চার বাহাদুর চৌ

ড. মোহাম্মদ আমীন
গণিতে চার (৪) অঙ্কটি বেশ মজার। এটিই প্রথম স্বপরিচিত ক্ষুদ্রতম বর্গ সংখ্যা। ৪-এর অর্ধাংশ ২ হচ্ছে ৪-এর বর্গমূল। ৪ নামের অঙ্কটির অর্ধেককে যোগ করলে যা হয়, গুণ করলেও তা হয়, এমনকি বর্গ করলেও। অন্য অঙ্ক বা সংখ্যার সঙ্গে মেশার গুণ তার প্রবল। এজন্য চারকে মিশুকে অঙ্ক বলা হয়। ভূগোলে চার-এর প্রভাব সীমাহীন। কেবল চারটা দিক দিয়ে বিশ্বের পূর্ণ বিস্তৃতি ও পরিচয় নির্দেশ করা যায়। বাংলা ভাষাতেও চার মিশুকে শব্দ হিসেবে পরিচত। ‘চার’ শব্দটি বাংলায় চৌ হয়ে কত আর্য-অনার্যের সঙ্গে মিলিত হয়ে কত শব্দ-সন্তানের যে জন্ম দিয়েছে তার ইয়ত্তা নেই।
সংস্কৃত ‘চতুর্‌’ শব্দ থেকে উদ্ভূত চৌ সাধারণভাবে বিশেষণ। এর অর্থ চার। কিন্তু বাংলায় ‘চৌ’ শব্দটির স্বাধীন ব্যবহার নেই। এটি অন্য শব্দের সঙ্গে যুক্ত হয়ে চার-প্রাধান্যজ্ঞাপক নানা জাতের বৈচিত্র্যময় শব্দ গঠন করে। বৈয়াকরণগণ ‘বৌ’ শব্দের ঘোমটা খুলে ‘বউ’ করে দিতে সক্ষম হলেও ‘চৌ’ শব্দের ঘোমটায় হাত দেওয়ার সাহস পাননি। যদিও আধুনিক ‘বৌ’ ঘোমটা পরে না বলে, ‘বউ’ বানানই সংগত। ‘চৌ’ অন্য শব্দের সঙ্গে বসে কীভাবে এবং কত রকমের  বিশেষ্য, বিশেষণ এবং ক্রিয়াবিশেষণ গঠন করে তা দেখা যাক :

চৌকশ : হিন্দি ‘চৌকশ’ শব্দের অর্থ – বিশেষণে চারদিকে দৃষ্টি আছে এমন, চতুর, সব বিষয়ে অভিজ্ঞ।
চৌকা : সংস্কৃত চতুষ্ক হতে আগত চৌকা শব্দের অর্থ : বিশেষণে চার কোণবিশিষ্ট, বিশেষ্যে চার ফোটাযুক্ত তাস, উনুন, চুলা প্রভৃতি।
চৌকাঠ : বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা চৌকাঠ শব্দের অর্থ চৌবাহুবিশিষ্ট যে কাঠামোর সঙ্গে দরজা লাগানো হয়। সাধারণত এই কাঠামোটি কাঠের হয়ে থাকে। তাই শব্দটি চৌকাঠ।
চৌকি : সংস্কৃত চতুষ্কী থেকে উদ্ভূত ও বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ‘চৌকি’ শব্দের অর্থ চারটি পায়াযুক্ত খাট, তক্তপোশ; প্রহরী, ফাঁড়ি, কর আদায়ের ঘাঁটি। চৌকি হতে ‘চৌকিদার। বাংলা চৌকি ও ফারসি দার মিলিতি হয়ে চৌকিদার। এর অর্থ চারদিক যে পাহারা দেয়, প্রহরী, কর আদায়কারী প্রভৃতি।

চৌকুনে, চৌকো চৌকোণা : বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত এই শব্দগুলোর অর্থ চারটি কোণ আছে এমন, চারকোণবিশিষ্ট, চতুষ্কোণ।
চৌখণ্ড : বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা চৌখণ্ড শব্দের অর্থ চারভাগে বিভক্ত, চারটি চালবিশিষ্ট। চৌখণ্ড থেকে চৌখণ্ডিয়া। চৌখণ্ডিয়া শব্দের অর্থ বিশেষণে চার পায়াযুক্ত, বিশেষ্যে চারটি পায়াযুক্ত পিঁড়ি।
চৌখুপি : শব্দটি বাংলা। এর অর্খ বিশেষণে চারটি খোপবিশিষ্ট, চেককাটা এবং বিশেষ্যে চৌকো ছককাটা নকশা।
চৌখুরি : শব্দটি বাংলা এবং অর্থ বিশেষ্যে চারটি খুর বা পায়াযুক্ত কাঠের আসন, চৌকি।

চৌগুণ, চৌগুনা, চৌগুনো : তিনটি শব্দই বাংলা এবং বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। শব্দগুলো সমার্খক এবং অর্থ হচ্ছে : চারগুণ, চর্তুগুণ। যেমন : তিন এর চারগুণ বারো।

চৌগপ্পোঁ : বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা চৌগপ্পোঁ শব্দের অর্থ চেয়ালের দাড়ি দুদিকে ভাগ করে গোঁফের সঙ্গে মিলিয়ে দেওয়া হয়েছে এমন। এরূপ দাড়ি দেখতে চার এর মত লাগে।
চৌঘাট : বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা ‘চৌঘাট’ শব্দের অর্থ চার দিকের ঘাট; চারঘাট, চতুর্দিক।
চৌঘুড়ি : বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা ‘চৌঘুড়ি’ শব্দের অর্থ চার ঘোড়ায় টানা গাড়ি।
চৌচাকা, চৌচাক্কা : সংস্কৃত চতুশ্চক্র হতে উদ্ভূতি ‘চৌচাকা’ ও ‘চৌচাক্কা’ শব্দের অর্থ বিশেষণে চারটি চাকাবিশিষ্ট।
চৌচাপট, চৌচাপড় : বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা ‘চৌচাপট’ ও ‘চৌচাপড়’ শব্দের অর্থ চতুর্দিকের স্থান, চতুর্দিকের বিস্তার, সমচতুর্ভুজ প্রভৃতি।

চৌচাপটে : বাংলা ‘চৌচাপটে শব্দের অর্থ ক্রিয়াবিশেষণে চারদিকে, যথাযথভাবে, সর্বতোভাবে এবং বিশেষণে পূর্ণমাত্রায়।
চৌচালা : বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা ‘চৌচালা শব্দের অর্থ চারটি চালবিশিষ্ট।
চৌচির : চৌচির বাংলা শব্দ। এর অর্থ বিশেষণে চারটি খণ্ডে বিভক্ত, খণ্ডবিখণ্ড।
চৌঠা : সংস্কৃত তুতর্থ থেকে উদ্ভূত বাক্যে বিশেষ্য ও বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত ‘চৌঠা’ শব্দের অর্থ মাসের চতুর্থ দিন, মাসের চার তারিখ (চৌঠা বৈশাখ)।

চৌতলা : বাংলা ‘চৌতলা’ শব্দের অর্থ বিশেষ্যে চতুর্থ তলা এবং বিশেষণে চারটি তলবিশিষ্ট।
চৌতারা : সংস্কৃত চত্বর থেকে উদ্ভূত বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ‘চৌতারা’ শব্দের অর্থ চত্বর, অঙ্গন, উঠান। বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ফারসি ‘চৌতারা’ শব্দের অর্থ মেঝের ‍ওপর খাড়া করে রেখে চেয়ারে বসে টোকা দিয়ে বাজানো হয় এমন বেহালাসদৃশ বৃহদাকার তারযন্ত্র।

চৌথ : সংস্কৃত ‘চতুর্ ‘ থেকে উদ্ভূত ও বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ‘চৌথ’ শব্দের অর্থ এক চতুর্থাংশ, চারভাগের একভাগ, প্রজার উপস্বত্বের চতুর্থ ভাগ; মারাঠা শাসক কর্তৃক আদায়কৃত পরাজিত রাজা বা কৃষকের উৎপাদিত ফসলের এক চতুর্থাংশ বা তার সমপরিমাণ মূল্য।
চৌদিক, চৌদিশ : সংস্কৃত ‘চতুর্দিক থেকে উদ্ভূত ‘চৌদিক’ এবং সংস্কৃত ‘চতুর্দিশ’ শব্দ থেকে উদ্ভূত ‘চতুর্দিশ’ শব্দের অর্থ যথাক্রমে সবদিক ও চারটি দিক। এটি বিশেষ্য।
চৌদুলি : বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা ‘চৌদুলি শব্দের অর্থ চর্তুদোলা বহন করার বৃত্তি, চতুর্দোলা বহনকারী জাতিবিশেষ।
চৌদোল : বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘চর্তুদোল’ শব্দ থেকে আগত ‘চৌদোল’ শব্দের অর্থ সামনে দুজন এবং পিছনে দুজন মোট চারজনের কাঁধে বহন করা হয় এমন ডুলি, পালকি, শিবিকা।
চৌদোলা : সংস্কৃত ‘চতুর্দল’ শব্দ থেকে উদ্ভূত ও বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ‘চৌদোলা শব্দের অর্থ চারজনে কাঁধে বহন করা হয় এমন ডুলি, পালকি, শিবিকা।

চৌধুরি : বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত হিন্দি ‘চৌধুরি’ শব্দের অর্থ নৌ, হস্তী, অশ্ব ও পদাতিরূপ চার শক্তির অধিকারী সামন্ত রাজা, গ্রামের মোড়ল, পদবিবিশেষ।
চৌপথ : বাংলা ‘চৌ’ ও সংস্কৃত ‘পথ’ শব্দের মিলনে ‍সৃষ্ট ‘চৌপথ’ শব্দের অর্থ বিশেষ্যে চারটি পথের সংযোগস্থল, চৌরাস্তা, চৌমাথা।
চৌপদ : সংস্কৃত ‘চতুষ্পদ’ থেকে উদ্ভূত ও বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত ‘চৌপদ’ শব্দের অর্থ চার পা-বিশিষ্ট, চতুষ্পদ। চৌপদ থেকে চৌপদী।
চৌপদী : সংস্কৃত ‘চতুষ্পদী’ থেকে উদ্ভূত ও বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত ‘চৌপদী’ শব্দের অর্থ বিশেষ্যে চার চরণবিশিষ্ট ছন্দ এবং বিশেষেণ চার পা-বিশিষ্ট, চতুষ্পদ।

চৌপর, চৌপহর, চৌপ্রহর : সংস্কৃত চতুঃপ্রহর থেকে উদ্ভূত ‘চৌপর’, ‘চৌপহর’ ও ‘চৌপ্রহর’ শব্দের অর্থ বিশেষ্যে চার প্রহরকাল, ক্রিয়াবিশেষণে সর্বদা, সর্বক্ষণ, দিনরাতব্যাপী।
চৌপল : বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত হিন্দি ‘চৌপল’ শব্দের অর্থথ চারটি কোণবিশিষ্ট।
চৌপাটি, চৌপাঠি, চৌপাড়, চৌপাড়ি, চৌবাড়ি : সংস্কৃত ‘চতুষ্পঠী’ হতে উদ্ভূত ও বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত শব্দগুলোর অর্থথ চতুর্বেদ বা চার-বেদ অধ্যয়নের স্থান, টোল, যে পাঠশালায় সংস্কৃত পড়ানো হয়।
চৌপায়া : সংস্কৃত ‘চতুষ্পদী’ থেকে উদ্ভূত ‘চৌপায়া’ শব্দের অর্থ বিশেষণে চারটি পায়াবিশিষ্ট; বিশেষ্যে চৌকি, খাট।
চৌপাশ : সংস্কৃত ‘চতুপার্শ্ব’ থেকে উদ্ভূত এবং বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত এ শব্দের অর্থ চারদিক।
চৌবাচ্চা : বাক্যে বিশেষ্য হিসেব ব্যবহৃত ফারসি চৌবাচ্চা শব্দের অর্থ চারকোণবিশিষ্ট জলাধারা।
চৌবে : সংস্কৃত ‘চতুর্বেদ ‘ থেকে উদ্ভূত ‘চৌবে’ শব্দের অর্থ বিশেষণে চারটি বেদে অভিজ্ঞ এমন, চৌবেদি
এবং বিশেষ্যে পদবিশেষ।
চৌমহলা : বাংলা ‘চৌমহলা’ শব্দের অর্থ বিশেষণে চারটি মহলে বিভক্ত এমন এবং বিশেষ্যে চারমহলা বাড়ি।
চৌমোহনা : বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত, বাংলা ‘চৌমোহনা শব্দের অর্থ চারটি নদীর সংগমস্থল।
চৌযুগ : সংস্কৃত ‘চতুর্যুগ’ থেকে উদ্ভূত ‘চৌযুগ’ শব্দের অর্থ বিশেষ্যে পুরাণে কল্পিত চারটি যুগ(সত্য ত্রেতা, দ্বাপর ও কলি) এবং ক্রিয়াবিশেষণে চিরকাল, সর্বকাল।

চৌয়ারি : হিন্দি চৌয়ারি শব্দের অর্থ বিশেষ্যে চার চালবিশিষ্ট ঘর, চারদুয়ারি ঘর এবং বিশেষেণে চৌচালা।
চৌরাস্তা : বাংলা ‘চৌ’ এবং ফারসি ‘রাস্তা’ শব্দের মিলনে সৃষ্ট এবং বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ‘চৌরাস্তা’ শব্দের অর্থ চারটি রাস্তার সংযোগস্থল, চৌমথা।
চৌরস : সংস্কৃত চতুরশ্র থেকে উদ্ভূত ও বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত ‘চৌরস’ শব্দের অর্থ চারকোনা, চওড়া, প্রশস্ত, সমান, মসৃণ প্রভৃতি।
চৌরি : বাংলা চৌরি শব্দের অর্থ বিশেষ্যে চৌচালা ঘর এবং বিশেষণে চৌচালা।
চৌশাল : সংস্কৃত চতুঃশাল হতে আগত চৌশাল শব্দের অর্থ বিশেষ্যে চতুষ্কোণ উঠান ঘরে নির্মিত অট্টালিকাশ্রেণি এবং বিশেষণে চক-মিলানো।
চৌশিঙা : বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত বাংলা চৌশিঙা শব্দের অর্থ বিশেষণে চারটি শিং আছে এমন এবং বিশেষ্যে চার শিং বিশিষ্ট হরিণ।
চৌহদ্দি : বাংলাে ‘চৌ’ ও ফারসি ‘হদ্দ’ শব্দের মিলনে গঠিত ও বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ‘চৌহদ্দি’ শব্দের অর্থ চারদিকের সীমানা, চতুঃসীমা, চার সীমা।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!