যুক্তাক্ষর ও যুক্তব্যঞ্জন:  কণ্ঠচোরা সাজ যুক্তাক্ষর পাঁচ: যুক্তাক্ষর নিয়ে কথা

 
ড. মোহাম্মদ আমীন
 
 
ত্ত, ত্ত্ব, ত্ব, ত্ম, ত্য যুক্তাক্ষরগুলোর উচ্চারণ প্রায় অভিন্ন। প্রমিত উচ্চারণে কেবল ‘ত্ম’ এর উচ্চারণ কিছুটা সানুনাসিক। সংগতকারণে শব্দের বানানে “ত্ত, ত্ত্ব, ত্ব, ত্ম, ত্য” এর প্রয়োগ নিয়ে জটিলতায় পড়তে হয়।
যেমন: ষত্ব, সত্ত্ব, স্বত্ব, সত্য শব্দগুলোর উচ্চারণ প্রায় অভিন্ন হলেও অর্থ ও বানানে ভিন্নতা রয়েছে। এরূপ কিছু শব্দের বানান শব্দার্থসহ নিচে দেয়া হলো:
 
আত্ত: অধীন, বশীভূত, গৃহীত, লব্ধ। আত্তগত ধন।
 
আত্ম: নিজ, নিজের। আত্মবিশ্বাস, আত্মকথা, আত্মদান।
 
তত্ত্ব: গূঢ় অর্থ, প্রকৃত অবস্থা, সত্য, স্বরূপ; সাংখ্যমতে চব্বিশ মূল পদার্থ (ক্ষিতি, অপ, তেজ, মরুৎ, ব্যোম, রূপ, রস, গন্ধ, স্পর্শ, শব্দ, চক্ষু, কর্ণ, নাসিক, জিহ্বা, ত্বক, হস্ত, পদ, মুখ, পায়ু, লিঙ্গ, প্রকৃতি, মন, বুদ্ধি এবং অহংকার); পদার্থ; বার্তা; সন্ধান (তত্ত্ব লওয়া); উপঢৌকন (বিয়ের তত্ত্ব); পারমার্থিক জ্ঞান (তত্ত্ববিদ্যা); দর্শন, বিজ্ঞান।
 
তথ্য: সংবাদ, প্রকৃত অবস্থা বা ব্যাপার, জ্ঞাতব্য বিষয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটি তত্ত্ব শব্দের সমার্থক ( বৈজ্ঞানিক তথ্য)।
 
বৃত্ত: গোলাকার, circle, চরিত্র (দুবৃত্ত); ছন্দবিশেষ (অক্ষরবৃত্ত); সংঘটিত (পুনরাবৃত্ত); নিযুক্ত (প্রবৃত্ত); বাড়তি (উদ্বৃত্ত)
 
বৃত্য: বরেণ্য, শ্রদ্ধেয়।
 
ষত্ব: বানানে মুর্ধন্য-ষ এর ব্যবহার। ষত্ববিধান।
 
সত্ত্ব: সত্তা, বিদ্যমানতা (তৎসত্ত্বেও); বল, পরাক্রম (সত্ত্ববান); স্বভাব, প্রকৃতি (শুদ্ধসত্ত্ব); উৎসাহ (সত্ত্বাহীন); প্রাণ, ভ্রূণ (অন্তঃসত্ত্বা); ত্রিগুণের প্রথমটি; ফলের রস শুকিয়ে প্রস্তুত খাদ্যবস্তু (আমসত্ত্ব)।
 
সত্য: মিথ্যা নয়, প্রকৃত; বাস্তব; কাল্পনিক নয়; চিরকালীন, নিত্য; অমিথ্যা বচন, নিত্যতা; প্রতিজ্ঞা, শপথ, দিব্যি (তিন সত্য করে বলা); যথার্থ্য; পৌরাণিক মতে চারটি যুগের প্রথমটি (সত্যযুগ)।
 
স্বত্ত্ব: বিষয়সম্পত্তি, ব্যবসায় প্রভৃতিতে অধিকার বা মালিকানা (গ্রন্থস্বত্ব)।
 
সত্তম: সর্বোৎকৃষ্ট, শ্রেষ্ঠ, সাধুতম।
 
সত্যম: সত্যের সংস্কৃত রূপ। সত্যম শিবম সুন্দরম।
 
সাজাত্য: অভিন্ন জাতীয়তা, এক জাতীয়তা, সমরূপতা, একধর্মিতা (সাজাত্যবোধ)।
 
স্বাজাত্য: স্বজাতির ভাব (স্বাজাত্যের অভিমান); স্বজাতীয়তা, স্বাদেশিকতা।
 

যুক্তাক্ষর ও যুক্তব্যঞ্জন কি অভিন্ন?

যুক্তাক্ষর: একাধিক বর্ণ জুড়ে লিখলে তাকে যুক্তাক্ষর বা যুক্তবর্ণ বলা হয়। যেমন: কণ্ঠ, ভ্রষ্ট, তিষ্ঠ, বর্ণ, যুক্ত, স্বল্প, ক্ষমা । গ্ন, ক্ম, ক্স, ক্ষ, ভ্র, ব্ব, চ্ছ, হ্ম, স্ত্র, ম্ম, হৃ প্রভৃতি।
যুক্তব্যঞ্জন: যুক্তব্যঞ্জন হলো দুটি ব্যঞ্জনধ্বনির পাশপাশি অবস্থান, যার মধ্যে স্বরধ্বনি নেই। যুক্তব্যঞ্জন যুক্তাক্ষর না-ও হতে পারে। যেমন: শাপলা (প্ ল), আলগা (ল্ গ), মুরগি (র্ গ), আচমকা (ম্ কা) প্রভৃতি।
 
যুক্তবর্ণ হলো, এক বর্ণের সাথে অন্য বর্ণ অথবা বর্ণচিহ্ন যুক্ত হওয়া। যেমন: ‘ঘ্য’ (ঘ+য), র্ণ (র+ণ) এগুলোও যুক্তবর্ণ। রেফ, র-ফলা হলো ‘র’-এর বর্ণচিহ্ন। যুক্তবর্ণে য-ফলা (য) ও রেফ (র) একত্রে হতে পারে। যেমন: ‘অর্ঘ্য’ র্+ঘ্+য=র্ঘ্য। ‘সন্ধ্যা’ ন্+ধ্+য=ন্ধ্য। এগুলো তৎসম শব্দ। ‘প্রমিত বাংলা বানানের নিয়ম’ অনুযায়ী চিহ্নিত কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া তৎসম বা সংস্কৃত শব্দের নির্দিষ্ট বানান অপরিবর্তিত থাকবে।
 
একটি যুক্তাক্ষরে গঠিত  শব্দ
ক্রিয়াপদ ছাড়াও বাংলা ভাষায় (আ-কার/স্বরবর্ণ)যুক্ত একাক্ষর দিয়ে গঠিত অর্থবহুল শব্দের সংখ্যা কম নয়। যেমন: মা, না, দা, চা, পা, গা, ঘি, খৈ, কৈ, বৌ, নৌ ইত্যাদি। একটি একক যুক্তব্যঞ্জন দিয়ে গঠিত অর্থবহুল মৌলিক বাংলা শব্দের সংখ্যা খুব বেশি (ইংরেজি থ্রি, ফ্রি ইত্যাদি ব্যতীত) নেই। যেমন: স্ত্রী, জ্বী, হ্রী, শ্রী। /জ্বি, শ্রী/ বহুল প্রচলিত কিন্তু /হ্রী/এর ব্যবহার বিরল। ‘জ্বি’ অর্থ আজ্ঞে, ’শ্রী’ অর্থ সুন্দর আর ‘হ্রী’ অর্থ লজ্জা। নিচে শব্দগুলোর প্রয়োগ দেখান হল: জ্বি ঠাকুর জ্বি/ হ্রী হল রমণীদের স্বর্গস্নাত শ্রী।
 
বহিঃ ও বহি নিমোনিক 
অব্যয় হিসেবে ব্যবহৃত সংস্কৃত ‘বহিঃ (√বহ্‌+ইস্‌)’ শব্দের অর্থ বাহির। ‘বহিঃ’ শব্দের সঙ্গে যখন কোনো শব্দ বা শব্দাংশ যুক্ত হয়, তখন কোথাও ‘বহিঃ’ শব্দের বিসর্গ অবিকল থেকে যায় আবার কখনও বিসর্গ থাকে না। প্রশ্ন হলো, এটি কীভাবে মনে রাখবেন? এজন্য একটি নিমোনিক মনে রাখা যায়।
‘বহিঃ’ শব্দের অব্যবহিত পর ‘র’ উচ্চারিত না-হলে ‘বহিঃ’যুক্ত সেসব শব্দে সাধারণত ‘বহিঃ’ বা বিসর্গ অবিকল থাকবে। যেমন : বহিঃপ্রকাশ, বহিঃশক্তি, বহিঃশুল্ক, বহিঃসমর্পণ, বহিঃসমুদ্র, বহিঃস্থ, বহিঃস্থিত ইত্যাদি।
‘বহিঃ’ শব্দের পর ‘র’ উচ্চারিত হলে অথবা যুক্তব্যঞ্জন থাকলে সেসব শব্দের বানানে বিসর্গ থাকবে না। যেমন : বহিরংশ, বহিরঙ্গ, বহিরাগত, বহিরাগমন, বহিরাবরণ, বহিরিন্দ্রিয়, বহির্গত, বহির্গমন, বহির্জগৎ, বহির্দেশ, বহির্দ্বার,বহির্বাটি, বহির্বাণিজ্য, বহির্বাস, বহির্ভবন, বহির্ভাগ, বহির্ভূত,বহির্মুখ, বহির্লোক।
‘বহিঃ’ শব্দের পর যুক্তব্যঞ্জন থাকলেও বিসর্গ লোপ পাবে। যেমন: বহিশ্চর, বহিষ্করণ, বহিষ্ক্রান্ত. বহিস্ত্বক।
ব্যতিক্রম : বহিঃস্থ এবং বহিস্থ উভয় বানান শুদ্ধ।
প্রসঙ্গত, নিমোনিক কোনো ব্যাকরণ সূত্র নয়, মনে রাখার সহজ কৌশল মাত্র। এরূপ আর কোনো শব্দ জানা থাকলে এবং নিমোনিকের ব্যতিক্রম কিছু ধরা পড়লে অনুগ্রহপূর্বক জানাবেন। তাহলে, আরও মার্জিত করার চেষ্টা করা হবে।
 
 
যুক্তাক্ষর বা যুক্তবর্ণ  ভাঙার নিয়ম
শেষবর্ণের আগের প্রত্যেক বর্ণই হসন্ত হবে। যেমন:
ন্ত্র্য = ন্+ত্+র্+য
ন্ত্র = ন্+ত্+র
ন্ত = ন্+ত
ক্ষ্ম = ক্+ষ্+ম
ক্ষ = ক্+ষ
জ্ঞ-এর উচ্চারণ কেমন হবে
“… জ্‌+ঞ=জ্ঞ। এই যুক্তাক্ষরে ‘জ’ এবং … ‘ঞ’ বর্ণ দুটোর কোনোটিরই উচ্চারণ নেই। সংস্কৃতে জ্ঞ-এর উচ্চারণ ছিল ‘জ্‌ঞ’;  অনেকটা ‘জ্যাঁ’-এর মতো। কিন্তু  বাংলায় শব্দের আদিতে জ্ঞ-এর উচ্চারণ হয় অনেকটা ‘গঁ’ বা ‘গ্যঁ’-এর মতো। অন্যদিকে  শব্দের মধ্যে ও অন্তে উচ্চারিত হয় ‘গ্‌গঁ’-এর ন্যায়। যথা … জ্ঞান (গ্যাঁন্‌), … বিজ্ঞান (বিগ্‌গ্যাঁন), … ইত্যাদি।”
 
সূত্র:  বাংলা একাডেমি বাঙলা উচ্চারণ অভিধান [পরিমার্জিত ও পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ (১৯৯৯)-এর নবম পুনর্মুদ্রণ (২০১৬)] পৃষ্ঠা-[সাইত্রিশ]
 
 
অন্ন  শব্দের ‘ন’ যদি ফলা হয় তাহলে চট্টগ্রাম শব্দে ‘ট’ ফলা নয় কেন?
 
যেই অর্থে অন্নে ন-ফলা আছে, সেই একই অর্থে চট্টগ্রামেও ট-ফলা আছে। কারণ: 
 
১) “স্বরবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপকে যেমন ‘কার’ বলা হয়, তেমনি ব্যঞ্জনবর্ণের সংক্ষিপ্ত রূপকে বলা হয় ‘ফলা’। এভাবে যে ব্যঞ্জনটি যুক্ত হয়, তার নাম অনুসারে ফলার নামকরণ করা হয়। যেমন – ম-এ য-ফলা=ম্য, ম-এ র-ফলা=ম্র, ম-এ ল-ফলা=ম্ল, ম-এ ব-ফলা=ম্ব।” [সূত্র: জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড কর্তৃক নবম ও দশম শ্রেণির পাঠ্যপুস্তকরূপে নির্ধারিত এবং মুনীর চৌধুরী ও মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরী রচিত বাংলা ভাষার ব্যাকরণ (২০১৩), পৃষ্ঠা-১৪।]
 
২) “১২.১.১ ফলা সহযোগে গঠিত যুক্তব্যঞ্জন: যুক্তব্যঞ্জনের শেষ বর্ণে /য/র/ল/ব/ – এই চারটি অন্তঃস্থ বর্ণের কোনোটি থাকলে তাকে যথাক্রমে য-ফলা, র-ফলা, ল-ফলা ও অন্তঃস্থ ব-ফলা বলা হয়ে থাকে। যুক্তব্যঞ্জন গঠনের ক্ষেত্রে মূলত এই চারটি বর্ণই ফলা হিসেবে পরিচিত। উল্লেখ্য, আজকাল এগুলির সাদৃশ্যে অনেকে ম-ফলা, ন-ফলা, শ-ফলা ইত্যাদিও বলে থাকেন।” [সূত্র: ড. মাহবুবুল হকের বাংলা বানানের নিয়ম (২০১৪), পৃষ্ঠা-১০৬।]
 
৩) “ন-ফলা: /গ/ঘ/ণ/ত/ধ/ন/প/ম/শ/স/হ/-এর সঙ্গে যুক্ত হয়ে দন্ত্য-ন নিম্নলিখিত যুক্তব্যঞ্জনগুলি গঠন করে: গ্ন ঘ্ন ণ্ন ত্ন ধ্ন ন্ন প্ন ম্ন শ্ন স্ন হ্ন এদের নাম যথাক্রমে গ-য়ে দন্ত্য-ন, ঘ-য়ে দন্ত্য-ন, মূর্ধন্য-ন-য়ে দন্ত্য-ন, ত-য়ে দন্ত্য-ন ইত্যাদি।” [সূত্র: ড. মাহবুবুল হকের বাংলা বানানের নিয়ম (২০১৪), পৃষ্ঠা-২৭।]
 
৪) “ট্ট ট্র:  /ট্ট/ একটি দ্বিত্ব-ব্যঞ্জন; নাম – ট-য়ে ট। যেমন: … চট্টগ্রাম (চট্‌টোগ্রাম)। পক্ষান্তরে, /ট/-এর সঙ্গে /র/-ফলা যুক্ত হয়ে হয় /ট্র/ বা ট-য়ে র-ফলা। … যেমন: ট্রেন,…” [সূত্র: ড. মাহবুবুল হকের বাংলা বানানের নিয়ম (২০১৪), পৃষ্ঠা-২৫।]
 
৫) “ণ-ফলা: ষ্ণ (মূর্ধন্য-ষ-য়ে মূর্ধন্য-ণ):কৃষ্ণ (কৃষণো)।” [সূত্র: ড. মাহবুবুল হকের বাংলা বানানের নিয়ম (২০১৪), পৃষ্ঠা-২৭।]
 
৬) “প-ফলা: প্প (প-য়ে প): গপ্প (গপ্‌পো)।” [সূত্র: ড. মাহবুবুল হকের বাংলা বানানের নিয়ম (২০১৪), পৃষ্ঠা-২৭, ২৮।]
 
 
বিষণ্ণ (বিষণ্ন), ক্ষুণ্ণ (ক্ষুণ্ন) প্রভৃতি শব্দের যুক্তবর্ণ 
বাংলায় মূর্ধন্য-‘ণ’ মূলধ্বনি হিসেবে স্বীকৃত নয় যেমন স্বীকৃত নয় মূর্ধন্য-‘ষ’। কিন্তু, দন্ত্য-‘ন’ মূলধ্বনি হিসেবে স্বীকৃত।সংস্কৃত ভাষায় মূর্ধন্য-‘ণ’ মূলধ্বনি হিসাবে স্বীকৃত ছিল। মূল কথাটি হলো বাংলায় মূর্ধন্য-‘ণ’ ও দন্ত্য-‘ন’ এর উচ্চারণবোধে ও অর্থগত দিক দিয়ে ভিন্নতা পাওয়া যায় না। যে কারণে বলা হয়ে থাকে বাংলায় মূর্ধন্য-‘ণ’ এর উচ্চারণ নেই।  ণ-এর সংযুক্ত অবশ্যই ণ হবে।

বাংলা পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন ভাষা

একজন সুসন্তান নিজের মাকে যে-কোনো অবস্থায় অন্যের মায়ের চেয়ে অধিক ভালোবাসে, অধিক বুঝে, অধিক জানে, অধিক শ্রদ্ধা করে— এটাই উচিত এবং কর্তব্য। একজন সুসন্তান যে-কোনো প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও প্রচণ্ড অধ্যবসায়ের মাধ্যমে হলেও নিজের মাকে জানার, লালন করার, সেবা করার এবং পরম বিনয়ে সন্তুষ্ট করার চেষ্টা করে। এর মাধ্যমে সে অন্যের মাকেও ভালোবাসার শিক্ষা পেয়ে যায়। কেননা, মা সর্বত্র অভিন্ন।
 
মাতৃভাষা মায়ের মতো। মাতৃভাষা মায়ের মতো বলেই তাকে অন্যের ভাষার চেয়ে বেশি লালন করতে হয়, জানতে হয়, বুঝতে হয়, ভালোবাসতে হয়, আদর করতে হয়, বেশি সময় দিতে হয়, বেশি বেশি অধ্যয়ন করতে হয়— যেমন মা জন্মদাত্রী বলে তাকে অন্যের মায়ের চেয়ে বেশি শ্রদ্ধা করতে হয়, অনুগত থাকতে হয়, পুরোপুরি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা করতে হয়।তা না করে কেউ যদি পথেঘাটে নিজের মাকে পৃথিবীর সবচেয়ে অবোধ্য বা কঠিন বলে বেড়ায়— তা কি মায়ের প্রতি অবজ্ঞা নয়?
 
যে নিজের মাকে বুঝে না, সে অন্যের মাকে কীভাবে বুঝবে? যে মাতৃভাষা বুঝে না, সে অন্যের ভাষা বুঝবে কীভাবে? যে সন্তান কঠিন তথা দুর্বোধ্য আখ্যা দিয়ে নিজের মায়ের বদনাম করে বেড়ায়— তা পৃথিবীর সবার কাছে সম্মানের বিষয় হোক; আমার কাছে অবজ্ঞার। মায়ের বদনাম করে গর্বের সঙ্গে—কী লজ্জা! মাতৃভাষাকে কঠিন বলার মধ্যে সুস্পষ্ট অবহেলা আর অবজ্ঞার চিহ্ন রয়ে গেছে। আমার মা পারে দুর্বোধ্য, আমার ভাষা হতে পারে কঠিন, কিন্তু তা আমার কাছে নয়, কারণ সে আমার মা, সে আমার মাতৃভাষা।
 
আমার কাছে আগে আমার মা, তারপর অন্যের মা। আমার মা অসুন্দর হতে পারে, পাগল হতে পারে, হতে পারে অক্ষম-পঙ্গু, গরিব, অশিক্ষিত, গৃহকর্মী, দুর্ভাষী; কিন্তু সে আমার মা — আমার কাছে আমার মা সবার মায়ের চেয়ে শ্রেষ্ঠ।
 
আমার মায়ের কথা যতই কঠিন আর অবোধ্য হোক— সে কথা আমার কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সংগীত। জীবনপণ করে হলেও তার সেই অবোধ্য কথা আমি বুঝে নেওয়ার চেষ্টা আমরণ চালিয়ে যাব। তবু বলব না— আমার মায়ের ভাষা দুর্বোধ্য, মাকে আমি বুঝি না।
কুলাঙ্গার হতে যাব কেন?
 
 
 
 
 
 
 
error: Content is protected !!