ভেটো পকেট-ভেটো ও ছদ্ম-ভেটো

ড. মোহাম্মদ আমীন>>

ভেটো (Veto) ল্যাটিন ভাষার শব্দ। এর অর্থ ‘‘আমি মানি না’’। দাপ্তরিকভাবে বলা যায়, ভেটো(Veto) হচ্ছে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান, রাষ্ট্র বা সরকার প্রধান, সংস্থা বা দেশের মনোনীত প্রতিনিধি কর্তৃক কোনো সিদ্ধান্ত বা আইনের উপর স্থগিতাদেশ প্রদান করার ক্ষমতা। ইংরেজিতে শব্দটির সংজ্ঞার্থ দেওয়া হয়েছে এভাবে : A constitutional right to reject a decision or proposal made by a lawmaking body. প্রাচীন রোম সাম্রাজ্যের ইতিহাসে  খ্রিষ্টপূর্ব অষ্টম শতকের পূর্ব থেকে শব্দটির কার্যকরণগত উদ্ভবের ইঙ্গিত পাওয়া যায়। প্রাচীন রোমের কনসাল এবং ট্রাইবুনগণ আইন সভা বা রোমান সিনেটে উপস্থাপিত  সামরিক বা বেসামরিক  যে-কোনো প্রস্তাব বা সিদ্ধান্ত ভেটো প্রয়োগ করে বাতিল করে দিতে পারতেন। পরবর্তীকালে এ ক্ষমতা রাষ্ট্রের জন্য অনিবার্য বিবেচনায় রোম ছাড়াও আরো বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। তবে শব্দটির পরিচিতি তখন প্রধানত শাসকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল।

 জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে পাঁচ স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের ভেটো প্রদান ক্ষমতা প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর ‘ভেটো’ শব্দটি অবিকৃতভাবে অভিন্ন অর্থে বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় ব্যবহৃত হতে শুরু করে। সংগত কারণে ব্যাপক পরিচিতি লাভ করে। প্রসঙ্গত, যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া এবং ফ্রান্স – এই পাঁচটি দেশ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য। তারা প্রত্যেকে ভেটো ক্ষমতা প্রয়োগের অধিকারী। ভেটো ক্ষমতা ব্যবহারের মাধ্যমে পাঁচটি স্থায়ী সদস্য রাষ্ট্রের যে-কোনো একটি দেশ নিরাপত্তা পরিষদে গৃহীত যে-কোনো  সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও আইন প্রণয়ণ অনুমোদনে বাধা প্রদান করতে পারে।

পৃথিবীর অনেক দেশের রাষ্ট্রপতি বা সরকার প্রধানের ভেটো ক্ষমতা রয়েছে। তবে এই ভেটো ক্ষমতাকে বাতিল করার উপায়ও রয়েছে।মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট কংগ্রেসে কোনো বিলের উপর  ভেটো প্রদান করার ক্ষমতা রাখেন। এর মাধ্যমে তিনি কোনো আইন বা বিল কংগ্রেসে গৃহীত হওয়া বন্ধ করার জন্য ভেটো  প্রয়োগ করতে পারেন। তবে হাউজ এবং সিনেটে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতার মাধ্যমে প্রেসিডেন্টের ভেটো প্রদানের ক্ষমতাকে বাতিল করে দিতে পারে।

সাংবিধানিকভাবে ভারতের রাষ্ট্রপতির বেশ কিছু বিষয়ে ভেটো ক্ষমতা প্রদানের অধিকারী। তিনি যে-কোনো বিলে সম্মতি প্রদান বা স্বাক্ষর করা হতে বিরত থাকতে পারেন। যা অবশ্যম্ভাবী ভেটো হিসেবে পরিচিত। ভেটো প্রয়োগের ফলে তিনি বিলে স্বাক্ষর না করে পুনরায় সংসদে ফেরত পাঠাতে পারেন। তবে সংসদ সাধারণ সংখ্যঘরিষ্ঠতার মাধ্যমে রাষ্ট্রপতির ভেটোকে বাতিল করে পুনরায় ওই বিষয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারে। রাষ্ট্রপতি তাঁর এ ভেটো ক্ষমতার সীমাবদ্ধতাকে  এড়ানোর জন্য  বা বিশেষ কারণে অনির্দিষ্টকালের জন্যে বিলের উপর কোন সিদ্ধান্ত প্রদান হতে বিরত থাকতে পারেন। এটি পকেট ভেটো নামে পরিচিত।

সাংবিধানিকভাবে বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিরও ভোটো ক্ষমতা আছে। তবে তা এত সীমিত যে, বলা যায় থাকা বা না-থাকা সমান। রাষ্ট্রপতি কোনো বিলে সম্মতি প্রদান না-করলে কিংবা স্বাক্ষর না-করে ফেরত পাঠালে অথবা স্বাক্ষর করে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে ফেরত না-পাঠালে তা স্বাক্ষর করা হয়েছে বা রাষ্ট্রপতির সম্মতি আছে বলে গণ্য করে পরবর্তী কার্যক্রমে গ্রহণ করা যায়। এরূপ ভেটোকে ছদ্ম-ভেটো বলা যায়।

 ‘ভেটো’ বা “আমি মানি না” কথাটি ছোটো হলেও এমন কথা যে কেউ বলতে পারে না, বললেও কার্যকর করা যায় না। যে কথা বলেও কার্যকর করা যায় না – তা অর্থহীন কথা, সাধারণ ভাষায় “পাগলের  প্রলাপ”। কেবল শক্তিমান কিংবা প্রভাবশালীরাই জোর গলায়  ‘আমি মানি না’ কথাটি বলতে পারে এবং একই সঙ্গে তা কার্যকর করার ক্ষমতা রাখে। তাই ‘ভেটো’ কথাটি যতই নেতিবাচক হোক না কেন, কথাটি বলার অধিকার কেবল বৃহৎ শক্তিসমূহ বা প্রভাবশালীদের একচেটিয়া হওয়ায় শব্দটি তার নেতিবাচক অর্থ হতে বেরিয়ে ইতিবাচক হয়ে গিয়েছে। এভাবে প্রভাবশালীদের যে-কেনো নেতিবাচক কাজও ইতিবাচক হয়ে যায়। আর প্রভাবহীন দুর্বলরা অবাক চোখে চেয়ে থাকে এবং বলে –

হুজুর, আপনি প্রভাবশালী, ক্ষমতাবান তা আমি জানি

তাই  আপনার ‘আমি মানি না’ কথাটি আমি খুব ভালোভবে মানি।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!