শ্রী মহাশয় থেকে জনাব, জনাব থেকে স্যার : মাননীয় ও মহামান্য

::: ড. মোহাম্মদ আমীন :::
‘জনাব’ একটি আরবি শব্দ। মুসলিমরাই শব্দটি উপমহাদেশে আনে। মূলত ব্যক্তি নামের পূর্বে সম্মানসূচক পদ হিসেবে শব্দটির প্রয়োগ। মুসলিম আমলে ভারতীয় উপমহাদেশে মহাশয়, শ্রী প্রভৃতি শব্দের পরিবর্তে আরবি ‘জনাব’ শব্দটির প্রয়োগ জনপ্রিয় হয়ে উঠে। ইংরেজ আমল শুরু হলে ‘জনাব’ শব্দের জনপ্রিয়তা হ্রাস পেতে থাকে এবং অল্প সময়ের মধ্যে মহাদাপটের সঙ্গে  ‘জনাব’ এর জায়গাটা দখল করে নেয় ‘স্যার’। ইংরেজি ‘স্যার’ শব্দের তেজ আর ওজস্বিতার নিম্নে তলিয়ে যায় আরবি ‘জনাব’। প্রসঙ্গত, বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত ইংরেজি স্যার শব্দ হচ্ছে শিক্ষক বা মান্য ব্যক্তিকে সম্বোধনে ব্যবহৃত শব্দ, আনুষ্ঠানিক পত্রের সম্বোধনে শ্রদ্ধা ও বিনয়ের প্রতীকরূপে ব্যবহৃত শব্দ, মহোদয়, ব্রিটিশ সরকারের প্রদত্ত খেতাব-বিশেষ প্রভৃতি। অভিধানমতে, স্যার ও জনাব সমার্থক হলেও আমরা কখনো  ইংরেজ ‘স্যার’কে আরবি ‘জনাব’-এর কাছেই যেতে দেইনি। স্যার আসার পর থেকে জনাব তলিয়ে যেতে থাকে। এখন তো জনাব রীতিমতো আপামর।
এবার দেখা যাক, কেন, কীভাবে এবং কখন ‘জনাব’ -এর জায়গটা ‘স্যার’ দখল করে নেওয়ার শক্তি পেল। যুক্তরাজ্য বা ব্রিটেনে ‘স্যার’ ছিল ব্রিটিশ-রানি-প্রদত্ত একটি অতি সম্মানসূচক খেতাব। খ্যাতিমান, প্রভাবশালী, জ্ঞানী, বিজ্ঞানী, কবিসাহিত্যিক, প্রশাসক, রাষ্ট্রনায়ক, রাষ্ট্রের কল্যাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালনকারী ব্যক্তিদের রাজকীয় ‘স্যার’ খেতাবে ভূষিত করা হতো। স্যার, খেতাবপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা সর্বস্তরের লোকজনের কাছে অন্যদের চেয়ে সম্মানিত, প্রভাবশালী এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তি হিসেবে পরিগণিত হতো। তাই ‘স্যার’ ছিল প্রত্যেকের একটি অতি প্রত্যাশিত খেতাব। জনাব-এর বেলায় এমন কিছু ছিল না। মুঘল আমলেও জনাব ছিল অনেকটা অবহেলিত।
 
ব্রিটিশ রাজ ক্রমান্বয়ে পৃথিবীর অনেকগুলো দেশ দখল করে নিয়ে তাদের কলোনি প্রতিষ্ঠা করে। নতুন দেশ দখলের পর ব্রিটিশ সরকার নিজ দেশের লোকদের মতো দখলীয় দেশের প্রভাবশালী ও খ্যাতিমানদেরও ‘স্যার’ খেতাব দিয়ে দখলদার শক্তির বশীভূত থাকার প্রেরণা দিয়ে বশংবদ করে নিত। ব্রিটিশ সরকারের প্রতি অনুগত পরাধীন দেশের প্রভাবশালীদের ‘স্যার খেতাব-প্রাপ্তি ছিল একটি মহাসম্মানের বিষয়। ব্রিটিশ-রাজ-প্রদত্ত ‘স্যার’ খেতাব প্রাপ্তদের প্রতি শাসকগোষ্ঠীও কিছুটা সমীহ প্রদর্শন করত। সংগত কারণে দেশীয়দের কাছেও তারা সম্মান, প্রভাব, মর্যাদা আর ক্ষমতার প্রতিভূ হয়ে ওঠে। ফলে ‘স্যার’ শব্দটি যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাজ্যের অন্যান্য উপনিবেশের ন্যায় ভারতবর্ষেও অতি সম্মানজনক সম্বোধনে পরিণত হয়। স্যার সম্বোধন শুনলে ‘অ-স্যার’গণও পুলকিত হয়ে উঠতেন। বিশেষ করে সরকারি কর্মচারীগণ পুলকিত হয়ে গদগদ করতেন ‘স্যার’ সম্বোধনে। বিড়ালকে বাঘ সম্বোধন করলে কে না-খুশি হয়? হোক না তা মিথ্যা, ভণ্ডামি বা কলঙ্কের!
 
ভারতবর্ষের জনগণ ব্রিটিশ প্রভুদের আনুকূল্য লাভের জন্য শুধু “খেতাবধারী-স্যার”দের নন, যে-কোনো প্রভাবশালী ও ক্ষমতাধর ব্রিটিশ রাজকর্মচারীদেরও ‘স্যার’ সম্বোধন করতে শুরু করে। ‘স্যার’ ডাক শুনলে তারা খুশি হতেন, গর্বিত বোধ করতেন, সম্মানিত বোধ করতেন, ফলে সহজে কাজ হাসিল হয়ে যেত। আস্তে আস্তে অবস্থা এমন হয়ে যায় যে, স্যার সম্বোধন না করলে সরকারি দপ্তরের চাকুরেরা অসম্মানিত বোধ করতে শুরু করে। ন্যাস্টি নেটিভ,‘ স্যার ডাকবে না, তা কী হয়? স্যার ডাকের এ মাজেজা দেশীয় রাজকর্মচারীদেরও সংক্রমিত করে। এভাবে ক্রমান্বয়ে স্যার শব্দটি খেতাবপ্রাপ্ত ছাড়াও প্রভাবশালী; বিশেষ করে ব্রিটিশ শাসকদের সম্মান প্রদর্শনের অনিবার্য শব্দে পরিণত হয়। ফলে ‘জনাব’ শব্দটি আরো সাধারণ হয়ে যায়।
 
তবে এখনো জনাব শব্দটির বহুল প্রয়োগ লক্ষণীয়। কিন্তু তা কেবল আমজনতার কাছে এবং কেবল লেখার ভাষায় ব্যবহৃত হয়, মুখে কেউ কাউকে ‘জনাব’ সম্বোধন করে খুবই কম। মূলত ‘জনাব’ এখন এত সাধারণ হয়ে গেছে যে, কোনো সরকারি কর্মচারী বা জনপ্রতিনিধি কিংবা প্রভাবশালী কাউকে “জনাব—-” সম্বোধন করলে তা অপমান বলে মনে করে। বিশেষ করে সাধারণ জনগণ কোনো কাজে গিয়ে সরকারি কর্মচারীদের ‘স্যার’ শব্দের পরিবর্তে ‘জনাব’ সম্বোধন করলে ওই কাজ না-হওয়ার, অধিকন্তু অপমানিত হওয়ার আশঙ্কা নিশ্চিত হয়ে যায়। এক্ষেত্রে তাদের অভিমত- আপনি আমাকে স্যার না-ডেকে অপমানিত করেছেন। আমি কেন করব না অপমান? এককালীন প্রভুদের ‘স্যার’ শব্দটি বর্তমানে আমাদের মতো সাধারণ জনগণের প্রভুদের ভূষণ হয়ে যায়। এখন তো অফিসের পিয়নও ‘স্যার’। রবীন্দ্রনাথ জালিয়ানওয়ালাবাগের হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে ব্রিটিশ রানিপ্রদত্ত ‘স্যার’ খেতাব পরিত্যাগ করেছিলেন। ওই পরিত্যক্ত ‘স্যার’ নিয়ে আমরা পুলকিত হই, গর্বিত হই- পোষা-প্রাণী যেমন পুলকিত হয় প্রভুর ফেলে দেওয়া উচ্ছিষ্টে।
ব্রিটিশ আমলে রানি ছিলেন সমগ্র রাজ্যের এবং বিশ্বের অনেকগুলো দেশের সরকার-প্রধান হিসেবে সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি হিসেবে সার্বভৌম ক্ষমতার মহাপ্রতিভূ। রাজা-রানিকে সম্বোধন করা হতোে : এক্সালটেড হাইনেস, ইউর এক্সিলেন্সি, হার এক্সিলেন্সি প্রভৃতি কথায়। রানি ভিক্টোরিয়াকে ব্রিটিশেরা বলত, রানি; আমরা বলতাম মহারানি। রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধিবর্গের অধিকাংশই ছিলেন রাজ পরিবারের ঘনিষ্ট বা তাদের আশীর্বাদপুষ্ট। তাই অধস্তনদের কাছে রাজ প্রতিনিধি হিসেবে নিযুক্তগণও এক্সিলেন্সি, হাইনেস প্রভৃতি সম্বোধনে ভূষিত হতেন। এভাবে রাজপ্রতিনিধিগণ এক্সিলেন্সি শব্দে বারিত হয়; যা আমাদের দেশেও প্রচলিত- যার বাংলা মাননীয়, মহামানীয়, মহামান্য প্রভৃতি। যদিও বর্তমান সময়ের রাষ্ট্রপ্রতিনিধিগণ রাজার প্রতিনিধি নন, জনগণের নির্বাচিত প্রতিনিধি। কিন্তু এখনো আমরা প্রাক্তন প্রভু ব্রিটিশের লেজুড়বৃত্তি হতে এখনো মুক্ত হতে পারিনি।
 
বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি বাংলাদেশের রাষ্ট্রপধান। অর্ডার অব প্রিসিডেন্সমতে তিনি বাংলাদেশের প্রধান বা এক নম্বর ব্যক্তি। এক নম্বর ব্যক্তি হিসেবে রাষ্ট্রপতি রাষ্ট্রের সকল মাননীয় ব্যক্তির মাননীয়। সম্মান প্রদর্শনের ক্ষেত্রে অনুসৃত ব্রিটিশ শাসকদের রাজকীয় রীতি অনুযায়ী তাঁকে বলা হয় এক্সিলেন্সি বা এক্সালটেড হাইনেস; যার সাধারণ বাংলা হয় “মাননীয়”; কিন্তু রাষ্ট্রপতি যেহেতু মাননীয়দেরও মাননীয়, তাই বাঙালিরা শব্দটির বাংলা করেছেন মহামান্য। আমি যখন বঙ্গভবনে ছিলাম, তখন রাষ্ট্রপতি বলতাম না, বলতাম মহামান্য- মহামান্য এখন বিদেশে, মহামান্য অফিসে ঢুকছেন, মহামান্য আমাকে ডেকেছেন ইত্যাদি।
 
এবার সরকারি কর্মকর্তা ও জনপ্রতিনিধিবর্গের নামের আগে মাননীয় শব্দের প্রয়োগ নিয়ে আলোচনা করা যাক। গণতান্ত্রিক দেশে জনগণের ভোটে নির্বাচিত ব্যক্তিবর্গ জনগণের প্রতিনিধি। জনগণের পক্ষে, জনগণের জন্য, জনগণের কল্যাণে কাজ করার জন্য তার জনগণের ভোটে নির্বাচিত হন। আমার কাজের জন্য আমার দ্বারা নির্বাচিত প্রতিনিধি আমার অধস্তন, জনগণের প্রতিনিধি জনগণের অধস্তন। জনপ্রতিনিধি, প্রকৃতপক্ষে জনগণের কত অধস্তন তা ভোটের সময় ভোটপ্রার্থীদের করুণ আর্তি দেখে বুঝে নিন। ঘরে ঘরে গিয়ে কী অসহায় ভঙ্গিতে করুণা প্রার্থনা করে। মনে হয় যেন এত অসহায় ভিক্ষুক পৃথিবীতে আর কেউ নেই। এমপি-মন্ত্রীগণ জনগণের প্রতিনিধি। সে হিসেবে তারা জনগণের অধস্তন, জনগণের কাজ করার জন্যই তারা নিয়োজিত হয়েছে। তাই তারা জনগণের হুকুমের অধস্তন। অতএব, তাদেরেই উচিত জনগণকে ‘মাননীয়’ সম্বোধন করা। যেমন : উন্নত গণতান্ত্রিক দেশে প্রেসিডেন্টকে বলা হয় মিস্টার প্রেসিডেন্ট, মানে জনাব প্রেসিডেন্ট; মন্ত্রীকে সম্বোধন করা হয় মিস্টার মন্ত্রী – – -। আর সেসব দেশের মন্ত্রী-এমপিরা জনগণকেও সম্বোধন করে একই রকম মিস্টার হিসেবে। সমান-সমান। কিন্তু আমরা বলি মাননীয় মন্ত্রী, মাননীয় এমপি। কিন্তু মন্ত্রী-এমপিগণ আমাদের ডাকেন আপামর। কী উদ্ভট! আমার ভোটে নির্বাচিত হয়ে, আমার প্রতিনিধি নিযুক্ত হয়ে আমাকে করে দেয় আপামর, আর তারা হয়ে বসে মাননীয়। আমি অনেক মন্ত্রী এবং এমপিকেও অনেক সমাবেশে মহামান্য শব্দে সম্বোধিত হতে দেখেছি।
 
সরকারি কর্মচারীগণ জনগণের কর্মচারী, জনগণের অর্থে তাদের বেতন হয়- সে হিসেবে সরকারি কর্মচারীদের উচিত যাদের টাকায় তাদের বেতন হয়, তাদের অর্থাৎ জনগণকে স্যার ডাকা, মাননীয় ডাকা। উন্নত গণতান্ত্রিক দেশসমূহে তাই করা হয়। জনগণকেই সরকারি কর্মচারীগণ সমীহ করেন, শ্রদ্ধা করেন। কিন্তু আমাদের দেশে উলটো- কারণ ব্রিটিশপ্রভু এবং তার আগে মুগলপ্রভুদের প্রভাব হতে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। তাই আমার চাকরই আমাকে শাসায়, ভোগায় আর “গেট আউট” বলে ভাগায়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!