কি কী, কেন কেনো, কীভাবে, কী ভাবে; কিনা, কি না; নাকি, না কি

ড. মোহাম্মদ আমীন

কি কী, কেন কেনো, কীভাবে, কী ভাবে; কিনা, কি না; নাকি, না কি

কি বনাম কী: কিভাবে কীভাবে, কিসে কীসে

১. ‘কি’ প্রশ্নবোধক অব্যয়। যে সকল প্রশ্নের উত্তর ‘হাঁ’ বা ‘না’ শব্দের মাধ্যমেও কিংবা কেবল অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমেও সন্তোষজনকভাবে দেওয়া যায় সে সকল প্রশ্নবোধক বাক্যে ‘কি’ লিখবেন। যেমন : আমি কি খাব?

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

(Will I eat?), আমি কি আসতে পারি স্যার? টাকা আছে কি? তুমি কি জানো? (Do you know?)

২. যে সকল প্রশ্নের উত্তর ‘হাঁ বা ‘না‘ দিয়ে কিংবা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সন্তোষজনকভাবে দেওয়া সম্ভব নয় সে সকল প্রশ্নবোধক বাক্যে ‘কী’ লিখবেন। যেমন : আমি কী খাব? (What will I eat?), তুমি কী চাও? (What do you want?), কী করে এতদূর এলে? তোমার বাবা কী করেন? তুমি কী জানো? (What do you know?)
৩. ‘কী’ বিস্ময়সূচক পদ। তবে বিস্ময় ছাড়াও অনিশ্চয়তা, অবজ্ঞা, সম্মান গৌরব, প্রশংসা প্রভৃতি প্রকাশেও ‘কী’ ব্যবহার করা হয়। যেমন – বিস্ময় : কী দারুণ! অনিশ্চয়তা : কী জানি কী হয় না হয়। অবজ্ঞা : সে আবার কী ধনী? প্রশংসা : কী ধনী তিনি জানো? ছেলেটি যে কী সাহসী জানলে তুমি হতবাক হয়ে যাবে।
১. ‘কি’ প্রশ্নবোধক অব্যয়। যেসব প্রশ্নের উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’-এর মাধ্যমে কিংবা কেবল অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সন্তোষজনকভাবে দেওয়া যায় সেসব প্রশ্নবোধক বাক্যে ‘কি’ লিখবেন। যেমন: আমি কি খাব? (Will I eat?), আমি কি আসতে পারি স্যার? টাকা আছে কি? তুমি কি জানো? (Do you know?)
“তুমি কি কেবলই ছবি?
শুধু পটে লিখা
ওই যে সুদূর নীহারিকা।”
(রবীন্দ্রনাথ)
২. যেসব প্রশ্নের উত্তর ‘হাঁ বা ‘না‘ দিয়ে কিংবা অঙ্গভঙ্গির মাধ্যমে সন্তোষজনকভাবে দেওয়া সম্ভব নয় সেসব প্রশ্নবোধক বাক্যে ‘কী’ লিখবেন। যেমন: আমি কী খাব? (What will I eat?), তুমি কী চাও? (What do you want?), কী করে এতদূর এলে? তোমার বাবা কী করেন? তুমি কী জানো? (What do you know?)
কী করিব বলো সখা, তোমার লাগিয়া
কী করিলে জুড়াইতে পারিব ও হিয়া। (রবীন্দ্রনাথ)।
কী হবে জানিয়া বলো, কেন জল নয়নে।
তুমি তো ঘুমায়ে আছ সুখে ফুল-শয়নে। (নজরুল)
কী গাব আমি কী শুনাব আজি আনন্দধামে – – -। (রবীন্দ্রনাথ)
৩. ‘কী’ বিস্ময়সূচক পদ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বিস্ময় ছাড়াও অনিশ্চয়তা, অবজ্ঞা, সম্মান গৌরব, প্রশংসা প্রভৃতি প্রকাশেও ‘কী’ ব্যবহার করা হয়। যেমন –
বিস্ময়: কী দারুণ দেখতে, চোখ দুটো টানাটানা–।
অনিশ্চয়তা: “ কী গাব আমি কী শুনাব আজি আনন্দধামে” (রবীন্দ্রনাথ)। অবজ্ঞা: সে আবার কী ধনী!
প্রশংসা: কী ভালো লোক তিনি জানো!
কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো—
কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।” (রবীন্দ্রনাথ)
৪. কোনভাবে, কেন, কী কারণে, কার মধ্যে, কেমন করে, কত প্রকারের, কেমন, কী উপায়ে প্রভৃতি বুঝালে প্রশ্নজ্ঞাপক মূল বাক্যটির আগে ‘কী’ লিখতে হয়। যেমন : কীভাবে যাবে? কীজন্য এসেছ? কীরকম লোক তুমি? কীসে তোমার আগ্রহ? এত তাড়া কীসের? কীরূপ দেখতে সে? কী উপায়ে তোমাকে সাহায্য করতে পারি?
কীভাবে ও কিভাবে: ‘কিভাবে’ বানানটি ভুল। কারণ এই শব্দযুক্ত প্রশ্নসূচক বাক্যের উত্তর ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ শব্দে কিংবা অঙ্গভঙ্গিতে দেওয়া যায় না। তাই লিখবেন ‘কীভাবে’। ‘কিভাবে’ লিখবেন না। তেমনি লিখবেন, কীজন্য, কীদৃশ্য, কীসে, কীসের, কীরূপ প্রভৃতি।
(শুবাচে বেশ কয়ক বার লেখাটি দেওয়া হয়েছে। তবু অনেক প্রশ্ন আসায় পুনরায় দেওয়া হলো।)

কি, কী; কেন কেনো, কীভাবে, কী ভাবে; কিনা, কি না; নাকি, না কি

১. তুমি কী
২. খাচ্ছি, তুমি কি খেয়েছ?
৩. হ্যাঁ, ছেলের প্রশ্নে বাবা বললেন।
৪. কী খেয়েছ?
৫. ভাত। খোকা, তুমি কি আমার সঙ্গে একটু বাজারে যাবে?
৬. কীভাবে যাবে, ড্রাইভার তো এখনও আসেনি। বাজারে গেলে মা কী ভাবে কী জানি।
৭. বাজার তো কাছেই, হেঁটেই যেতে পারি, নাকি তুমি কী বলো?
৮. তুমি বাজারে গেলে মা তোমার সম্পর্কে কী বলে জান?
৯. কী বলে?
১০. তুমি নাকি ঠকা মিয়া, দরদামও নাকি করতে জান না। মায়ের কথা ঠিক না কি বাবা?
১১. কেন, কেন তোমার মা এমন কথা বলে?
১২. তুমি পচা মাছ কেনো
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

১৩. কী আশ্চর্য!

১৪. বাবা, তুমি পচা মাছ কেনো কেন?
১৫. আমার সম্পর্কে আর কী বলে তোমার মা?
১৬. মা নাকি তোমার সঙ্গে আর থাকবে না।
১৭. আমি কী করলাম?
১৮. তুমি নাকি কিপটে। তোমার মতো কৃপণ নাকি আর হয় না। মাকে এক দিনের জন্যও শান্তি দাও-নি কিনা
১৯. “তোমার মায়ের জন্য কী না করলাম, তবু বলে কিপটে, হায়রে কী পোড়া কপাল আমার! তোমার মা কখন কী যে বলে বুঝি না।” এটুকু বলে বাবা গুনগুন শুরু করে দিলেন মনে মনে— কী করি আজ ভেবে না পাই, পথ হারিয়ে কোন বনে যাই- – – ৷
২০. গুনগুন শেষ করে বাবা ছেলেকে বলল, তোমার মা আমাকে নিয়ে আর কী ভাবে?
২১. কী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নেহ, কী মায়া গো— কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।” মা না, আসলেই তোমাকে খুব ভালোবাসে, ঠিক দেশের মতো। এটি কি তুমি জান বাবা?
২২. জানি বইকি
২৩. এ কি সত্য সকলই সত্য, হে আমার চির ভক্ত।
২৪, এ কী?
২৫. রবীন্দ্রসংগীত।
(এটুকু পড়ার পর যদি প্রয়োগ বুঝে যান তাহলে নিচেরগুলি পড়ার প্রয়োজন নেই। তার চেয়ে বরং আমার লেখার ভুল ধরে ত্রুটিমুক্তীকরণে সহায়তা করুন। আমি একবার কোনো লেখা, লেখার পর পুনারায় দেখতে পারি না। তাই প্রচুর ভুল থেকে যায় বানানে। শেয়ার করুন ইচ্ছা হলে, কপি করলে ঠকবেন। কারণ, আরও নতুন কিছু যুক্ত হবে এখানে।]
————————————–
১. হ্যাঁ/হাঁ বা না দিয়ে উত্তর দেওয়া যাবে না, তাই ‘কী’। হ্যাঁ বা না দিয়ে উত্তর দেওয়া গেলে কি; তা না হলে কী।
২. হ্যাঁ বা না দিয়ে উত্তরযোগ্য; তাই কি বসানো হয়েছে।
৩. হ্যাঁ/হাঁ বানানে চন্দ্রবিন্দু হয়।
৪. হ্যাঁ/না দিয়ে উত্তর দেওয়া যাবে না, তাই কী।
৫. হ্যাঁ/না শব্দে উত্তরযোগ্য; তাই কি।
৬. কীভাবে অর্থ কোন উপায়ে, কীসের দ্বারা, কীসের মাধ্যমে কীসের সহায়তায় প্রভৃতি;; এসব প্রকাশে কীভাবে লিখতে হয়।কী ভাবে অর্থ কী মনে করে, কী চিন্তা করে।
৭. প্রশ্নবোধক হলেও নাকি কথাটা আলংকারিক, আসলে এটি প্রশ্ন নয়; সংশয় কিংবা প্রচ্ছন্ন অনুরোধ। বাক্য হতে নাকি তুলে নিলেও অর্থের পরিবর্তন হয় না। তাই নাকি। অন্যথায় না কি হতো।
৮. প্রশ্নটির উত্তর হ্যাঁ/না দিয়ে দেওয়া যায়, তবে এখানে কী দিয়ে বক্তব্যের বিবরণ নির্দেশ করা হয়েছে, তাই কী বসেছে।
৯. হ্যাঁ/না দিয়ে উত্তরযোগ্য নয়।
১০. নাকি আলংকারিক। নাকি না দিলেও বাক্যের অর্থ অভিন্ন থেকে যায়। কি না দিয়ে জানতে চাওয়া। অধিকন্তু, এই বাক্য থেকে না কি তুলে নিলে বাক্যটির অর্থ পরিবর্তন হয়ে যাবে। এমন বাক্যে না কি দেওয়া বিধেয়।
১১. কারণ জানতে চাওয়া।
১২.ক্রয় করা অর্থে কেনো হয়। ক্রিয়াবিশেষ্য।
১৩. আবেগ, বিস্ময় প্রভৃতি প্রকাশ করা হলে কী বিধেয়।
১৪. ক্রয় (কেনো) করার (কেন) কারণ জানতে চাওয়া।
১৫. হ্যাঁ/না দিয়ে উত্তর দেওয়া যাবে না। তাই কী।
১৬.এখানে নাকি আলংকারিক। বাক্য থেকে শব্দটি তুলে দিলেও অর্থের পরিবর্তন হবে না। তাই নাকি হয়েছে।নইলে না কি দিতে হতো।
১৭. কারণ জানতে চাওয়া, তাই কী বসেছে।
১৮.এখানে কিনা, নাকি আলংকারিক, তাই সেঁটে বসেছে।
১৯. কী না আবশ্যক, কারণ এটা ব্যাখ্যার অভিব্যক্তি। কী করি আজ ভেবে না পাই, পথ হারিয়ে কোন বনে যাই- – – ৷ গানের কী প্রশ্ন নয়, কবির বিস্ময়!
২০. ‘কী ভাবে’ মানে কী চিন্তা, কী ধারণা, কী ভাবনা।
২১. এখানে কী দিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করা হয়েছে এবং কি দিয়ে জানতে চাওয়া হয়েছে, যার উত্তর হ্যাঁ বা না দিয়ে দেওয়া যায়।
২২. বইকি: ঔচিত্য, নিশ্চয়তা, আগ্রহ প্রভৃতি নির্দেশক শব্দ। এ কি সত্য সকলই সত্য, হে আমার চির ভক্ত।
২৩. এ কি সত্য সকলই সত্য, হে আমার চির ভক্ত। বাক্যে ‘এ কি’ বিস্ময়সূচক।
২৪, এ কী? অর্থ এটি কোন বিষয়।
————————————
সূত্র: কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

Leave a Comment

য-ফলা বিধি: শব্দের প্রথমে য-ফলা ও য-ফলা আ-কার; শব্দের আদিতে কখন ব্য এবং কখন ব্যা হয়

ড. মোহাম্মদ আমীন

য-ফলা বিধি: শব্দের প্রথমে য-ফলা ও য-ফলা আ-কার; শব্দের আদিতে কখন ব্য এবং কখন ব্যা হয়

শব্দের আদিতে কখন ব্য এবং কখন ব্যা দেবেন?

‘ব্য’ আর ‘ব্যা’ নিয়ে বানানে অনেককে বিভ্রান্তিতে পড়তে হয়। বিশেষ করে ‘য-ফলা’ যদি শব্দের শুরুতে ব্যবহৃত ব-ধ্বনির সঙ্গে হয় তাহলে বিভ্রান্তি মারাত্মক হয়ে ওঠে।
কয়েকটি ব্যতিক্রম (ব্যক্তি এর উচ্চারণ বেক্‌তি) ব্যতিরেকে শব্দের আদিতে ব্যবহৃত ‘ব্য’ ও ‘ব্যা’-এর উচ্চারণ সাধারণত অভিন্ন।উচ্চারণ একই হওয়া সত্ত্বেও কোথাও ‘ব্য’ , আবার কোথায় ‘ব্যা’ দিতে হয়। তাই বানান লেখার সময় লেখক দ্বিধায় পড়ে যান। এই দ্বিধা দূরীভূত করার জন্য নিচের নিমোনিকগুলো খেয়াল করতে পারেন।
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

. শব্দের আদিতে /ব্য/: /বি-/ উপসর্গের পর /অ/-বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া তৎসম শব্দ সন্ধিবদ্ধ হয়ে /ব্য/ হয়। যেমন: বি+অগ্র= ব্যগ্র; বি+অঙ্গ= ব্যঙ্গ; বি+অক্ত= ব্যক্ত, ব্যক্ত+ই= ব্যক্তি, বি+অঞ্জন= ব্যঞ্জন, বি+অতিক্রম= ব্যতিক্রম, বি+অতিব্যস্ত= ব্যতিব্যস্ত, বি+অতিরেক= ব্যতিরেক, ব্যত্যয়= বি+অত্যয়, বি+অধিকরণ= ব্যধিকরণ, বি+অবধান= ব্যবধান, বি+অবসায়= ব্যবসায়, বি+অবস্থা= ব্যবস্থা, বি+অবহার= ব্যবহার; বি+অভিচার= ব্যভিচার, বি+অয়= ব্যয়, বি+অর্থ=ব্যর্থ, বি+অস্ত= ব্যস্ত। অনুরূপ: ব্যঙ্গাত্মক, ব্যঙ্গোক্তি, ব্যজন, ব্যঞ্জনা, ব্যতিক্রম, ব্যতিব্যস্ত, ব্যতিরেক, ব্যতিহার, ব্যতীত, ব্যপদেশ, ব্যবচ্ছিন্ন,ব্যবচ্ছেদ, ব্যবসায়ী, ব্যবস্থাপক, ব্যবহৃত, ব্যষ্টি।

ব্যতিক্রম: /বি-/ উপসর্গ দিয়ে শুরু হয়নি এমন কিছু শব্দের বানানের শুরুতে /ব্য/ দেখা যায়। যেমন: ব্যথা, ব্যথিত, ব্যথী। মনে রাখবেন ব্যথা নিরাকার। তাই তার বানানেও আ-কার নেই। ব্যথা অনুভব করা যায়, আ-কার নেই বলে দেখা যায় না।
২. শব্দের আদিতে /ব্যা্/ এর প্রয়োগ: /বি-/ উপসর্গের পর /আ/ বর্ণ দিয়ে শুরু হওয়া তৎসম শব্দ সন্ধিবদ্ধ হলে /ব্যা/ হয়। যেমন: বি+আকুল = ব্যাকুল; বি+ আঘাত= ব্যাঘাত, বি+আখ্যা= ব্যাখ্যা, বি+আধি= ব্যাধি, বি+ আহত= ব্যাহত। অনুরূপ: ব্যাকরণ, ব্যাদান, ব্যাপক, ব্যাপার, ব্যাপী, ব্যাপৃত, ব্যাপক, ব্যাপ্ত, ব্যাপ্তি, ব্যায়াম, ব্যাহত।
৩. বিদেশি শব্দের বানানে অবিকল্প /ব্যা/: বিদেশি শব্দের বানানে অবিকল্প /ব্যা/ হয়, /ব্য/ হয় না। যেমন: ব্যাংক, ব্যাগ, ব্যাজ, ব্যাট, ব্যাটারি, ব্যাডমিন্টন, ব্যান্ড, ব্যান্ডেজ, ব্যাপটিস্ট, ব্যানার, ব্যারাক, ব্যারিস্টার, ব্যালট, ব্যালে, ব্যারিস্টার, ব্যারোমিটার ইত্যাদি। বিদেশি ও অতৎসম শব্দ পেলে চোখমুখ বন্ধ করে শব্দের প্রথমে ‘ব্যা’ দিয়ে দিন। বৈয়াকরণগণ আপনার কোনো ক্ষতি করতে পারবে না।

শব্দের বানানে য-ফলা-আকার: নিমোনিক

১. বিদেশি শব্দের বাংলা বানানের প্রথম বর্ণে য-ফলা চিহ্ন সর্বদা আ-কার (্যা) নিয়ে বসে। সুতরাং, বিদেশি শব্দের বানানের প্রথমে বর্ণে য-ফলা প্রয়োজন হলে তা আ-কার-সহ দেবেন। যেমন—
অ্যাকাডেমি, অ্যাটম, অ্যাটনি, অ্যাডভোকেট, অ্যান্টিবায়োটিক, অ্যান্টিসেপটিক, অ্যান্টেনা, অ্যাফিডেভিট, অ্যামনেস্টি, ক্যানসার, ক্যামেরা, ক্যাম্পাস, ক্যালসিয়াম, গ্যালারি, গ্যাস, গ্যালন, চ্যানেল, জ্যাকেট, ট্যানারি, ট্যাবলেট, ট্যাক্স, ট্যাক্সি, ট্যাংক, ড্যাশ, প্যাকেট, প্যাট্রল, প্যাডেল, প্যান্ডেল, প্যারা, প্যারাশুট, ফ্যাসিস্ট, ফ্যাসিবাদ, ফ্যাশন, ফ্যান, ফ্যাক্স, ব্যাংক, ব্যাকটেরিয়া, ব্যাগ, ব্যানার, ব্যান্ড, ব্যাবসা, ব্যারিস্টার, ব্যালট, ব্যারোমিটার, ভ্যান, ভ্যাকসিন, ম্যাংগানিজ, ম্যাক্সি, ম্যাগাজিন, ম্যাচ, ম্যাজিস্ট্রেট, ম্যাডাম, ম্যাজিক, ল্যাংবোট, ল্যান্ড, ল্যাবরেটরি, ল্যামিনেশন, ল্যাম্প, শ্যাম্পু, শ্যাম্পেন, স্যাকরা (ফারসি), স্যানাটোরিয়াম, স্যান্ডউইচ, স্যান্ডেল, স্যার, হ্যাজাক, হ্যাট্রিক, হ্যান্ডনোট, হ্যান্ডবিল, হ্যান্ডশেক, হ্যাট প্রভৃতি।
২. অতৎসম শব্দের বানানের প্রথম বর্ণে য-ফলা চিহ্ন আ-কার (্যা) নিয়ে বসে। অতএব, অতৎসম শব্দের বানানের প্রথমে য-ফলা প্রয়োজন হলে তা আ-কার-সহ দেবেন। যেমন—
অ্যাঁ, ক্যাঁচ, ক্যাঁচরক্যাঁচর,চ্যাঁচানো, চ্যাংড়া, চ্যালা, ছ্যাবলা, ছ্যামড়া, ছ্যাঁকা, ছ্যাঁদা, জ্যান্ত, জ্যাঠা, ঝ্যাঁটা, ট্যাঁক, ট্যাটা, ঠ্যাকা, ঠ্যালাগাড়ি, ঠ্যাসানো, ড্যাবড্যাব, ড্যাকরা, ত্যাঁদড়, ত্যাড়া, ত্যারচা, থ্যাঁতলা, থ্যাবড়ানো, ধ্যাৎ, ন্যাংটো, ন্যালা, ন্যাকা, ন্যাকড়া, ন্যাড়া, প্যাঁক, প্যাঁচা, প্যাঁদানি, ফ্যালনা, ফ্যালফ্যাল, ব্যাঙাচি, ব্যাটা, ভ্যাংচানো, ভ্যানভ্যান, ভ্যাবাচ্যাকা, ভ্যাপসা, ম্যাজম্যাজ, ম্যাদামারা, ল্যাং, ল্যাংটা, ল্যাজ, ল্যাটা, ল্যাতপ্যাত, ল্যাদাপোকা, শ্যাওলা, স্যাঁতসেঁতে, হ্যাটা,  হ্যাংলা, হ্যাঁ, হ্যাঁগা প্রভৃতি। নিমোনিকটির ব্যতিক্রম নেই বললেই চলে। অতএব, বিদেশি ও অতৎসম শব্দের বানানের প্রথম বর্ণে য-ফলা আবশ্যক হলে তা আ-কার-সহ দেবেন। বিদেশি এবং অতৎসম শব্দের বানানের প্রথমে য-ফলা সর্বদা আ-কার নিয়ে বসে। যেমন: অ্যাডমিন, অ্যাকাউন্ট, চ্যালা, চ্যাপটা, জ্যাঠা, ড্যাশ, ঢ্যাঁড়শ, ব্যাংক, ট্যাংক, ধ্যাৎ, ত্যাড়া, ত্যাঁদড়ামি, ত্যাঁদড়, ন্যাকড়া, ন্যাড়া, ন্যাতানো, ন্যাকামি, প্যাক, ফ্যাক্স, ফ্যাশন, ফ্যাঁকড়া, ফ্যাকাশে, ফ্যাসিবাদ, ভ্যাবাচ্যাকা, ভ্যান, ব্যাট, ব্যাটা, ব্যানার, ব্যান্ডসংগীত, ম্যাগাজিন, ম্যাচ, ম্যানেজার, ম্যালেরিয়া, ম্যাক্সি, র‌্যাক, র‌্যালি, ল্যাংড়া, ল্যাজ, ল্যাপটপ, ল্যান্ড, ল্যাবরেটরি, শ্যালক, শ্যাম্পু, স্যানাটোরিয়াম, স্যান্ডউইচ, স্যাকরা, হ্যান্ডবিল, হ্যাজাক, হ্যাংলামি — ।
সূত্র: ব্যবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

Leave a Comment

পদ পদবি পেশা: ঠাকুর চৌধুরি চৌধুরী হাওলাদার হাবিলদার হালদার; তোপ তোপা তোপাদার তপাদার তফাদার, মল্লিক মৃধা চোব চোবদার চোবল শিকদার

ড. মোহাম্মদ আমীন

পদ পদবি পেশা: ঠাকুর চৌধুরি চৌধুরী হাওলাদার হাবিলদার হালদার; তোপ তোপা তোপাদার তপাদার তফাদার, মল্লিক মৃধা চোব চোবদার চোবল শিকদার

পেশা ও পদবি: ‘পেশা’ ও ‘পদবি’-র মধ্যে পার্থক্য কী? ‘পদবি’ না কি ‘পদবী’ কোন বানানটি সঠিক? পেশা: বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষ্য হিসেবে ব্যবহৃত ফারসি উৎসের ‘পেশা’ অর্থ— জীবিকার উপায় ও বৃত্তি। প্রদীপচন্দ্র সাহার পেশা ব্যবসায়। পদবি: তৎসম ‘পদবি (√পদ্‌+অবি)’ অর্থ (বিশেষে)”১. পারিবারিক নাম, surname (আব্দুল হালিম’-এর পদবি (surname) ‘হালিম’) ২. কুল বা বংশজ্ঞাপক নাম (দাশ, চৌধুরী, ঠাকুর, বর্মণ, হালদার, খন্দকার )। শব্দটির সঠিক বানান ‘পদবি’; উচ্চারণ /পদোবি/। আচার্য্য পদবিধারীদের এই পেশায় অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

হাওলাদার হাবিলদার ও হালদার: আরবি ‘হাওলা’ ও ফারসি ‘দার’ মিলে হাওলাদার। অর্থ (বিশেষ্যে) ১. পদবিবিশেষ। ২. ‘অধুনালুপ্ত’ হাওলাজমির মালিক বা ভোক্তা। উচ্চারণ /হাও্‌লাদার্‌/। প্রসঙ্গত, ‘হাওলাজমি’ অর্থ অষ্টাদশ শতকে প্রচলিত আইনের অধীন বিশেষ শর্তে বিলি করা নিষ্কর জমি। আরবি ‘হাওলা’ ও ফারসি ‘জমি’ নিয়ে ‘হাওলাজমি’ শব্দটি গঠিত। হাবিলদার: আরবি ‘হাবিল’ ও ফারসি ‘দার’ মিলে হাবিলদার। অর্থ (বিশেষ্যে) সিপাইদের নায়ক; নির্দিষ্ট সংখ্যক সিপাইর সর্দার। উচ্চারণ /হাবিল্‌দার্/। হালদার: আরবি ‘হাল’ ও ফারসি ‘দার’ মিলে হালদার। অর্থ (বিশেষ্যে) মধ্যমানের পুলিশ বা সামরিক কর্মী। ২. পদবিবেশেষ। উচ্চারণ /হাল্‌দার্‌/। এখানে ‘হাল’ অর্থ (বিশেষ্যে) দশা, অবস্থা।

তোপ তোপা: তোপাদার তপাদার তফাদার: তফাদার পদবিটির উৎস বানান— তোপদার/তোপাদার। যা থেকে এসেছে তপাদার। এই তপাদার থেকে এসেছে তফাদার। এটি তুর্কি উৎসের শব্দ। তুর্কি উৎসের বাংলা শব্দ ‘তোপ’ অর্থ— গোলা ছোড়া যায় এমন আগ্নেয়াস্ত্র, কামান। তোপ থেকে তোপা। তোপা অর্থ— কামান ছোড়া। কামান দাগা বা গোলা নিক্ষেপ করার দায়িত্বে নিয়োজিত কিছু সংখ্যক সৈনিকের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীকে বলা হতো— তোপদার বা তোপাদার। পরবর্তীকালে কিছু কিছু এলাকায় তোপদার শব্দটির বানান পরিবর্তিত হয়ে তফাদার হয়ে যায়। তফা হচ্ছে তুর্কি উৎসের বাংলা তপ/তপা শব্দের অপভ্রংশ বা বিকৃত রূপ। এর সমপ্রকৃতির পদবি গোলদার, গোলন্দাজ প্রভৃতি। প্রসঙ্গত , ফারসি গোলন্দাজ থেকে গোলদার।

ঠাকুর: ‘ঠাকুর’ বাংলার শ্রেষ্ঠ কবি রবীন্দ্রনাথের পদবি হিসেবে বহুল পরিচিত একটি শব্দ। শব্দটি ছিল তুর্কি ভাষায় ‘তিগির/ তাগরি’।তুর্কি থেকে এসে শব্দটি সংস্কৃত ও প্রাকৃতে হয়ে যায় ‘ঠক্কুর’। বাংলায় ঠক্কুর থেকে হলো ‘ঠাকুর’। কেউ কেউ মনে করেন শব্দটির মূল উৎস ফারসি। যাই হোক, তুর্কি/ফারসি উৎসের শব্দ (তু. তাগরি/তিগির =দেবতা); স. ঠক্কুর> ঠাকুর। ঠাকুর কোনো বিশেষ ধর্ম বা সম্প্রদায়গত পদবি নয়। চৌধুরি, মজুমদার, মুস্তাফি প্রভৃতি পদবির মতো ঠাকুর পদবিও মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে ধারণ করতেন। যেমন: কোরেশী মাগন ঠাকুর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, তাহের উদ্দিন ঠাকুর, হরিদাস ঠাকুর। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ঠক্কুর থেকে উদ্ভূত ঠাকুর অর্থ (বিশেষ্যে) ভগবান, দেবতা, প্রতীমা, প্রভু, শ্রদ্ধেয় ব্যক্তি, গুরু, ব্রাহ্মণ, পুরোহিত, পাচক ব্রাহ্মণ, পদবিশেষ। স্ত্রীলিঙ্গে ঠাকুরানি। পদবির চেয়ে অন্যান্য অর্থ বা সম্বোধনে ঠাকুর শব্দটির বহুল ব্যবহার লক্ষণীয়। এক্ষেত্রে শব্দটি হিন্দু সম্প্রদায়ে বহুল প্রচলিত। যেমন, ঠাকুরদা, ঠাকুরমা, ঠাকুর ঘর, ঠাকুরজামাই, ঠাকুরঝি, ঠাকুরদালান, ঠাকুরপূজা, ঠাকুরপো, ঠাকুরমশাই, ঠাকুরাল, বাবুর্চি ঠাকুর, হিন্দু ঠাকুর, মুসলিম ঠাকুর প্রভৃতি।ঠাকুরজামাই তো খুবই পরিচত সম্বোধন:
“বলি ও ননদি আর দুমুঠো চাল ফেলে দেয় হাঁড়িতে
ঠাকুরজামাই এল বাড়িতে
ও ননদি ঠাকুরজামাই এলো বাড়িতে—”।

মৃধা: আমার এক বন্ধুর নাম জাফর মৃধা। ডাকতাম ‘মৃধা’। এখন এই ‘মৃধা’ শব্দের অর্থ কী? জানতে চেয়েছেন, জনেক শুবাচি। ‘মৃধ’ থেকে ‘মৃধা’। তৎসম ‘মৃধ [মৃ+ধ (ধক্‌)-ধি]’ অর্থ ১. যুদ্ধ, সমর। ২. যা শোণিতার্দ্র হয়। ৩. যাতে মরে। ৪. হত বা আহত হবার কারণে যা শোণিতলিপ্ত হয়। সে হিসেবে ‘মৃধা’ কথার শাব্দিক অর্থ যোদ্ধা। তবে অভিধানমতে, ‘মৃধা’ শব্দের আভিধানিক অর্থ লাঠিয়াল, দশজন গদাধারী পদাতিক সৈন্যের প্রধান, জমিদারি আমলে পাইক বা লাঠিয়ালের কিয়দংশের সর্দার; বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের পদবিবিশেষ। যারা লাঠিয়ালের দায়িত্ব পালন করত, নিয়োগকর্তার পক্ষে যুদ্ধ করত তাদেরও ‘মৃধা’ বলা হতো। শব্দটি উত্তর পুরুষগণও পদবি হিসেবে ব্যবহার করত। স্মর্তব্য, তখন পূর্বপুরুষের বা নিজের পেশা বা পদবি নামের সঙ্গে যোগ করার রেওয়াজ ছিল। এই হিসেবে এটি বাঙালি হিন্দু-মুসলমানের একটি পদবি হয়ে যায়। যেমন: জিয়াউল হক মৃধা, দেবাশীষ মৃধা।

মল্লিক:শুবাচির প্রশ্ন: নামের শেষে ‘মল্লিক’ পদবি দেখা যায়। পদবিটির উৎস কী।“মল্লিক শব্দটি আরবি মলিক শব্দ হতে উদ্ভূত। শব্দটি হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের পদবি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। যেমন: রঞ্জিত মল্লিক, আজিজুর রহমান মল্লিক (এ আর মল্লিক)।

চোব চোবদার চোবল: ‘চোব’ ফারসি উৎসের শব্দ। এর অর্থ (বিশেষ্যে) লাঠি, দণ্ড। ‘চোব’ ও ‘দার’ মিলে চোবদার। ‘চোবদার’ অর্থ দণ্ডবাহক, লাঠিয়াল, লাঠিসোঁটাধারী অনুচর, দণ্ডধর। লাঠিয়াল পেশায় নিযুক্তদের বলা হতো চোবদার। এখনও অনেকের নামে ‘চোবদার’ পদবি দেখা যায়। ‘চোবল’ সাঁওতালি উৎসের দেশি শব্দ। অর্থ (বিশেষ্যে) নখ বা দাঁত দিয়ে আকস্মিক আক্রমণ; ছোবল, খাবল।

শিকদার:‘শিকদার’ ফারসি উৎসের শব্দ। অর্থ (বিশেষ্যে) ভূমি-রাজস্ব আদায়ের কর্মচারী; পদবিবিশেষ। যারা ভূমি রাজস্ব আদায়ের কাজে নিয়োজিত থাকত তাদের ‘শিকদার’ বলা হতো। মুসলিম শাসনামলে পদসমূহ প্রায়শ বংশপরসম্পরায় পরিব্যাপ্ত হতো। যারা ‘শিকদার’ পেশায় জড়িত থাকত তাদের অনেকে নামের আগে বা পরে ‘শিকদার’ পদবি ব্যবহার করত।

চৌধুরি পদবির উদ্ভব: হিন্দি চৌধুরি অর্থ (বিশেষ্যে.) নৌ হস্তী অশ্ব ও পদাতিরূপ চার শক্তির অধিকারী সামন্ত রাজা; গ্রামের মোড়ল, নগরের প্রধান ব্যবসায়ী, পদবিশেষ। উপমহাদেশে দীর্ঘকাল থেকে রাজা-সম্রাটদের নিয়োজিত নৌ হস্তী অশ্ব ও পদাতিরূপ চার শক্তির অধিকারী সামন্ত রাজাকে চৌধুরি পদবিতে ভূষিত করা হতো। মুসলিম আমলেও পদবিটি কিছুট একই ধরন নিয়ে কিছুকাল অক্ষুণ্ন থেকে যায়। তবে তার সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি করা হতে থাকে। সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় চৌধুরি পদের অধিক্ষেত্র কমে যায়। ফলে তাদের ক্ষমতা এবং জৌলুশ পূর্বের তুলনায় কমে যেতে থাকে। ইংরেজ আমলে প্রাচীন চৌধুরি পদবির দায়িত্ব ও ক্ষমতা বিলোপ করে ইংরেজদের বশংবদ প্রভাবশালী কিছু ভূস্বামীদের অঞ্চলভেদে চৌধুরি পদবিতে ভূষিত করা হয়। এরপর গ্রামের মোড়ল এবং নগরের অনেক ব্যবসায়ীকেও এই পদবি প্রদান করা হয়। ফলে চৌধুরি পদবি তার সৃষ্টিকালীন বিশাল মর্যাদা হারিয়ে অনেকটা সাধারণ মর্যাদার হয়ে যায়। এই চৌধুরিদের কাজ ছিল ইংরেজ প্রশাসকদের সন্তুষ্ট রাখা। বিনিময়ে কিছু সরকারি সুবিধা তার ভোগ করতে পারত। চৌধুরির সঙ্গে স্থানবিশেষে মজুমদার, রায় প্রভৃতি পদবির উপস্থিতিও ছিল।এমন পদবিধারীদের জমিদার ও প্রশাসনে কিছুটা খাতির ছিল। চৌধুরি পদবি পেয়ে তারা খুশি হতো এবং সরকারের প্রতি আরও অনুগত হয়ে নির্দ্বিধচিত্তে আদেশ পালন করে যেত। উপাধিটি দেওয়া হতো ব্যক্তিকে। কিন্তু তা ব্যক্তি হতে উত্তরপুরুষ হয়ে প্রজন্মান্তরিত হতে থাকে। ফলে চৌধুরির সংখ্যা হুহু করে বেড়ে যায়। বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চলে চৌধুরি পদবিটা খুব জনপ্রিয় ছিল। নোয়াখালীতে মজুমদার এবং কুমিল্লায় রায় (বিশেষত হিন্দুদের) পদবির প্রচুর লোক ছিল। এখনো চট্টগ্রামে চৌধুরি, নোয়াখালীতে মজুমদার এবং কুমিল্লায় প্রচুর রায় পদবির লোক পাওয়া যায়। এজন্য বলা হয়:

নোয়াখালীর মজুমদার কুমিল্লার রায়
চট্টগ্রামের চৌধুরি জলে ভেসে যায়

পদ বনাম পদবি

পদ: তৎসম পদ /পদ্‌/ অর্থ (বিশেষ্যে)—
১. পা: (নিটোল পায়ে রিনিক ঝিনিক পায়েলখানি বাজে (মীরা দেব বর্মণ, শচিন দেব বর্মণ), যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে (রবীন্দ্রনাথ)।
২. চরণ: (চরণে ধরিয়া তব কহিব প্রকাশি গোপনে তোমারে, সখা, কত ভালোবাসি; রবীন্দ্রনাথ)।
৩. পদচিহ্ন, পদাঙ্ক, পদানুসরণ: আলো তার পদচিহ্ন, আকাশে না রাখে—
চলে যেতে জানে, তাই চিরদিন থাকে; রবীন্দ্রনাথ)।
৩. কবিতার পঙ্‌ক্তি বা চরণ: কালিদাসের কবিতার প্রতিটি পদ মুগ্ধকর।
৪. অধিকার, চাকুরি (রাজপদ): মন্ত্রী-পদ প্রধানমন্ত্রীর সন্তুষ্টির ওপর নির্ভরশীল।
৫. স্থান, বসতি (জনপদ): গৌড় ছিল একটি সমৃদ্ধ প্রাচীন জনপদ।
৬. উপাধি (পদগৌরব): পদগৌরব পতনের সূচনা।
৭. গুরুজনের অনুগ্রহ, আশ্রয় (পদাশ্রয়): তোমার পদাশ্রয় আমার প্রার্থনা।
৮. বিভিন্ন প্রকার আহার্য (রান্নার পদ): একুশ পদের রান্না করেছে তারা।
৯. বৈষ্ণব কবিদের রচিত গান (পদাবলি): বৈষ্ণব পদাবলি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম সম্পদ।
১০. (ব্যাকরণে) বিভক্তিযুক্ত শব্দ: পদ কয় প্রকার ও কী কী?
পদবি: তৎসম পদবি (তৎসম পদবি (√পদ্‌+অবি)পদ্‌+অবি) অর্থ (বিশেষে)”
১. পারিবারিক নাম, surname।
২. কুল বা বংশজ্ঞাপক নাম (দাশ, চৌধুরী, ঠাকুর, বর্মণ, হালদার)
.

Leave a Comment

বাসী বাসি টাটকা ভাল ভালো; ভালোবাসা ভালবাসি ও ভালোবাসি; দেশবাসি ও দেশবাসী

ড. মোহাম্মদ আমীন

বাসী বাসি ভাল ভালো; ভালবাসি ও ভালোবাসি; দেশবাসি ও দেশবাসী

বাসি ও বাসী: সোনা ফেসবুকের বার্তাঝুড়িতে তার প্রেয়সী ময়নাকে লিখলেন, তুমি কি আমাকে ভালোবাস? ময়নার উত্তর: খুব বাসি। সোনার প্রশ্নে ময়নার উত্তর কি যথাযথ হয়েছে? সোনা কিন্তু খুশি হতে পারেনি- ভালোবাসার কথায় ময়না এত হিসেবি কেন? ভালোবাসা কি পরীক্ষার সংক্ষিপ্ত প্রশ্নোত্তর? এমসিকিউ বা নৈর্ব্যক্তিক! সোনা যাই ভাবুক, রবীন্দ্রনাথ ভেবেছেন অন্য রকম:

“ভালো যদি বাস, সখী, কী দিব গো আর—.
কবির হৃদয় এই দিব উপহার ।।”

‘বাস’ আর ‘বাসি’ কি অভিন্ন? John Donne-ও বলেছেন, “For God’s sake hold your tongue, and let me love.” কথা বেশি বললে ভালোবাসা হবে কীভাবে? সোনা এটি বুঝে না কেন? সোনা, তুমি করো চুপ; আমি

মাঝখানে ড. মোহাম্মদ আমীন ডান পাশে অধ্যাপক হায়াৎ মামুদ।

বাসব ভালো খুব। বাসি মানে কী? ‘পচা’ নয় তো! বাসি তরকারি খাব না মা। ‘পচা’ বানানে আবার চন্দ্রবিন্দু দিয়ে বসবেন না। চন্দ্র পচা জায়গায় থাকে না। তাঁর একটা মর্যাদা আছে।চন্দ্র থাকে পাঁচে, বাঁশে আর আঁশে। কাচেও থাকে না সে; ভেঙে যাবে বলে, থাকে জলেভাসা হাঁসে। হাঁটা আর হাঁটুতে, ঝগড়ার ঝাঁটিতে, শ্রীকৃষ্ণের বাঁশিতে। মাস্টার দা-র ফাঁসিতে।মায়ের আঁচলে আর জিবে-জল তেঁতুলে।

.
বাসি: সংস্কৃত ‘বাসিত’ থেকে উদ্ভুত বাসি অর্থ— (বিশেষণে) টাটকা নয় (বাসিভাত; বাসিভাত খেয়ে তার পেটের নাড়িভুঁড়ি মিছিল শুরু করে দিয়েছে।); আধোয়া (বাসি মুখ, বাসি মুখে কিছু খাওয়া ভালো নয়।); পুরানো (বাসি খবর; বাসি খবর আর কত পড়বে?)। অনুরূপ: ‘বেহেশত বাসি’ নয়; বেহেশতবাসী। জান্নাতবাসী, দেশবাসী, প্রবাসী, ভারতবাসী। 
.
-বাসী -বাসী: -বাসী শব্দের দুটি পৃথকভুক্তি রয়েছে। বানান একই হলেও দুটোর ব্যুৎপত্তি ও অর্থ ভিন্ন। সংস্কৃত বাসী (√বস্‌+ইন্) অর্থ — (বিশেষণে) বসবাস করছে এমন, বাসকারী। যেমন—শহরবাসী, গ্রামবাসী, গৃহবাসী ইত্যাদি। এটি বস্‌ ধাতুযোগে গঠিত। সংস্কৃত -বাসী (বাস+ইন) অর্থ— (বিশেষণে) বস্ত্রধারী (চীরবাসী)।
.
টাটকা: টাটকা খবর। এখানে ‘টাটকা’ অর্থ কী?এখানে ‘টাটকা’ অর্থ সদ্যপ্রাপ্ত খবর বা তাজা খবর। ‘টাটকা’ হিন্দি উৎসের শব্দ। উচ্চারণ /টাট্‌কা/। অর্থ (বিশেষণে) ১. বাসি নয় এমন, তাজা (টাটকা সবজি)। ২. সদ্যপ্রাপ্ত, নতুন (টাটকা খবর)। ৪. গরম (টাটকা খাবার)। ৫. টাটকা মাল [সতেজ দ্রব্য, সতেজ মালামাল; কুমারী নারী (অশালীন অর্থে)]
ভাল ও ভালো:ভাল’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ forehead, brow, fate ইত্যাদি। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে শব্দটির অর্থ ললাট, কপাল, ভাগ্য, অদৃষ্ট প্রভৃতি। ‘ভালো’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ good, fair, excellent. বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ভালো শব্দের অর্থ উত্তম (ভালো সংবাদ), শোভন (ভালো আচরণ), কল্যাণকর (ভালো উদ্যোগ), সৎ (ভালো মানুষ), দক্ষ, অভিজ্ঞ (ভালো শিক্ষক), উৎকৃষ্ট (ভালো কাপড়), সুস্থ (ভালো শরীর), মেধাবী (ভালো ছাত্র), শুভ (ভালো ঘটনা), কাম্য ( সেটিই ভালো), চড়া( ভালো দাম), প্রকৃত (ভালো নাম) প্রভৃতি।
অতএব good প্রকাশে ‘ভালো’ লেখাই ভালো। black অর্থে লিখুন কালো কিন্তু yesterday/time/ সময় অর্থে লিখুন কাল। কাল শব্দের আরও কয়েকটি অর্থ আছে। যেমন : যম, মৃত্যু, অতিশয় ঠান্ডা প্রভৃতি।
.
ভালোবাসি আর ভালো বাসি: বাসি’ সাধারণত মন্দ জিনিস। তাই ‘ভালো বাসি’ হয় না, ‘মন্দ বাসি’ হয় কিংবা ‘খারাপ বাসি’ হয়। এই যেমন : বাসি তরকারি, বাসি মাংস, বাসি ভাত। বাত কিন্তু বাসি না-হলেও ভালো না— সতেজ হলেও শ-তেজ বর্জিত। যদিও অনেক সময় পোস্টার-লিফলেটে দেখা যায়, ঢাকাবাসি, রংপুর বাসি। ‘ভালোবাসি’ সাধারণত ভালো বিষয়। তাই ‘মন্দবাসি’ হয় না, ‘ভালোবাসি’ হয়। তার মানে ভালোবাসার জিনিসকে কাছে রাখতে হয়। যেমন: আমি তোমাকে ভালোবাসি। আমি তো মাকে ভালোবাসি। আমি দ্বেষ ভালোবাসি না, কিন্তু দেশ ভালোবাসি। ‘বাসা’ কিন্তু ভালোও হতে পারে মন্দও হতে পারে। তাই ‘ভালো বাসা’ আর ‘মন্দ বাসা’ দুটোই চলে। দুটোই দেখা যায়, কিন্তু ‘ভালোবাসা’য় দুটো চলে না। শুধু ভালোটাই চলে। যদি দুটোই চলে তো সেটা আর ভালোবাসা থাকে না। মনে রাখবেন, ভালোটাই মানে ভালো টাই নয়। আবার, ভালো বাসা সবসময় ভালোবাসা নয়, তবে ভালোবাসা সবসময় ভালো বাসা।
‘ভাল’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ forehead, brow, fate ইত্যাদি। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে ভাল অর্থ: ললাট, কপাল, ভাগ্য, অদৃষ্ট । “ভাল আমার খারাপ, বাপে খায় গাঁজা, পুতে খায় সারাব।”
.
ভাল ও ভালো: ভাল’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ forehead, brow, fate ইত্যাদি। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে শব্দটির অর্থ ললাট, কপাল, ভাগ্য, অদৃষ্ট প্রভৃতি। ‘ভালো’ শব্দের ইংরেজি প্রতিশব্দ good, fair, excellent.
“সাগর উদাস সুর দিয়েছে বৃষ্টি দিল তাল
তুমি আমার নতুন জীবন স্বপ্ন দেউল ভাল।” (স্যমন্তক, ড. মোহাম্মদ আমীন)।
.
বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, ভালো শব্দের অর্থ উত্তম (ভালো সংবাদ), শোভন (ভালো আচরণ), কল্যাণকর (ভালো উদ্যোগ), সৎ (ভালো মানুষ), দক্ষ, অভিজ্ঞ (ভালো শিক্ষক), উৎকৃষ্ট (ভালো কাপড়), সুস্থ (ভালো শরীর), মেধাবী (ভালো ছাত্র), শুভ (ভালো ঘটনা), কাম্য ( সেটিই ভালো), চড়া( ভালো দাম), প্রকৃত (ভালো নাম) প্রভৃতি। অতএব good প্রকাশে ‘ভালো’ লেখাই ভালো। black অর্থে লিখুন কালো কিন্তু yesterday/time/ সময় অর্থে লিখুন কাল। কাল শব্দের আরও কয়েকটি অর্থ আছে। যেমন : যম, মৃত্যু, অতিশয় ঠান্ডা প্রভৃতি।
ভালো আছি, ভালো থেক
আকাশের ঠিকানায় চিঠি লিখ।” (রুদ্র মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ)
.
ভালোবাসা অর্থ love। ভালোবাসা প্রকাশে ভালবাসা না লিখে ভালোবাসা লিখুন। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানে ভালবাসা নেই, কেবল ভালোবাসা আছে। সবাই ভালোবাসা করে, আপনি একা একা কার সঙ্গে ভালবাসা করবেন। চলুন সবাই ভালোবাসা করি।
আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি— রবীন্দ্রনাথ।
.
কালো: black, কৃষ্ণ প্রভৃতি রং অর্থে লিখুন কালো। রবীন্দ্রনাথ যেমন লিখেছেন:
“কৃষ্ণকলি আমি তারেই বলি, কালো তারে বলে গাঁয়ের লোক।
মেঘলা দিনে দেখেছিলেম মাঠে, কালো মেয়ের কালো হরিণ-চোখ।”
.
কাল: yesterday/time/ সময় অর্থে লিখুন কাল। আগামীকাল, গতকাল, সকাল, বিকাল, আজকাল প্রভৃতি।
কাল সারা রাত ছিল স্বপনের রাত
স্মৃতির আকাশে যেন বহুদিন পর
মেঘ ভেঙে উঠেছিল পূর্ণিমা চাঁদ।”( বেবী নাজনীন-এর কণ্ঠে শ্রুত)
কাল শব্দের আরও কয়েকটি অর্থ আছে। যেমন: যম, মৃত্যু, অতিশয় ঠান্ডা প্রভৃতি। যেমন: কালজ্বর, কালবেলা, কালবৈশাখি, কালভৈরব, কালরাত্রি, কালনাগ।
ওই বুঝি কালবৈশাখি
সন্ধ্যা-আকাশ দেয় ঢাকি
ভয় কি রে তোর ভয় কারে দ্বার খুলে দিস চারধারে
শোন দেখি তোর হুমকারে নাম তোরই যায় ডাকি। (রবীন্দ্রনাথ)

Leave a Comment

আনন্দ খুশি খুশী শান্তি সুখী, আশি আশী আশীর্বাদ; বিমর্শ বিমর্ষ; দুঃখী বনাম দুখী, কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে

ড. মোহাম্মদ আমীন

আনন্দ খুশি খুশী শান্তি সুখী, আশি আশী আশীর্বাদ; বিমর্শ বিমর্ষ; দুঃখী বনাম দুখী, কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে

আনন্দ খুশি খুশী শান্তি আর সুখী: আনন্দ খুশি শান্তি আর সুখী এদের— তফাত কী? আমরা আনন্দ পাই, কিন্তু খুশি হই। আনন্দ পেতে হয়, খুশি হতে হয়। তাই আনন্দ না পেলে খুশি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। ‘খুশী’ ভুল বানান। ‘খুশী’ লিখলে আপনার ‘খুশি’ কখনো সুখী হবে না। শান্তি পাওয়ার বিষয়, হওয়ার বিষয় নয়। সুখী হওয়ার বিষয়, পাওয়ার বিষয় নয়। তাই শান্তি না পেলে সুখী হওয়া যায় না। আনন্দ আর শান্তি পেলেই কেবল খুশি আর সুখী হওয়া যায়।মনে রাখবেন, খুশি কিন্তু সুখী। সুখী হতে হলে খুশি বানানে ই-কার দিতে হবে। আগে খুশি তারপর সুখী। খ-এর পর ই-কার, স-এর পর ঈ-কার।

আশি আশী আশীর্বাদ ও আশীর্বাদি: আশি আশী: সংস্কৃত আশীতি থেকে উদ্ভূত খাঁটি বাংলা শব্দ আশি অর্থ— (বিশেষ্যে) ৮০ সংখ্যা এবং (বিশেষণে) ৮০ সংখ্যক। সংস্কৃত আশী (আ+√শাস্+ক্বিপ) অর্থ—

মাঝখানে অধ্যাপক আবুল কাসেম ফজলুল হক, ডানে ড. মোহাম্মদ আমীন, অধ্যাপক মিজানুর রহমান খান।

(বিশেষ্যে) সাপের বিষদাঁত। ওষুধ হিসেবে সেবনের জন্য তিনি আশি টাকা দিয়ে এক ফোঁটা আশী কিনে আনলেন। আশীর্বাদ ও আশীর্বাদি: দুটোই তৎসম শব্দ। আশীর্বাদ অর্থ— (বিশেষ্যে) কল্যাণ বা মঙ্গলসূচক উক্তি, শুভেচ্ছা, দোয়া, মঙ্গল কামনা। আশীর্বাদি অর্থ— আশীর্বাদের সঙ্গে প্রদেয় অর্থ বা উপহার। ইদের দিন আশীর্বাদের সঙ্গে পাঁচশ টাকা আশীর্বাদি পেয়ে খুশি কী খুশি!

.
খাসা খাসি: খাসা ও খাসি উভয় আরবি উৎসের শব্দ। খাসা: ‘খাসা’ আরবি ‘খাসাহ’ থেকে উদ্ভূত। অর্থ (বিশেষণে) ১. অতি উপাদেয়, সুস্বাদু। ২. চমৎকার। ৩. উত্তম, খুব ভালো। ৪. উৎকৃষ্ট; দামি। ৫. সুডৌল, সুন্দর। খাসি: ‘খাসি’ আরবি ‘খস্‌সি’ থেকে উদ্ভূত। অর্থ (বিশেষ্যে) ছিন্নমুষ্ক ছাগ (খাসির মাংসেত বিষয় আনিয়া মাখিল— সৈয়দ সুলতান)। (বিশেষণে) অণ্ডহীন বা নপুংসক (ডাক্তার সত্যই একটা নিষ্কর্মা খোদার খাশি— সৈয়দ মুজতবা আলী)।কসাই একটা খাসা খাসি এনে বলল, আপনার মতো খাসা লোকের এমন খাসা খাসির খাসা মাংস ছাড়া চলে না বই কি!

বিমর্শ বনাম বিমর্ষ: বিমর্শ অর্থ— বিতর্ক। উচ্চারণ /বিমর্‌শো/। বিমর্ষ অর্থ— অধৈর্য, দুঃখ, বিষাদ, দুঃখিত। উচ্চারণ /বিমর্‌শো/। বিমর্শ প্রতিযোগিতায় হেরে বালকটি বিমর্ষ হয়ে পড়ল। দাম্পত্যজীবনে অহেতুক বিমর্শ পুরো জীবনকে বিমর্ষ করে রাখে।

দুঃখী বনাম দুখী: দুঃখ দুখী: দুঃখী (দুঃখ+ইন্) অর্থ (বিশেষণে) ১. দুঃখে পতিত, ২. দরিদ্র দশায় পতিত। ‘দুখী’ হলো ‘দুঃখী’ শব্দের কোমল রূপ। যেমন, ‘দুখ’ হলো ‘দুঃখ’ শব্দের কোমল রূপ অতএব, দুঃখী ও দুখী এবং দুঃখ ও দুখ সববানানই শুদ্ধ।

“কাঁটা হেরি ক্ষান্ত কেন কমল তুলিতে
দুঃখ বিনা সুখ লাভ হয় কি মহিতে?” চরণটির রচয়িতা কৃষ্ণচন্দ্র মজুমদার (৩১শে মে, ১৮৩৪ – ১৩ই জানুয়ারি, ১৯০৭)। তাঁর প্রথম ও শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ “সদ্ভাব শতক” (ঢাকা, ১৮৬১)। এর অধিকাংশ কবিতা নীতিমূলক এবং হাফিজের ফারসি কবিতার ভাবালম্বনে রচিত। জন্মস্থান: খুলনা জেলার দিঘলিয়া উপজেলার সেনহাটি গ্রামে। ছেলেবেলায় তাঁর ছদ্মনাম ছিল রামচন্দ্র দাস, সংক্ষেপে রাম। তাই পরিণত বয়সে তিনি রামের ইতিবৃত্ত (১৮৬৮) নামের একটি আত্মচরিত রচনা করেন। তাঁর লেখা আর একটি বিখ্যাত পঙ্‌ক্তি: ‘চিরসুখী জন ভ্রমে কি কখন ব্যথিত বেদন বুঝিতে পারে’
খুশি ও সুখী নিমোনিক: পোস্টটি আমার মতো যাদের বাংলা বানানে সংশয় হয় তাদের জন্য। বিশেজ্ঞদের পড়ার প্রয়োজন নেই। ফারসি ‘খুশি’ শব্দের আভিধানিক অর্থ আনন্দ, সন্তোষ, ইচ্ছা, মর্জি প্রভৃতি। সংস্কৃত ‘সুখী (সুখ+ইন্)’ শব্দের আভিধানিক অর্থ সন্তুষ্ট, সুখভোগে অভ্যস্ত প্রভৃতি। বিদেশি শব্দ বলে ‘খুশি’ বানানে হ্রস্ব-ইকার এবং তৎসম বলে ‘সুখী’ বানানে ঈ-কার। তৎসম-অতৎস বা দেশি-বিদেশি নিয়ে অত জানার সুযোগ আমাদের মতো সাধারণ লোকের নেই। এগুলো বিশেষজ্ঞ পর্যাযের বিষয়। তাই শব্দদুটোর কোনটিতে ই-কার এবং কোনটিতে ঈ-কার হবে তা নিয়ে নিয়ে আমার সংশয় লেগে যায়। সংশয় কাটানোর জন্য আমি মনে মনে একটা কৌশল ঠিক করেছি। যেমন : সখী বানানে ঈ-কার। সখী থেকে ধরে নিলাম সুখী। তাই সুখী বানানেও ঈ-কার।

ব্য ব্য: শব্দের আদিতে কখন ব্য এবং কখন ব্যা হবে

বদ্ধ বন্‌ধ বন্দ ও বন্ধ; পর্দাপ্রথা ও পর্দানশিন; মেয়াদোত্তীর্ণ গাঁজা

বাসী বাসি ভাল ভালো; ভালবাসি ও ভালোবাসি; দেশবাসি ও দেশবাসী

 #subach

Leave a Comment

পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত

ড. মোহাম্মদ আমীন

পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত

 বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে বাংলাদেশের নাম ছিল পূর্ব পাকিস্তান। তখন জাতীয় সংগীত কী ছিল? ‘পাকিস্তান জিন্দাবাদ’ গানটি ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দে পূর্ব পাকিস্তানের জাতীয় সংগীত এবং পাকিস্তানের বিকল্প জাতীয় সংগীত হিসেবে গৃহীত হয়। গানটি ১৯৭১ খ্রিষ্টাব্দে পাকিস্তানের অস্তিত্ব পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানে জাতীয় সংগীত হিসেবে হিসেবে গাওয়া হতো। ১৯৫৬ খ্রিষ্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে বাংলা ভাষায় গোলাম মোস্তফা লিখিত ‘তারানা-ই-পাকিস্তান’ নামক কবিতা থেকে গানটি গৃহীত। সুরকার ছিলেন খ্যাতিমান চলচ্চিত্র-নির্মাতা নাজির আহমেদ। আমার এখনও মনে পড়ে, প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ছাত্র থাকাকালীন ক্লাস শুরু হওয়ার পূর্বে অ্যাসিম্বেলিতে সুর করে গাইতাম—

পাকিস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ,
পাকিস্তান জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ—
.
পূর্ব বাংলার শ্যামলিমায়, পঞ্চনদীর তীরে অরুণিমায়,
ধূসর সিন্ধুর মরু সাহারায়, ঝান্ডা জাগে যে আজাদ;
পাকিস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।
.
সীমান্তের হিম গিরির চূড়ায়, বিজয় নিশান তার আকাশে উড়ায়,
ঝিলাম বিপাশা প্রতিচ্ছায়ায়, পেল আজাদির স্বাদ;
পাকিস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।
.
সাম্য মৈত্রীর বন্ধন হার, তৌহিদি দীক্ষা কণ্ঠে যাহার,
তিস্তা বিতস্তা আজও মােছে তার, গ্লানি দুঃখ বিষাদ;
পাকিস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।
.
খাইবার দ্বারে তার পতাকাবাহী, মেঘনার কূলে যত বীর সিপাহি,
প্রাচ্য প্রতীচ্যের মিলন গাহি, দুনিয়া করে যে আবাদ;
পাকিস্তান জিন্দাবাদ, পাকিস্তান জিন্দাবাদ জিন্দাবাদ।

———————————–
কবি গোলাম মোস্তফা: জন্ম: ১৮৯৭ খ্রিষ্টাব্দ; মৃত্যু ১৩ই অক্টোবর ১৯৬৪ খ্রিষ্টাব্দ। তাঁর সাহিত্যকর্মের মূল বিষয় ছিল ইসলাম ও প্রেম। জন্মস্থান বর্তমান ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার অন্তর্গত মনোহরপুর গ্রাম। গোলাম মোস্তফার দ্বিতীয় ছেলে পাপেটনির্মাতা ও চিত্রশিল্পী মুস্তফা মনোয়ার। অস্কারজয়ী বাংলাদেশি নাফিস বিন জাফর তাঁর নাতি।
.
নাজির আহমেদ (১৯২৫খ্রি.– ১লা ফেব্রুয়ারি ১৯৯০): বাঙালি চলচ্চিত্রনির্মাতা। তিনি ১৯৫২ খ্রি. থেকে ১৯৬২ খ্রি. পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তান চলচ্চিত্র উন্নয়ন সংস্থার (অধুনা বাংলাদেশ চলচ্চিত্র উন্নয়ন কর্পোরেশন) প্রতিষ্ঠাতা নির্বাহী পরিচালক ছিলেন। ঢাকায় সর্বপ্রথম নির্মিত প্রামাণ্যচিত্র In Our Midst (১৯৪৭) এর নির্মাতা। তাঁর সহোদর ছোটো ভাই হামিদুর রহমান ছিলেন শহিদ মিনারের স্থপতি।

Leave a Comment

পাড় ও পার; আইল, পগারপার, দিঘি বনাম দীঘি

ড. মোহাম্মদ আমীন

পাড় ও পার; আইল, পগারপার, দিঘি বনাম দীঘি

পাড় ও পার: ‘পার’ ও ‘পাড়’ অনেক সময় একই অর্থ বোঝালেও প্রায়োগিক ধরন অনেক ক্ষেত্রে ভিন্ন। নদী, সমুদ্র ইত্যাদির তীর বোঝাতে ‘পার’, কিন্তু পুকুর, দিঘি, সরোবর ইত্যাদির ‘তীর’ অর্থে ‘পাড়’ ব্যবহার করা হয়। আবার ‘পার’ অর্থ, নদীর বিপরীত তীর (নদীর এ-পার ও-পার)। নিষ্কৃতি (পার পাওয়া) অর্থেও ‘পার’ ব্যবহৃত হয়। যেমন: অনেক কষ্টে বিপদ থেকে পার পাওয়া গেল। আবার প্রান্তদেশ (শাড়ির পাড়) বোঝাতেও ‘পাড়’ ব্যবহৃত হয়। সাধারণত বৃহৎ জলাশয়ের তীর ‘পার’ কিন্তু ছোটো জলাশয়ের তীর হচ্ছে ‘পাড়’। যেমন: নদীর পার, সাগরের পার, কিন্তু পুকুরের ‘পাড়’। আসলে কী এ ব্যাখ্য যথার্থ?

পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

‘পার’ সংস্কৃত শব্দ। সংস্কৃত ‘পার’ বলতে বোঝায় নদীর বিপরীত তীর বা কূল। এছাড়াও শব্দটি আরও বিভিন্ন অর্থ প্রকাশে ব্যবহৃত হয়। যখন বলা হয়, ‘গগন পারে সূর্য হাসে’; তখন এর অর্থ প্রান্তভাগ। যখন বলা হয়, ‘মাঠের পারে মাঠ, তার পারে হাট’; তখন ‘পার’ অর্থ বোঝায় সীমানা। যদি বলা হয়, ‘কৌশলটা কাজে লাগলে পার পাওয়া যাবে’; এখানে ‘পার’ অর্থ প্রতিকার পাওয়া। আবার নিষ্কৃতি, উদ্ধার, রেহাই প্রভৃতি অর্থেও পার লেখা হয়। যেমন: ‘দয়াল পার কর আমারে।’ এখানে পার অর্থ পরিত্রাণ। ‘সপ্ততল ভেদ করি বাণ হল পার, শত্রুরা কম্পমান, রেহাই নাহি আর।’ এখানে ‘পার’ বলতে এক পাশ ভেদ করে অন্য পাশ দিয়ে বের হয়ে যাওয়া। উত্তীর্ণ হওয়া অর্থেও ‘পার’ শব্দ ব্যবহার করা হয়। যেমন: ‘পরীক্ষার কঠিন বৈতরণী কোনও প্রকারে পার করলাম।’ ‘ভবসিন্ধু পার’। নিষ্কৃতি অর্থেও ‘পার’ শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। যেমন: ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা।’

‘পাড়’ শব্দের আভিধানিক অর্থ নদীর তীর, প্রান্ত, তট বা কূল, উঁচু জায়গা। সংস্কৃত পার, পাট বা পাটক থেকে শব্দটির উৎপত্তি। ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, পুকুর, জলায়শ বা কুয়োর চারিপাশের বেষ্টনী, খেতের আল প্রভৃতি হচ্ছে ‘পাড়’। পরিধেয় বস্ত্রের প্রান্তভাগ বোঝাতেও ‘পাড়’ শব্দ ব্যবহৃত হয়। এ ‘পাড়’ শব্দটির উৎস সংস্কৃত ‘পট্টি’ থেকে। আবার পায়ের চাপ দেওয়াও পাড়; যেমন ঢেঁকিতে পাড়। পায়ের ‘পাড়’ এসেছে সংস্কৃত ‘পাত্‌’ ধাতু থেকে।
.
আইল: আরবি ‘হা’ইল’ থেকে ‘আইল’ শব্দের উদ্ভব। অর্থ (বিশেষ্যে) জমির সীমানির্দেশক বাঁধ। ২. উঁচুপথ, জাঙ্গাল। ৩. পাড়, তীর। উচ্চারণ /আই্‌ল্‌/।
সূত্র: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে ব্যবহৃত বিদেশি শব্দের অভিধান, সংকলন ও সম্পাদনায় মোহাম্মদ হারুন রশিদ, প্রকাশক: বাংলা একাডেমি।
.
পগারপার: বাংলা পগার ও সংস্কৃত পার নিয়ে পগারপার (পগার+পার) শব্দটি গঠিত। পগার অর্থ জমির সীমা নির্ধারক অগভীর নালা; ডোবা, নালা, প্রাকার, দেওয়াল প্রভৃতি। পগারপার শব্দের পগার অর্থ: জমির সীমা নির্ধারক অগভীর নালা; প্রাকার, দেওয়াল, সীমানা প্রভৃতি। অন্যদিকে, পার অর্থ অতিক্রমণ। সুতরাং, পগারপার অর্থ: সীমানা পার হওয়া। সাধারণভাবে পগারপার অর্থ পালিয়ে সীমার বাইরে চলে যাওয়া। শব্দটির প্রায়োগিক অর্থ: ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছে এমন, এমনভাবে পালিয়ে যাওয়া যেন কেউ না ধরতে পারে। একদম নাগালের বাইরে চলে যাওয়া। বাংলা একাডেমি আধুনিক বাংলা অভিধানমতে, বাক্যে বিশেষণ হিসেবে ব্যবহৃত পগারপার সীমা বা নাগালের বাইরে গমন করেছে এমন; পলায়ন করেছে এমন, উধাও।
.

দিঘি না কি দীঘি: সংস্কৃত দীর্ঘিকা থেকে উদ্ভূত দিঘি অর্থ (বিশেষ্যে) খনন করা হয়েছে এমন গভীর ও বৃহদাকার স্থির জলাশয়, সরোবর। এটি খাঁটি বাংলা শব্দ। তাই ঈ-কার নেই। দিঘি বানানে দুটোই ই-কার। কীভাবে মনে রাখা যায়? মাটি কাটার জন্য কোদাল লাগে। মনে করুন; ই-কার কোদালের প্রতীক। তাই ‘দিঘি’ বানানে দুটোই ই-কার। ঈ-কার হলো মোচড়ানো কোদালের প্রতীক। এমন কোদাল দিয়ে মাটি কাটা যায় না।

সূত্র: বাংলা বানান কোথায় কী লিখবেন: প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.।

#subach

Leave a Comment

সন্ধি: নিরীহ কিন্তু নীরব নীরোগ; চক্ষু কিন্তু চক্ষূরোগ চক্ষূরাগ

ড. মোহাম্মদ আমীন

সন্ধি: নিরীহ কিন্তু নীরব নীরোগ; চক্ষু কিন্তু চক্ষূরোগ চক্ষূরাগ

স্বরবর্ণ, বর্গের তৃতীয়, চতুর্থ ও পঞ্চম বর্ণ কিংবা য্, র্ , ল্, ব্, হ্ পরে থাকলে সন্ধিতে বিসর্গের স্থানে ‘র্’ হয়। সৃষ্ট র্ পরবর্তী স্বরের সঙ্গে যুক্ত হয় কিংবা রেফ হয়ে পরবর্ণের মাথায় গিয়ে বসে। যেমন:
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

নিঃ+অক্ষর= নিরক্ষর, নিঃ+আহার= নিরাহার, নিঃ+ঈক্ষক= নিরীক্ষক, নি+ঈক্ষা= নিরীক্ষা, নিঃ+উপদ্রব= নিরুপদ্রব, নিঃ+গুণ= নির্গুণ, নিঃ+ঘোষ= নির্ঘোষ, নিঃ+জন= নির্জন, নিঃ+জীব= নির্জীব, নিঃ+দয়= নির্দয়, নিঃ+দোষ= নির্দোষ, নিঃ+ভয়= নির্ভয়, নিঃ+মূল= নির্মূল, নিঃ+লোভ= নির্লোভ এবং নিঃ+ঈহ= নিরীহ। তাই নিরীহ বানানের প্রথমে ই-কার।

.
অন্যদিকে,সন্ধিতে র বর্ণ পর পদের প্রথমে থাকলে প্রথম পদের ই-কার বা উ-কার পরবর্তী বিসর্গ লোপ পেয়ে যথাক্রমে ঈ-কার ও ঊ-কার হয়ে যায়। যেমন: নি+রক্ত= নীরক্ত, নিঃ+রত= নীরত, নিঃ+রদ= নীরদ, নিঃ+রস= নীরস, নিঃ+রাজন= নীরাজন, নিঃ+রোগ= নীরোগনিঃ+রব= নীরব, এবং চক্ষুঃ+ রোগ= চক্ষূরোগ। অনুরূপ চক্ষুঃ+রাগ= চক্ষূরাগ।
এজন্য নীরব ও নীরোগ বানানের প্রথমে ঈ-কার এবং চক্ষু কিন্তু চক্ষূরোগ ও চক্ষূরাগ। (এখানে নিঃ=নির্‌)।
.
নিমোনিক: নিরীহদের নীরব থাকতে হয়। আগে নিরীহতা তারপর নীরবতা। বর্ণমালায় ই, ঈ বর্ণের আগে। এজন্য নিরীহ বানানের প্রথমে ই-কার এবং নীরব বানানের প্রথমে ঈ-কার। নিরীহ ও নীরব বানান লেখার সময় সংশয় এলে মনে মনে বলতে থাকুন: নিরীহদের নীরব থাকতে হয়। আমি নিরীহ বলে নীরব। বিসর্গযুক্ত ‘ই-কার’ কিংবা ‘উ-কার’ এর পর ‘র’ থাকলে সন্ধির ফলে বিসর্গের পূর্বস্থ স্বরধ্বনি বৃদ্ধি পায়। এক্ষেত্রে ‘ই-কার’ ‘ঈ-কারে’ এবং ‘উ-কার’ ‘ঊ-কারে’ পরিবর্তিত হয়। এ নিয়মটি জানা না থাকলে বানানে ই-কার/ ঊ-কার সংক্রান্ত ভুল হওয়াটা নিতান্তই স্বাভাবিক।

নীরব কেন চক্ষূরোগ

নাই অংশ = নিরংশ, নাই অবলম্বন = নিরবলম্বন, নাই অভিমান = নিরভিমান কিন্তু নাই রব = নীরব এবং চক্ষুর রোগ = চক্ষূরোগ; কিন্তু কেন? কারণ
সন্ধির নিয়মানুসারে ‘র’ পরে থাকলে ই-কার ও উ-কার পরবর্তী বিসর্গ লোপ পায় এবং তার পূর্বস্বর দীর্ঘ হয়। যেমন :
নিঃ+রব = নীরব।
নিঃ+রস = নীরস
নি+রক্ত = নীরক্ত
নিঃ+রব = নীরব
নিঃ+রস = নীরস।
নিঃ+রোগ = নীরোগ।
নিঃ+ রজ = নীরজ
নিঃ+ রক্ত = নীরক্ত।
নিঃ + রত = নীরত।
নিঃ+ রন্ধ্র = নীরন্ধ্র।
চক্ষু+ রোগ = চক্ষূরোগ।
সূত্র: ব্যাবহারিক প্রমিত বাংলা বানান সমগ্র, পাঞ্জেরী পাবলিকেশনন্স লি.।

Leave a Comment

ভারতকে ভারতবর্ষ বলা হয় কেন; পাকিস্তান, আফগানিস্তান ও হিন্দুস্থান

ড. মোহাম্মদ আমীন
‘বর্ষ (√বৃষ্+অ)’ তৎসম শব্দ। উচ্চারণ /বর্‌শো/। অর্থ (বিশেষ্যে)—
  • বৎসর, বছর: শুভ নববর্ষ।
  • বৃষ্টি; মেঘ: যদি বর্ষে মাঘের শেষ, ধন্যি রাজার পুণ্য দেশ।
  • অঞ্চল, এলাকা দেশ: বৎস, এই বর্ষ আমার জন্য নয়।
  • পুরাণে বর্ণিত নয়টি ভূভাগ: ১. ভারতবর্ষ। ২. কিম্পুরুষ। ৩. হরি। ৪. রম্যক। ৫. হিরণ্ময়। ৬. উত্তরকুরু। ৭. ইলাবর্ত। ৮. ভদ্রাশ্ব ও ৯. কেতুমালা।
পুরাণে বর্ণিত নয় ভূভাগের একভাগ হলো ভারতবর্ষ। তাই ভারত নামের ভূখণ্ডটি ‘ভারতবর্ষ’ নামে পরিচিত। অধিকন্তু, ‘বর্ষ’ শব্দের আরেকটি অর্থ অঞ্চল, এলাকা, দেশ, রাজ্য । ভারতবর্ষ শব্দের বর্ষ অর্থ বছর (year) নয়; এলাকা, অঞ্চল, দেশ, রাজ্য। অর্থাৎ ‘ভারতবর্ষ’ অর্থ পুরাণে বর্ণিত নয়টি ভূভাগের প্রথমটি; ভারতদেশ, ভারতরাজ্য, ভরতের দেশ। কথিত হয়, এই অঞ্চল বা বর্ষ রাজা ভরতকে দান করা হয়েছিল। তাই এর নাম ভারতবর্ষ। স্বাধীনতার পর ভারতের সংবিধানে ও লোকমুখে ভারত নামটিই মান্যতা লাভ করে।
.
অভ্র বসু লিখেছেন, ‘ভারতবর্ষ’ শব্দটির ‘বর্ষ’ শব্দের অর্থ দেশ। ভরতের সন্ততি এই অর্থে ভারত শব্দের উদ্ভব। ভরত শব্দের ব্যুৎপত্তি ভৃ ধাতু থেকে।ভৃ+অত্= ভরত। দুষ্মন্ত এবং শকুন্তলার পুত্রের নাম ভরত,কারণ তিনি ভূপালনে কীর্তিমান ছিলেন। এ ভাবেও ভারত শব্দের উদ্ভব হতে পারে। হিন্দ্ বা হিন্দুস্তান বা india নামের উদ্ভব সিন্ধু শব্দ থেকে। ফারসিতে সিন্ধু হল হিন্দ্ বা হিন্দু। সেখান থেকেই লাতিন হয়ে গ্রিকে শব্দটা গেছে।লাতিনে পাওয়া যায় India শব্দটি।
পাকিস্তান, আফগানিস্তান, হিন্দুস্থান
 ‘স্তান’ ফারসি শব্দ এবং ‘স্থান’ সংস্কৃত শব্দ। পাক-ই-স্তান = পাকিস্তান এবং আফগান-ই-স্তান = আফগানিস্তান। তাই উৎস বিবেচনায় এই দুই শব্দের বানানে ‘স্থান’ লেখা সমীচীন নয়। যদিও শব্দের ব্যবহার, প্রয়োগ, প্রচলন বা জনপ্রিয়তা শব্দের উৎস কিংবা উৎপত্তির ধার ধারে না। অনেকে ‘আফগানিস্থান’ লিখে থাকেন। সৈয়দ মুজতবা আলী ‘বড়বাবু’ গ্রন্থে লিখেছেন, “ইরানের সঙ্গে আফগানিস্থানের মনের মিল নেই, এদিকে তেমনি আফগান পাকিস্তানীতে মন-কষাকষি চলছে।” সৈয়দ মুজতবা আলী কেন ‘পাকিস্তান’ ও ‘আফগানিস্তান’ নামের দুই দেশের নামের বানানে একটিতে ‘স্তান’ এবং অন্যটিতে ‘স্থান’ লিখেছেন তার কোনো ব্যাখ্যা আমার কাছে নেই। যদিও ফারসি ‘স্তান’ এবং সংস্কৃত ‘স্থান’ প্রায় সমার্থক। সুভাস ভট্টাচার্য ‘বাংলা প্রয়োগ অভিধান’ গ্রন্থে বলেছেন, “তবু ইসলামি দেশনামে ‘স্তান’ লেখাই রীতি এবং হিন্দুস্থান শব্দে ‘স্তান’ লেখা সমীচীন নয়। ‘হিন্দুস্থান’ নামের উর্দু উচ্চারণ ‘হিন্দোস্তাঁ’ হলেও দীর্ঘ কাল ধরে হিন্দুস্থান’ বানানই বাংলায় বহুল প্রচলিত।” হয়তো ‘হিন্দু’ আর ‘স্থান’ শব্দের অভিন্ন উৎসই এর অন্যতম কারণ।

Leave a Comment

প্রতীক্ষা আর অপেক্ষার পার্থক্য; কিস মিস, ক্যাচ মিস ও কিশমিশ; বিবাহ বনাম সাঙা

ড. মোহাম্মদ আমীন

প্রতীক্ষা আর অপেক্ষার পার্থক্য; কিস মিস, ক্যাচ মিস ও কিশমিশ; বিবাহ বনাম সাঙা

প্রতীক্ষা আর অপেক্ষার পার্থক্য: প্রথমে বলে রাখি সাধারণত ‘প্রতীক্ষা’ ও ‘অপেক্ষা’ উভয় শব্দের অর্থগত কোন পার্থক্য নেই। অপেক্ষা অর্থ প্রতীক্ষা, প্রতীক্ষা অর্থ অপেক্ষা। সহজভাষায় উভয় শব্দের পার্থক্য এত কম যে, অপেক্ষার স্থলে প্রতীক্ষা ও প্রতীক্ষার স্থলে অপেক্ষা লেখা যায়। প্রতীক্ষার চেয়ে অপেক্ষার ব্যবহার ব্যাপক। শব্দদ্বয়ের পার্থক্য এত সুক্ষ্ম যে, গভীরভাবে নিরীক্ষণ না করলে পার্থক্য অনুধাবন করা অসম্ভব। উদাহরণ: অপেক্ষার যন্ত্রণা প্রতীক্ষার প্রহর/ প্রতীক্ষার অবসান অপেক্ষার নহর।
পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

সূক্ষ্ণ পার্থক্যটি কী তা আরও বিশদ করা যায়:

প্রতীক্ষা অর্থে যা ঘটতে পারে সে বিষয়ের জন্য অপেক্ষা করা। যেমন: অধীরচিত্তে বসিয়া যুবক প্রেয়সীর প্রতীক্ষায়। প্রতীক্ষার সময় সাধারণত অপেক্ষার সময় থেকে দীর্ঘতর। যেমন: তোমার জন্য দুই ঘণ্টা অপেক্ষা করেছি।
প্রতীক্ষার অবসান হয় না গো সখি।
ধৈর্য, নির্ভরতা, কারণ, শঙ্কা প্রভৃতি অর্থেও অপেক্ষা ব্যবহৃত হয়। যেমন:
অপেক্ষা সফলতার সেতু।
বৃষ্টির অপেক্ষায় কৃষিকাজ বন্ধ।
অপেক্ষার যন্ত্রণা মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ।
একটি মন্তব্য : Mahin Dot Exe লিখেছেন, আমি ব্যাকরণ ভাল জানিনা। তবে মনে হয়েছে ‘প্রতীক্ষা’ এর ক্ষেত্রে এটি long term period, specific এবং এখানে একটা ফল বা অফল থাকবে আর ‘অপেক্ষা’ short term period এর ক্ষেত্রে এবং কোন ফলাফল হওয়ার আগেই এটা শেষ হতে পারে। উদাহরণ: “আমি তোমারি প্রতীক্ষায় থাকবো।” এখানে অপেক্ষার প্রহর (প্রতীক্ষা) ততদিন পর্যন্ত হবে যতদিন পর্যন্ত না উভয়ের মধ্যে মিলন/সাক্ষাত্ না ঘটে বা এমন কোন নিশ্চত খবর না আসে যে তার মৃত্যু হয়েছে। সুতরাং সাক্ষাত্ আর হচ্ছে না।
কিস মিস, ক্যাচ মিস ও কিশমিশ: কিস, মিস, ক্যাচ মিস এবং কিশমিশ অভিন্ন ছন্দের শব্দ হলেও অর্থে রয়েছে ব্যাপক পার্থক্য।
তোমার অধরে ওগো যে হাসির মধুমায়া- – –
“অধর নিশপিশ
নধর কিশমিশ।”
কিশমিশ ফারসি শব্দ।ছোটো বীজবিহীন একজাতীয় আঙুর শুকিয়ে কিশমিশ তৈরি হয়। অর্থাৎ কিশমিশ হচ্ছে বীজশূন্য ছোটো শুকনো আঙুর। সুতরাং, এর বানান ভুলেও কিসমিস লিখবেন না। তাহলে কিন্তু আপনার kiss, যাকেই দেন নিশ্চিত miss হয়ে যাবে। ক্যাচ, মিস হলে মেনে নেওয়া যায়, কিন্তু কিস, মিস কখনো মেনে নেওয়া যায় না। ক্যাচ মিস হলে একপক্ষের ক্ষতি হয় , কিন্তু কিস মিস হলে দুপক্ষেরই ক্ষতি।
ওপরের ছড়া পঙ্‌ক্তি দুটোর অর্থটা কি এমন হয়? তোমার অস্থির চঞ্চল ও অধীর অধরটি (নিচের ঠোঁট) কিশমিশের মতো টসটসে রসে পুষ্ট, সতেজ, কমনীয় ও লাবণ্যময়।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: এমন কিশমিশ বাংলাদেশে সহজে পাওয়া যায় না। আপনি এই কিশমিশকে কারওয়ান বাজারের সাধারণ কিশমিশ মনে করে বসলে মাইন্ড করব।
 .
বিবাহ বনাম সাঙা: সংস্কৃত বিবাহ (বি+√বহ্+অ) অর্থ— (বিশেষ্যে) নারী-পুরুষের স্বামী-স্ত্রী পরিচয়ে একত্র জীবন যাপনের সামাজিক অনুমোদন, বিয়ে, পরিণয়, উদ্‌বাহ, শাদিয়ে মোবারক। ‘সাঙা’ দেশি (সাঁওতাল) শব্দ। দেশি সাঙা অর্থ— (বিশেষ্যে) নারীর পুনর্বিবাহ; বিধবাবিবাহ। এক বা একাধিকবার বিয়ে হয়েছে, কিন্তু এখন বৈবাহিক সম্পর্ক বিদ্যমান নেই এমন নারীর বিবাহ বা এমন নারী বিবাহ করাকে দেশি কথায় সাঙা বলে। এর আঞ্চলিক রূপ হাঙ্গা। সাঙা শব্দের আরেকটি অর্থ— বাঁশ দিয়ে তৈরি কাপড় রাখার তাকবিশেষ। সাঙাও এক প্রকার বিবাহ। তবে সব বিবাহ সাঙা নয়, কিন্তু সব সাঙা বিবাহ।
“সাঙার মাঝে সাঙার কাপড়
লুকিয়ে রাখে সাঙার খবর।
 সূত্র: কোথায় কী লিখবেন বাংলা বানান: বাংলা বানান প্রয়োগ ও অপপ্রয়োগ, ড. মোহাম্মদ আমীন, পাঞ্জেরী পাবলিকেশন্স লি.

Leave a Comment

You cannot copy content of this page

poodleköpek ilanlarıankara gülüş tasarımıantika alanlarPlak alanlarantika eşya alanlarAntika mobilya alanlarAntika alan yerlerpoodleköpek ilanlarıankara gülüş tasarımıantika alanlarPlak alanlarantika eşya alanlarAntika mobilya alanlarAntika alan yerler
Casibomataşehir escortjojobetbetturkeyCasibomataşehir escortjojobetbetturkey