বিদ্যুদায়ন বিদ্যুতায়ন; বৈদ্যুতিক; বিদ্যুদায়িত বিদ্যুতায়িত

ড. মোহাম্মদ আমীন
বিদ্যুৎ+ আয়ন = বিদ্যুদায়ন। সংস্কৃত ব্যাকরণে বর্ণিত  বিধি অনুসারে ‘বিদ্যুৎ’ শব্দের সঙ্গে ‘আয়ন’ যোগে গঠিত হয়েছে ‘বিদ্যুদায়ন’। সেই অনুসারে ‘বিদ্যুদায়ন’ শব্দটিই ব্যাকরণগতভাবে শুদ্ধ। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘বিদ্যুদায়ন (বিদ্যুৎ+ আয়ন)’ শব্দের অর্থ বৈদ্যুতীকরণ। ইংরেজিতে যাকে বলা হয় electrification। ‘বিদ্যুদায়ন’ শব্দের সমার্থক হিসেবে অধুনা ‘বিদ্যুতায়ন’ শব্দটির বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। সংস্কৃতমতে, এর  জন্মে গন্ডগোল রয়েছে। তাই ‘বিদ্যুতায়ন’ নাকি শুদ্ধ শব্দ নয়, রীতিমতো অবৈধ। এবার দেখা যাক ‘বিদ্যুতায়ন’ শব্দটির পরিচয়।
সংস্কৃত ব্যাকরণের নিয়মানুসারে “বিদ্যুৎ+ আয়ন = বিদ্যুদায়ন”। কাজেই “বিদ্যুৎ+ আয়ন = বিদ্যুতায়ন” হতে পারে না। তারপরও প্রথম পদের (বিদ্যুৎ) শেষ বর্ণ ‘‘খণ্ড-ৎ’’-কে “আস্ত-ত” ধরে নিয়ে তার সঙ্গে ‘আ-কার’ দিয়ে ব্যাকরণিক সব নিয়মনীতি ভঙ্গ করে অবৈধভাবে ‘বিদ্যুতায়ন’ শব্দটির জন্ম দেওয়া হয়েছে। তাই বৈয়াকরণদের অভিমত, ‘বিদ্যুতায়ন’ শব্দটি ব্যাকরণগতভাবে অশুদ্ধ এবং অবৈধ।
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে,  বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত “বিদ্যুতায়ন (বিদ্যুৎ+ আয়ন)” শব্দটি “বিদ্যুদায়ন (বিদ্যুৎ+ আয়ন)” শব্দের অশুদ্ধ প্রচলিত রূপ। অশুদ্ধ বা অবৈধ যাই হোক, ‘বিদুত্যায়ন’ শব্দটি ইতোমধ্যে বিশাল গ্রহণযোগ্যতা পেয়ে বৈধ ‘বিদ্যুদায়নকে’ প্রায়োগিক জগৎ থেকে বিতাড়নই করেই দিয়েছে প্রায়। শুদ্ধ হয়েও সংস্কৃত ‘বিদুদ্যায়ন’ এখন কোনঠাসা। অশুদ্ধ ‘বিদ্যুতায়ন’ এত বহুল প্রচলিত যে, এটাকে উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। সংস্কৃত শব্দ গণ্য করা হচ্ছে বলেই ‘বিদ্যুতায়ন’ অশুদ্ধ বা অবৈধ। তাই আমি মনে করি, ‘বিদ্যুতায়ন’ শব্দকে সংস্কৃত না বলে বাংলা শব্দ ধরে নিলে তার অশুদ্ধ বা অবৈধ রূপ একদম শুদ্ধ ও বৈধ হয়ে যায়।
বিদ্যুদায়ন থেকে বিদ্যুতায়ন। তাই, ‘বিদ্যুতায়ন’ শব্দটির মতো ‘বিদ্যুতায়িত’ শব্দটিও অশুদ্ধ বা অবৈধ। যেখানে বিদ্যুৎ পৌঁছেছে বা সরবরাহ হয়েছে সেটাই বিদ্যুদায়িত। বিদুৎবাহিত বস্তুর স্পর্শে অনেক দুর্ঘটনা ঘটে। এটি বিদুদ্যায়ন নয়, এটি হচ্ছে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট। ‘বিদ্যুৎস্পৃষ্ট’ শব্দের অর্থ বিদ্যুতের স্পর্শ পেয়েছে এমন, বিদ্যুতের আঘাত পেয়েছে এমন, তড়িদাহত প্রভৃতি।
বাক্যে বিশেষেণ হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত “বৈদ্যুতিক (বিদ্যুৎ+ইক)” শব্দের অর্থ বিদ্যুদ্‌বিষয়ক, বিদ্যুৎপূর্ণ, বিদ্যুচ্চালিত প্রভৃতি। বিদ্যুতের সুবিধা পাওয়ার লক্ষ্যে কোনো বস্তুর মধ্য দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহ করা হচ্ছে বৈদ্যুতিক। কিন্তু ‘বিদ্যুদায়িত’ স্থান অর্থ, যে স্থান বা বস্তুকে বিদুত্যের কাঙ্খিত সুবিধার আওতায় আনা হয়েছে। যেমন : সাভার একটি শতভাগ বিদ্যুদায়িত এলাকা।সময়মতো বিদ্যুদায়ন করতে না-পারায় আমার মোবাইলটি অচল হয়ে গেছে।
‘বিদুতায়ন’ শব্দের মতো, ‘বিদ্যুতায়িত’ শব্দটিও অশুদ্ধ। অশুদ্ধ হলেও বহুল প্রচলিত। দুটোই অবৈধ, তবে এত বেশি প্রচলিত যে তাদের কাউকে অবহেলা করা সম্ভব নয়। যাকে অবহেলা করা যায় না, তাকে মেনে নেওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ। শুদ্ধতা বা অশুদ্ধতা কিংবা বৈধতা বা অবৈধতা ব্যক্তির মতো শব্দের ক্ষেত্রেও জনপ্রিয়তা এবং প্রচলনের ওপর নির্ভরশীল। দুটো শব্দকে সংস্কৃত না ধরে বাংলা শব্দ বললে অশুদ্ধ বা অবৈধতার প্রশ্নই আর থাকে না।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!