বলদ

 মোজাম্মেল হক রিমন

বোহেমিয়ান জীবন যেন স্রোতের প্রতিচ্ছবি। সর্পিলাকার এ স্রোতের বাঁকে বাঁকে শুধুই ব্যস্ততার কল্লোল, সময় কোথায় পুরনো সে পাঠ নতুন করে জানার। তাই বলে এ বয়সে কারক, সমাস শিখতে হবে? ক্ষতি কী, যদি সমাসের একটি লাইন বাকি জীবনে অামার কিছু বাংলা শব্দের দ্বিধা মুছে দিতে পারে চিরতরে!

উপপদ তৎপুরুষ সমাসের কয়েকটি সমাসবদ্ধ পদ ব্যবহারে অামরা প্রায়শই দ্বিধান্বিত থাকি। এক্ষেত্রে শব্দে ‘জ’ এবং ‘দ’ এর ব্যবহার নিয়েই মূলত সমস্যাটির উদ্ভব। উপপদ তৎপুরুষ সমাসের ক্ষেত্রে শব্দের প্রথম অংশ বিশেষ্য এবং বিশেষ্যের পর ক্রিয়া অথবা ক্রিয়ার প্রথম বর্ণ থাকবে। এ নিয়মের শেষের অংশটুকু মনে রাখলে বেশ কিছু শব্দ ভুল হয় না।

‘জলজ এবং ‘জলদ’ শব্দগুলোর মতো অনেকগুলো শব্দের ব্যবহার প্রায়ই অামাদেরকে বিভ্রান্ত করে। এবার অাসা যাক তাদের অালোচনায়-
জলজ শব্দটির অর্থ হচ্ছে জলে জন্মে যা ( অাভিধানিক অর্থ- জলে জন্মে যা, জলজাত, অম্বুজ), যেমন: শাপলা, শালুক, শামুক ও ঝিনুক প্রভৃতি। লক্ষ করলে দেখা যায়, বিশেষ্য পদ জলের সাথে ক্রিয়া পদ জন্মে’র ‘জ’ সংযুক্ত হয়ছে। তেমনি করে ‘জলদ’ শব্দের অর্থ হচ্ছে জল দেয় যা ( যার মূল অর্থ মেঘ)। পূর্বের মতো এখানেও বিশেষ্য পদ জলেরর সাথে ক্রিয়া পদ দেয়’র ‘দ’ সংযুক্ত হয়ছে। এ বিষয়টি মনে রাখার মাধ্যমে অামরা বাক্যে জলজ/জলদ শব্দের ব্যবহার সম্পর্কিত জটিলতা এড়াতে পারি।

উল্লিখিত নিয়ম অনুসরণ করে অন্যান্য শব্দগুলোকেও অামরা মনে রাখতে পারি। এবার অাসি এরকম কিছু শব্দ নিয়ে অালোচনা করা যাক।

অাসা যাক, ফলদ না ফলজ এ বিতর্কে।
সুতরাং ফল দেয় যা তা ফলদ অার ফলে জন্মে যা তা ফলজ। কিছু অনুজীব ছাড়া ফলে জন্মানোর মতো কোন বৃক্ষ কি অামরা পাই? সুতরাং কোন বৃক্ষ/উদ্ভিদকে লক্ষ্য করে যখন অামরা বলবো অবশ্যই ফলদ উদ্ভিদ/ বৃক্ষ নামেই তাকে চিহ্নিত করবো।

এবার অাসি ‘বনজ ও বনদ’ এ অালোচনায়-
খুব স্বাভাবিকভাবেই বনজ বলতে, বনে জন্মে যা বুঝাবে (অাভিধানিক অর্থ- বনে জন্মে যা, বনজাত পশুপাখি ও বৃক্ষাদি)। অপরদিকে বন দেয় যা বনদ অর্থে পরোক্ষভাবে বৃক্ষকে নির্দেশ করলেও বাংলা ভাষায় সঠিক অর্থে বনদ শব্দের ব্যবহার অামার দৃষ্টিগোচর হয়নি। এমনভাবে, খনিজ=খনিতে জন্মে যা, দেশজ= দেশে জন্মে যা, শব্দগুলোকেও অামরা ব্যবহার করতে পারি।

তাহলে বলদ শব্দটির কী হবে? হ্যাঁ, বলদ হচ্ছে বল দেয় যা। ব্যাকরণগতভাবে ঠিক হলেও অর্থগতভাবে এটি ঠিক কিনা তা একটু সন্দেহের অবকাশ রাখতে পারে। কিন্তু অভিধান দেখাচ্ছে এটি ঠিক। অভিধানে দুই ধরনের বলদ পাওয়া যাচ্ছে, প্রথমটির অর্থ দেখাচ্ছে বলদায়ক অর্থাৎ অামাদের বল দেয় যা এর সমরূপ অর্থ যদিও এর উচ্চারণটা হবে বলোদো। অপর একটি বলোদ্ অভিধানে অন্তর্ভুক্ত যার অর্থ ষাঁড়, বৃষ এবং উচ্চারণ বলোদ।

তবে উচ্চারণ যা ই হোক দুই বলদ যে একই উৎসের শব্দ হবে না সে সম্ভাবনাকেও কিন্তু উড়িয়ে দেয়া যায় না। কারণ সে প্রাচীন কাল থেকেই শস্য মাড়াই করা, কূপ থেকে পানি তোলা, মালামাল স্থানান্তরকরণের জন্য গাড়ি টানা, ঘানি টানা, লাঙল টানাসহ সকল বল দানকারী কাজে বলদের ব্যবহার লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে শুধু বল দেয়ার জন্যই এঁড়েবাছুরকে ধীরেধীরে বলদে রূপান্তর করা হয়।

সুতরাং বলদ শব্দটি অাজকের দিনে গালি হিসেবে ব্যবহার করা হলেও ব্যুৎপত্তিগত অর্থ অনুসারে এটা কিন্তু বল/ শক্তির পরিচায়ক।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!