Ghoti (ঘটি) শব্দের উচ্চারণ

ড. মোহাম্মদ আমীন
জর্জ বার্নাড শ প্রশ্নটি করে সাহিত্য সম্মেলনে উপস্থিত শ্রোতৃবৃন্দের দিকে তাকালেন। উত্তর আসার আগেই তিনি বলে ওঠলেন, Ghoti (ঘটি) শব্দের উচ্চারণ Fish হলে আমি অবাক হব না। বরং না হওয়ায় বিস্মিত হই। কারণ ইরেজি ভাষার বর্ণগুলির উচ্চারণভঙ্গি এতই অবৈজ্ঞানিক, অনির্ধারিত এবং অনিশ্চিত যে, কোন বর্ণের উচ্চারণ কী হয় তা স্বয়ং ঈশ্বরও বলতে পারবে না।

ইংরেজি ভাষার বানান বিপর্যয় বর্ণনা করতে গিয়ে গিয়ে জর্জ বার্নাড শ উপস্থিত সুধীদের বললেন, ইংরেজি এমন একটি ভাষা যার বর্ণসমূহের উচ্চারণের সঙ্গে প্রায়োগিক উচ্চারণের কোনো যোগসূত্র পাওয়া যায় না। একটি বর্ণ একাধিক উচ্চারণকে দ্যোতিত করে। C কখনও ক আবার কখনো চ। G কখনে গ আাবর বর্গীয়-য, জ। H কখনও হ আবার কখনো গম্ভীর ধ্বনির দ্যোতক। T তো আরো মারাত্মক। আবার কখনো কখনো অনেক বর্ণ উচ্চারিতই হয় না। অধিকাংশ বর্নের আচরণ বহুরূপী। এজন্য আমি অবাক হয়ে যাই, কেন Ghoti ‘ঘটি’ উচ্চারণ Fish ( ফিশ) করা হয় না।
কেন হবে? প্রশ্ন করেছিলেন একজন।
জর্জ বার্নাড শ বললেছিলেন, আমি কিন্ত Ghoti (ঘটি) লিখিনি। লিখেছি Fish (ফিশ).
কীভাবে?
জর্জ বার্নাড শ বললেন, Laugh শব্দের বানান পর্যালোচনা করুন। এখানে gh এর উচ্চারণ হচ্ছে F (এফ)। Women শব্দের বানানে O এর উচ্চারণ হচ্ছে (আই) এবং Nation শব্দের বানানে ti এর উচ্চারণ হচ্ছে sh (তালব্য-শ)। অতএব Ghoti শব্দটির উচ্চারণ হচ্ছে Fish।
জর্জ বার্নাড শ এর ব্যাখ্যা শুনে সবাই থ।

ইংরেজি ভাষার এই উচ্চারণ অসংগতি দূর করে একটি বিজ্ঞানানুগ রীতি প্রতিষ্ঠার জন্য জর্জ বার্নাড শ মৃত্যুর আগে মোটা অঙ্কের অর্থ উইল করে গিয়েছিলেন কিন্তু ইংরেজরা তাদের ভাষার ঐতিহ্য নিয়ে এত বেশি গর্বিত এবং পরিতৃপ্ত ছিলেন যে, বিন্দুমাত্র পরিবর্তন করার উদ্যোগ গ্রহণ করাকেও সমীচীন মনে করেননি। তাদের অভিমত ছিল, এই অনিশ্চয়তা মেনে নিয়ে যারা ইংরেজি শিখবেন, তাদের জন্যই ইংরেজি।

ড. মোহাম্মদ আমীন

আমি মনে করি, এসব বিবেচনায় বাংলা ইংরেজির চেয়ে আমাদের বাংলা ভাষা অনেক বেশি বিজ্ঞানানুগ। পৃথিবীর প্রত্যেক ভাষায় কিছু না কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সে বিবেচনায় বাংলা ভাষার সীমাবদ্ধতা তুলনামূলকভাবে অনেক কম। ফেরদাউস খান পরিচালিত একটি সমীক্ষার রিপোর্ট অনুযায়ী বাংলা ভাষার লিখন গতি ইংরেজি ভাষার সমান কিন্তু পঠন বেগ ইংরেজির চেয়ে বেশি। ইংরেজি লিপি ধ্বনিমূলক নয়, বর্ণনামূলক। একটি ধ্বনির প্রতিলিপি হিসেবে ইংরেজিতে একটি বর্ণ সৃষ্টি হয় না। ইংরেজিতে অনেকগুলো শব্দ রয়েছে যেখানে বর্ণচিহ্ন উপস্থিত থাকলেও উচ্চারিত হয় না এবং বর্ণের উচ্চারণে প্রবল পার্থক্য লক্ষণীয়।

বাংলায় প্রত্যেকটি ধ্বনির জন্য নির্দিষ্ট হরফ আছে। ‘ক’ বর্ণের উচ্চারণ সর্বত্র অভিন্ন। ইংরেজি বর্ণমালার তৃতীয় অক্ষর সি (C) এর মতো ভিন্নভাবে উচ্চারিত হওয়ার জটিলতা বাংলায় নেই। বর্ণের অর্ধ উচ্চারণ প্রয়োজন হলে হসন্ত দিয়ে চিহ্নিত করে দেওয়ার রীতি বাংলা ভাষার একটি বাড়তি সুবিধা। বাংলা-বর্ণ শুধু যে ধ্বনিমূলক তা নয়, এর স্বর ও ব্যঞ্জনবর্ণ একটি করে অক্ষর বা Syllable কে ধারণ করে রাখে। অন্যদিকে বাংলা স্বরবর্ণগুলো অভ্রান্ত ধ্বনিমূলক এবং অন্তর্নহিত ধ্বনির অতিরিক্ত একটি ‘অ’ স্বরধ্বনিরও দ্যোতক। ফলে একটি বর্ণের সাহায্যে বাংলায় একটি পূর্ণ অক্ষর প্রকাশ করা সম্ভব। বাংলা ভাষার ধ্বনিবোধক বাংলা প্রতিলিপি ব্যবহারে এমন সুসামঞ্জস্যতা পৃথিবীর খুব বেশি ভাষায় নেই।

অতএব যারা বাংলাকে কঠিন বলেন, তাদের প্রতি সবিনয় অনুরোধ- বাংলা আসলে কঠিন নয়, বিজ্ঞানমূলক। বিজ্ঞান কী আর একাগ্র অধ্যয়ন ছাড়া আয়ত্তে আনা যায়?

সূত্র : বাংলা ভাষার মজা, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *

Language
error: Content is protected !!