্যু ঘটে।
কী হয়েছিল খনা আপুর?
খনা ছিলেন বিক্রমপুরের রাজা বিক্রমাদিত্যের রাজ সভার প্রধান জোতির্বিদ বরাহ-এর পুত্র মিহির-এর স্ত্রী। তিন জনেই ছিলেন জ্যোতির্বিদ। তখন রাজ্যে রাজাদের মধ্যে ভাইয়ে ভাইয়ে ঝগড়া বেড়েই চলছিল। প্রজাদের মধ্যেও ভাইয়ে-ভাইয়ে ঝগড়া হয়ে এক বাড়ি ভেঙে প্রত্যেক ভাই এক একটা বাড়িতে চলে যাচ্ছিল। মামলা-মোকাদ্দমা বেড়ে যাচ্ছিল বেশুমার। রাজা বিক্রমাদিত্য এর কারণ খুঁজে বের করার জন্য বরাহকে আদেশ দিলেন।
বরাহ কোনো উপায় পেলেন না। তিনি কোনো সমস্যার সমাধান করতে না-পারলে পুত্রবধূ খনার কাছে জানতে চাইতেন। পুত্রবধূকে বললেন, বউমা ভাই বড়ো ধন, রক্তের বাধন; তবু পৃথক হওয়ার জানো কী কারণ?
খনা বললেন, “ ভাই বড়ো ধন, রক্তের বাঁধন/ যদিও পৃথক হয় নারীর কারণ।”
বরাহ রাজাকে গিয়ে কারণটি বললেন।সঙ্গে সঙ্গে রাজা রাজ্যের সব বিবাহ বন্ধ করে দিলেন। বন্ধ করে দিলেন নারীদের কথাবলা এবং চলাফেরা। কিছুদিন পর দেখা গেল, ভাইয়ে-ভাইয়ে ঝগড়া আগের চেয়ে আরো বেড়ে গেছে। বেড়ে গেছে সন্ত্রাস। আগে ভাইয়ে ঝগড়া হতো, এখন হচ্ছে জবাই। নারী-নারী করে পুরুষেরা নিজের নাড়ী ছিন্ন করে হিজড়া হয়ে যাচ্ছে। রাজা পড়ে গেলেন মহা মুশকিলে। খবর দিলেন বরাহকে : তুমি এত বড়ো মিথ্যা বললে কেন? আমার রাজ্য তো ভেঙে যাবার উপক্রম। তোমাকে কান ধরে উঠবস করতে হবে। রাজার কাছে অপমানিত হয়ে আসার পর বরাহ তরোয়ল দিয়ে পুত্রবধূ খনার জিহ্বা কেটে ফেললেন।
 
চাচাত মামা মমিন বলতেন, ভাই বড়ো ধন রক্তের বাঁধন/ যদিও পৃথক হয় চাচির কারণ।” চাচি আসার পর তার বাবা-চাচার একান্নবর্তী পরিবার ভেঙে গিয়েছিল। মমিন মামার কথা শুনে, তার বড়ো বোনের স্বামী জাহাঙ্গীর খালু বলেছিলেন : ভাই বড়ো ধন, রক্তের বাধন/ যদিও পৃথক হয় বোনোর কারণ।” তোমার বোনের কারণে আমাদের পাঁচ ভাই আজ পাঁচ ঘরে।
আবিদুর নানা হুঁকো টানতে টানতে বলতেন :
“ভাই বড়ো ধন রক্তের বাঁধন
যদিও পৃথক হয় ভাবির কারণ।”
আমার নানার তিন ভাই ছিলেন। সম্পর্ক নাকি খুব গভীর ছিল। নানা বলেছেন, “যেন একের ভিতর চার। বিয়ের আগে চার ভাই এক বাড়িতে থাকতাম। কখনো কোনো ভাইয়ের মধ্যে ঝগড়া দূরে থাক, টু শব্দটি পর্যন্ত হয়নি। বিয়ের কয়েক মাসের মধ্যে ভাবী এলেন, একবাড়ি ভেঙে চার বাড়ি হয়ে গেল।”
নানাকে বললাম, আপনার বাবার কয় ভাই ছিলেন?
সাত ভাই। ওই যে সাত বাড়ি দেখছ, এগুলোই সাত ভাইয়ের সাত বাড়ি।
আপনার বাবা-চাচারা কি সাত বাড়িতে জন্ম নিয়েছিলেন?
না। আমার বাবা-চাচা এক বাড়িতে জন্ম নিয়েছিলেন।
সাত বাড়ি হলো কীভাবে? নিশ্চয় আপনার মা করেছেন। আপনি বলুন,
ভাই বড়ো ধন, রক্তের বাঁধন
যদিও পৃথক হয় মায়ের কারণ।
নানা চুপ করে হুঁকো টানা শুরু করলেন। দোষ নিজের উপর এসে পড়লে কেউ মেনে নিতে চায় না।
শিক্ষক আলী আহমদ নানা বলতেন, ভাই বড়ো ধন রক্তের বাঁধন, যদিও পৃথক হয় আমার আর বউয়ের কারণ।
নুরানী আপু এসব কথা শুনে বলতেন, সব করে বউ-ভাবী আর চাচি নারীরা। সব যদি নারীর কারণে হয়, তাহলে পুরুষ কী বালটা করে? অথর্ব পুরুষরা সব দোষ নারীদের উপর দিয়ে নিজেরা বলদ সেজে থাকে। সবকিছু মায়েরা করেন, বাবরা বসে বসে শুধু আকামটা করেন।  নারী কেবল অজুহাত।
ছোটোবেলায় মনে হতো খনা ঠিকই লিখেছেন। বড়ো হওয়ার পর বুঝলাম, খনা ঠিক লিখেননি। খনার লেখা উচিত ছিল :
ভাই বড়ো ধন, রক্তের বাঁধন
যদিও পৃথক লোভের কারণ।
নুরানী আপুর ভাষায়, মা-জননীর সব দোষ, বাবা-শালা  নন্দঘোষ।
ধনের প্রতি সবার আকর্ষণ থাকে। ভাই বড়ো ধন বলে ওই ধনকে নিজের দখলে আনার জন্যই শুরু হয় রক্তারক্তি। মা-জননীরা একটু উসকে দেয়। সন্তানের জন্য মায়ের মতো নৃশংস স্বার্থপর আর কেউ হয় না। 
Share This

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language